প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সময় বাড়াতে চায় না বাংলাদেশ ব্যাংক

শেখ আবু তালেব: কভিড মহামারিতে পর্যুদস্ত অর্থনীতিকে সামাল দিতে ব্যবসীদের প্রণোদনার ঋণ দেয়া হয়। এছাড়া দেয়া হয় ঋণের কিস্তি স্থগিত করার সুবিধা। স্বল্প সুদে দেয়া এসব ঋণ ও কিস্তি স্থগিতের সুবিধার মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি ডিসেম্বরে। এসব সুবিধার মেয়াদ আর বাড়াতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

অবশ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, কভিডের প্রভাব এখন দুর্বল। কিন্তু অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশ্বজুড়েই স্থবির ছিল। এখন অর্থনীতি পথচলা শুরু করেছে মাত্র। ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা কাজে লাগানোর এখন উপযুক্ত সময়। তাই এসব সুবিধার মেয়াদ তিন বছর করা প্রয়োজন।

গত বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কভিড শনাক্ত হওয়ার কথা ঘোষণা করে সরকার। এরপর মার্চের শেষের দিকে পুরো দেশ লকডাউনে চলে যায়। একটানা ৬৬ দিন বন্ধ ছিল গণপরিবহনসহ প্রায় সবকিছু। শুধু জরুরি ও ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার অনুমোদন দেয়া হয়।

মুখ থুবড়ে পড়ে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। এমন অবস্থায় এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। বড়, মধ্যম, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ ও মূলধন সরবরাহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য একাধিক পুনঃঅর্থায়ন তহবিলও গঠন এবং পরিচালনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি দায় ও রপ্তানি আয় দেশে আনতে দেশি মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। রপ্তানি বিল দেশে আনা ও আমদানি দায় পরিশোধের সময়ও বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসব সুবিধার মধ্যে অন্যতম ছিল ব্যাংকঋণের প্রদেয় কিস্তি স্থগিত রাখা। প্রথম পর্যায়ে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সুবিধা দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ কিস্তি আদায়ে চাপ দেয়া যাবে না গ্রাহকদের। নিয়ম অনুযায়ী কোনো ঋণের কিস্তি আদায় না হলে, তা খেলাপিতে পরিণত হয়। আর বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা থেকে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) কেটে রাখতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিস্তি না দিলেও ঋণকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা যাবে না।

একদিকে কিস্তি না দিলে সমস্যা নেই, আবার গ্রাহকও খেলাপিতে পরিণত হবেন নাÑএমন সুযোগের পুরোটুকু ব্যবহার করেছেন ব্যবসায়ীরা। আবার ব্যাংকেরও মুনাফা বেড়েছে এমন সিদ্ধান্তে। এজন্য গত দুই বছরে নতুন করে কাউকে খেলাপির তালিকায় নিতে পারেনি ব্যাংক। এজন্য গত দুই বছরে খেলাপি ঋণের হার সেভাবে বাড়েনি। আবার ব্যাংকগুলোকেও প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়নি এর বিপরীতে। শুধু মামলা জটিলতা ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ঋণের একটি অংশকে খেলাপি দেখিয়েছে ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের দেয়া এসব সুবিধা চলতি মাসেই শেষ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ চলবে, অর্থাৎ আবেদনকৃত, মঞ্জুরকৃত ও প্রক্রিয়াধীন যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। ঋণ বিতরণ হওয়ার পর থেকে সময় গণনা করা হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে যারা ঋণ নিয়েছেন, তাদের পরিশোধের সময় হয়েছে।

কিন্তু ব্যাংকঋণের কিস্তি প্রদানের বিষয়ে যে-স্থগিতাদেশ ছিল তা আর বাড়ানো হবে না। কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, খেলাপি না দেখানোয় তো আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকের সাময়িক লাভ হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি ব্যাংকই উচ্চ হারের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। ঋণগুলোর প্রকৃত অবস্থান কেউ জানতে পারছে না। জানা যাচ্ছে না, দেশের প্রকৃত খেলাপির চিত্র। যদিও করোনার প্রকোপ এখনও রয়েছে, কিন্তু ভয়াবহ প্রাণহানির পর্যায়ে নেই। এজন্য সুবিধার মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অনেকেই সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণের অর্থ পরিশোধ করছেন না। আবার তাদের খেলাপিও দেখানো যাচ্ছে না। ঋণগুলোর আসলে কোনো মানে আছে, তা কিন্তু জানা যাচ্ছে না। এমনকি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার প্রকৃত অর্থে কত হয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না। তখন সুবিধাটি গণহারে দেয়া হয়েছিল। এখন বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। যেকোনো সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যাংক ও কেস-টু-কেস হওয়া উচিত বলেও মনে করেন অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার।

প্রণোদনা সুবিধার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সভাপতি) রিজওয়ান রাহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘করোনার প্রভাব এখন দুর্বল। কিন্তু অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশ্বজুড়েই স্থবির ছিল। এখন অর্থনীতি পথচলা শুরু করেছে মাত্র। আমরা তো শুরু করেছি মাত্র। বন্দর বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানির কোনো কার্যক্রম হয়নি। আবার এখন সমুদ্রে পণ্য পরিবহনে কনটেইনার ও জাহাজ সংকট দেখা দিচ্ছে। একসময় জমানো টাকা খরচ করে শিল্পকারখানা সচল রাখতে হয়েছে। তখন ঋণের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ঋণ ও সরকারের দেয়া সুবিধা কাজে লাগানোর এখন উপযুক্ত সময়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাঁচামাল আসবে, পণ্য তৈরি  ও বিক্রির পরই ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। আবার দেখতে হবে পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে কি না, তাই এসব সুবিধার মেয়াদ তিন বছর করা প্রয়োজন, যাতে ব্যবসায়ীরা হুট করেই কোনো চাপে না পড়েন। তাহলে প্রণোদনার আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।’

জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ফের এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে সরকারি হিসাবে। এর আগে দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ এক লাখ কোটি টাকার উপরে গিয়েছিল ২০১৯ সালে। গত বছরে ঋণ পরিশোধে কিস্তি না দেয়ার সুবিধা বহাল থাকায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে যায়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা।

গত সেপ্টেম্বর শেষে তা আবার এক লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ঋণ অবলোপন, পুনঃতফসিল ও বর্তমান খেলাপি যোগ করলে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) তথ্যটির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।