সারা বাংলা

সমস্যায় জর্জরিত রাজশাহীর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবল ঘাটতি

প্রতিনিধি, রাজশাহী: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসার কেন্দ্র উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু সেখানে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না রাজশাহীর ৯টি উপজেলার প্রায় ২৪ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ। ফলে তারা দ্বারস্থ হচ্ছেন বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের। এতে কখনও আর্থিক দৈন্য, আবার কখনও ভুল চিকিৎসায় প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫০ শয্যার এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকটের কারণে চাইলেও কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা। 

জানা গেছে, ২০২০ সালের শুরু থেকে নভেম্বর পর্যন্ত জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন পাঁচ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৬ জন। তাদের অধিকাংশই নারী। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলেও পর্যাপ্ত গাইনি সার্জন ও অ্যানেসথেটিস্ট না থাকায় রোগী ও প্রসূতি মায়েদের অপারেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা প্রসূতি মায়ের জরুরি ভিত্তিতে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রয়োজন হলে আশ্রয় নিচ্ছেন স্থানীয় ক্লিনিকে অথবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। ফলে তাদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। এতে অভাবে পড়ে অনেকেই বন্দি হচ্ছেন ঋণের জালে।

এখানেই শেষ নয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কোনোটিতেই নেই এমআরআই ও সিটিস্ক্যান। স্বাস্থ্য পরীক্ষার আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশও বিকল হয়ে রয়েছে কয়েকটিতে। জেলার চারঘাট, বাঘা, পবা, পুঠিয়াসহ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বহুদিন থেকেই গাইনি (সিজার) ও অ্যানেসথেশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে রয়েছে চিকিৎসক সংকট। এছাড়া অর্থোপেডিক্স, চক্ষু, মেডিসিনসহ অন্যান্য বিভাগেও পদের বিপরীতে সমান সংখ্যক চিকিৎসক নেই।

সূত্র জানায়, জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক হাজার ১৭৫টি পদের বিপরীতে জনবল ঘাটতি রয়েছে ৩৯৪ জন, যা মোট জনবলের ৩৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঘাটতি, পরীক্ষা ব্যবস্থা না থাকা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রাদির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে চলছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা। এ কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের তৈরি পরিসংখ্যানে দেশের প্রথম ৩০টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে নেই রাজশাহীর কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় গত নভেম্বরে এ তালিকা প্রকাশ করে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ডাইরেক্টর জেনারেলের ওয়েবসাইটে দেয়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কর্মক্ষমতা পরিমাপের ড্যাশবোর্ড থেকে পাওয়া তথ্য মোতাবেক, দেশে আটটি বিভাগের ৬৪টি জেলার মধ্যে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থান ৩৮তম। আর ৭২তম অবস্থানে আছে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এছাড়া অন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে ১০১তম পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১০২তম মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১০৬তম দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১৪০তম বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১৪৫তম গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৪৬তম এবং ১৬৫তম অবস্থানে রয়েছে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

জানা গেছে, জেলার বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ চিকিৎসকের মধ্যে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। সাপোর্টিং স্টাফের ১৯টি পদের বিপরীতে আটজন এবং ফিল্ড অফিসার পদে ৩২ জনের বিপরীতে ২০ জন রয়েছেন। এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও নার্সসহ মোট ১১৪ জনের বিপরীতে ঘাটতি রয়েছে ৩৮ জনের। বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ চিকিৎসকের বিপরীতে পাঁচজন, সাপোর্টিং স্টাফ ১৯ জনের ক্ষেত্রে আটজন ও ফিল্ড স্টাফ পদে ৬৯ জনের মধ্যে ৪০ জন রয়েছেন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও অন্যান্য ১৪৬টি পদের বিপরীতে সংকট রয়েছে ৪২ জনের।

চারঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯ অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে আছেন মাত্র ৯ জন। সাপোর্টিং স্টাফ ২৬ জনের ক্ষেত্রে ১৩ জন ও ফিল্ড অফিসার ৫০ জনের স্থলে ৩০ জন রয়েছেন। সবমিলিয়ে লোকবল ১৫২টি পদের বিপরীতে ৫৭ জন নেই। দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯ জনের বিপরীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন ৯ জন। মোট ১৩৩ জনের বিপরীতে জনবল সংকট ৫৪ জনের। গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ অভিজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে আছেন ছয়জন। মোট ১২৯ পদের বিপরীতে জনবল নেই ৪২টি পদে। মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে পাঁচজনের ঘাটতি রয়েছে। মোট ১০৯টি পদের বিপরীতে জনবল সংকট রয়েছে ৩৮ জনের।

একইভাবে পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১৯টি পদের বিপরীতে ২৭টি ও পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১৩৯টি পদের বিপরীতে ৪৯টি পদে ঘাটতি রয়েছে। আর তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯ অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মধ্যে আছেন মাত্র সাতজন। সাপোর্টিং স্টাফ ২৭ জনের বিপরীতে ১৫ জন এবং ৩২ ফিল্ড স্টাফের বিপরীতে ২০ জন রয়েছেন। এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও অন্যান্য ১৩৪টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ৮৭ জন, ঘাটতি রয়েছে ৪৭ জনের।

বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম রাব্বানি বলেন, ‘বাগমারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন থেকে অ্যানেসথেশিয়া ও গাইনি সার্জন পদে কেউ নেই। এতে প্রসূতিদের সার্জারি সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আমরা চাইলেও রোগীদের কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত করতে পারছি না। তবে আমাদের আন্তরিকতা ও চেষ্টার অভাব নেই।’

চারঘাট উপজেলার স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন অ্যানেসথেশিয়া ও গাইনি সার্জনের পদটি ফাঁকা রয়েছে। এছাড়া বেশকিছু অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। তবুও আমরা এই জনবল দিয়েই রোগীদের সেবা নিশ্চিত করে চলেছি। জনবল সংকটের বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’

রাজশাহীর ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জনবল ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার জানান, তিনি সবেমাত্র বদলি হয়ে এসেছেন। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..