প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সব শ্রেণি-পেশার ন্যূনতম মজুরি সময়োপযোগী করা প্রয়োজন

অপু দেব নাথ: দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ নামক ছোট এ দেশটি। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি দেশ তখন বাংলাদেশ। রাস্তাঘাট নেই, ব্রিজ-কালভার্ট নেই, দেশের অর্থনীতির সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে এক মহাযাত্রা শুরু করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফলে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে প্রবেশ করে। ক্ষুদ্র দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির উন্নয়নের সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন জাতির পিতার সুযোগ্যা কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। ১৯৭৫ সালের সেই স্বল্পোন্নত দেশটি ২০২৬ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করবেন। বর্তমানে মুক্তবাজার বিশ্বের ৪২তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ আমাদের বাংলাদেশ, যা ২০২৬ সাল নাগাদ ৩৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে।

প্রতিযোগিতার এই বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে আমাদের অর্থনীতির বিপ্লব ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। ধীরে ধীরে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি। নতুন শিল্প গড়ে উঠেছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে সমানতালে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশটি আজ ধীরে ধীরে শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে পদার্পণ করছে। এই বিপ্লব আরও ত্বরান্বিত করবে গত ২৫ জুন উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতু, যা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে বড় লম্বা দোতলা সেতু। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি এই সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতির জাগরণের এক ফলপ্রসূ ইঙ্গিত বহন করে। বিশিষ্টরা মনে করেন, এই সেতু নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কয়েকগুণ এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অর্থনীতির এই বিপ্লবে দেশের শিল্প মালিকরা লাভবান হলেও, সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেশটির স্বাধীনতার ৫১তম বছর পরও দেশের সাধারণ মানুষ এখনও এই অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রকৃত সুফল পাচ্ছে না। আমাদের দেশে এখনও নেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য উপযুক্ত সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক ব্যবস্থা। দেশে যেই সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক ব্যবস্থা বর্তমান রয়েছে তা কেবল বেশ কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুসরণ হচ্ছে। বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বনিন্ম পারিশ্রমিকের নীতির তোয়াক্কা করছে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক কাঠামোগুলো দেশের দ্রব্যমূল্যের বাজারের সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যেখানে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের বেতন নির্ধারণে বর্তমান বাজারের জীবন নির্বাহের খরচের ন্যূনতম মানবিক দিকটাও বিবেচনায় রাখছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের খেয়াল খুশিমতো বেতন নির্ধারণ করছে। যেখানে নেই কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নেই কোনো জবাবদিহিতার পরিবেশ।

অন্যদিকে বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশ তাদের জনগণের জীবনযাত্রার মানের সামঞ্জস্য আনতে নতুন সর্বনি¤œ পারিশ্রমিক কাঠামো নির্ধারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা শুরু করেছে। সম্প্রতি একক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউনিয়নভুক্ত ২৭ দেশের দেশ ভেদে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে সর্বনি¤œ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে, গত জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর করা হয়েছে। যেখানে সেসব দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীরাও সেই সর্বনি¤œ পারিশ্রমিকের সুবিধাভোগী হবেন। ইইউতে একক অর্থনীতি চালু থাকলেও প্রতিটি দেশেরই ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থার কারণে আলাদা অর্থনৈতিক কাঠামো রয়েছে। সে কারণেই প্রতিটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ভিন্ন। অন্যদিকে একক বাজার অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও একই পণ্যের মান বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মূল্যমান রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থার কারণে জীবনযাপন ব্যয় একেক দেশে একেক রকম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পর্তুগালে যানবাহন ব্যবহারে যে ব্যয় তাদের দেশের জনগণ করে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নেদারল্যান্ডসে তার তিনগুণের বেশি ব্যয় হয়। আয়ের সঙ্গে সমন্বিত করেই ব্যয়গুলো নির্ধারণ করা হয়। আর এ বিষয়গুলো বিবেচনা করেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক কিছুটা তারতম্য রয়েছে।

নিন্মো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭ দেশের কয়েকটি দেশের সর্বনি¤œ পারিশ্রমিকের বিবরণ তুলে ধরা হলো। একেবারে নিচের দিক থেকে শুরু করলে বুলগেরিয়ায় সর্বনিন্ম বেতন ৩৩২ ইউরো এবং সর্বোচ্চ লুক্সেমবার্গে ২ হাজার ২৫৭ ইউরো। যথাক্রমে অন্য দেশগুলোর নেদারল্যান্ডসে ১৭৫৭ ইউরো, বেলজিয়ামে ১৬৫৮ ইউরো, জার্মানির ১৬২১ ইউরো, ফ্রান্সে ১৬০৩ ইউরো, আয়ারল্যান্ডে ১১৭৫ ইউরো, স্পেইনে ১১২৬ ইউরো, স্লোভেনিয়ায় ১০৭৪ ইউরো ইত্যাদি। বলাবাহুল্য এ সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক ওই দেশগুলোর যেকোনো পেশায় নিযুক্ত মানুষের সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক; যা সরকারি কিংবা বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ এর বিপরীত চিত্র আমাদের দেশে। মূল্যস্ফীতির ফলে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য কিন্তু এর সঙ্গে সর্বনিন্ম পারিশ্রমিকের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

বাংলাদেশে গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাই মাসে কিছুটা কমেছে। এর মধ্যে সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক একেক পেশার একেক রকম। কোনো কোনো পেশায় আবার সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক নির্ধারিতও নেই বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় দ্রব্যমূল্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেতে থাকলেও দেশের অধিকাংশ মানুষের সেই পরিপ্রেক্ষিতে আয়, ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। অনেক নিন্ম আয়ের পরিবার এখন সংসার ব্যয় সামলাতে না পেরে নিত্তনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় অনেক খাতে ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের সন্তানদের প্রয়োজনীয় চাহিদাও মেটাতে পারছেন না। আর্থিকভাবে সচ্ছলরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও এর ভুক্তভোগী হচ্ছেন নি¤œ আয়ের মানুষ।

তাই বর্তমান মূল্যস্ফীতির এই সময়ে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার আনুষঙ্গিক ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে সর্বনিন্ম পারিশ্রমিকের নীতিমালার অনুসরণ করতে বাধ্য করতে হবে। এর জন্য দেশের ২০০৬ সালের শ্রম আইনের সংশোধন এনে যথাযথ কর্তৃপক্ষদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সব শ্রেণি-পেশায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য যুগোপযোগী সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে। এবং প্রজাতন্ত্রের সকল পেশার মানুষকে এই সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক কাঠামোর সুবিধার আওতাভুক্ত করতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যতে ক্রমান্বয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সর্বনিন্ম পারিশ্রমিক বৃদ্ধির বিধান রাখতে হবে এবং আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।

শিক্ষার্থী

হিসাববিজ্ঞান বিভাগ

খিলগাঁও মডেল ইউনিভার্সিটি কলেজ, ঢাকা