সমাজ-সংস্কারক হজরত মুহাম্মদ (সা.)

নাজমুল হাসান সাকিব: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন মহান সমাজ-সংস্কারক। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। গোত্রকলহ, যুদ্ধবিগ্রহ, মারামারি, হানাহানি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থার মধ্যে নিপতিত ছিল গোটা সমাজ। সামাজিক সাম্য-শৃঙ্খলা, ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ, নারীর মর্যাদা প্রভৃতির কোনো স্থায়িত্বই ছিল না। জঘন্য দাসত্ব প্রথা, সুদ, ঘুষ, জুয়া-মদ, লুণ্ঠন, ব্যভিচার, পাপাচার ও অন্যায়-অত্যাচারের চরম তাণ্ডবে সমাজকাঠামো ধসে পড়েছিল। এমন এক দুর্যোগময় যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব। তিনি আরবে বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করে বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয় খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে নবুওতের আলোকে উদ্ভাসিত করেন। ঐতিহাসিক রেমন্ড লার্জ বলেন, , The founder of Islam is in fact the promoter to the first social and international revolution of which history gives mention. (অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বিপ্লবের সূচনাকারী হিসেবে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের নাম ইতিহাসে প্রথম উল্লেখ করা হয়েছে)।

মহানবী (সা.) সমাজের যাবতীয় অনাচার দূর করে এক আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

তাওহিদের আদর্শে সমাজের পত্তন: ধর্মীয় ক্ষেত্রে নানা অনাচার, পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করে সমগ্র সমাজ-সংগঠনকে এক আল্লাহ’য় বিশ্বাসী তাওহিদের আদর্শে নবরূপে রূপায়িত করেন। সব ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের উৎস একমাত্র আল্লাহকেই মেনে নিয়ে সমাজের সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ব্যবস্থা করেন।

মানবতার ভিত্তিতে সমাজ গঠন: সমগ্র আরবদেশ জঘন্য পাপ ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাম্য, অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বমানবতার ভিত্তিতে যে এক উন্নত ও আদর্শ সমাজব্যবস্থার প্রবর্তন করেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই। তাঁর প্রবর্তিত সমাজে গোত্রের বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ঈমানের বন্ধনই ছিল মজবুত ঐক্যের প্রতীক। তিনি অন্ধ অভিজাত্যের গৌরব ও বংশমর্যাদায় গর্বের মূলে নির্মমভাবে কুঠারাঘাত হানেন এবং সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে আদর্শ সমাজকাঠামো প্রস্তুত করেন। এই একটিমাত্র আঘাতেই আরবের একমাত্র বন্ধন গোত্রপ্রীতি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এবং ঈমান এই বন্ধনের স্থান দখল করল। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘সব মানুষ সমান।’ মানুষের মাঝে শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর সবদিকে অনুগত ও মানুষের সর্বাধিক কল্যাণকামী। তার সমাজ ব্যবস্থায় উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্র, কালো-সাদার বৈষম্য রইল না। মানুষে মানুষে সব ধরনের অসাম্য ও ভেদাভেদ দূরীভূত করে মানবতার অত্যুজ্জ্বল আদর্শে সমাজবন্ধন সুদৃঢ় করেন। আরবের ইতিহাসে রক্তের পরিবর্তে শুধু ধর্মের ভিত্তিতে সমাজ গঠনের এটিই প্রথম দৃষ্টান্ত।

দাসপ্রথার উচ্ছেদ: আরবে বহু যুগ ধরে গোলামি প্রথা প্রচলিত ছিল। মনিবরা ক্রীতদাসের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করত। মানুষ হিসেবে তাদের কোনো মর্যাদাই ছিল না। তারা পশুর মতো জীবনযাপন করত। দাস বাজারে কেনাবেচা হতো। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মনিবদের নির্দেশ দিলেন, ‘ক্রীতদাসদের প্রতি সদাচরণ করো। তোমরা যা খাও ও পরিধান করো, তা তাদের খেতে ও পরিধান করতে দাও।’ তিনি তাদের মুক্তির পথ নির্দেশ করে ঘোষণা দিলেন, গোলামকে আজাদিদানের কাজ আল্লাহর কাছে একটি শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তিনি অনেক দাসকে মুক্তি করে দেন এবং অনেক সাহাবি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তাঁর উদারতার জন্য দাস বেলাল (রা.)-কে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন এবং ক্রীতদাস জায়েদকে সেনাপতিত্বে বরণ করে দাসদের পূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।

নারীর প্রতি মর্যাদাদান: তৎকালীন আরবে নারীদের ভোগ্যসামগ্রী মনে করা হতো। তারা ছিল পুরুষদের দাসীমাত্র। কন্যাসন্তানদের জীবন্ত দাফনপ্রথা সিদ্ধ ছিল। পরিবারের কর্তা ইচ্ছা করলে নারীকে ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তর করতে পারত। বাবা ও স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোনো অংশ ছিল না। মহানবী (সা.) নারীদের সমাজে অভূতপূর্ণ মর্যাদা দিলেন। তিনি নারী-পুরুষকে সমমর্যাদা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘জননীর পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর সঙ্গে সর্বোত্তম ব্যবহার করে।’ তিনি সর্বপ্রথম নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেন। এসবের জন্য নারী জাতি সমাজের অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদে পরিণত হলো।

সংঘাতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা: তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই থাকত। সামান্য অজুহাতে ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজত, আর দীর্ঘকাল যাবৎ তা দাবানলের মতো জ্বলতে থাকত।

রক্তপাত ও লুণ্ঠন ছিল তাদের নিত্যদিনের পেশা। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এসব অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি কিশোর বয়সেই শান্তি সংঘ ‘হিলফুল ফুজুল’ এবং পরে ‘মদিনা সনদ’-এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি আনয়ন করেন।

মদ্যপান রহিতকরণ: মদ্যপ্রিয়তা আরবদের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। নর্তকীদের সঙ্গে মদমত্ত হয়ে তারা যেকোনো অশ্লীল কাজ করত। মহানবী (সা.) দেখলেন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে চরম ক্ষতিসাধনকারী। তাই তিনি কঠোরভাবে মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সমাজের কল্যাণ সাধনে সচেষ্ট হন।

জুয়া খেলা নিষিদ্ধ: তৎকালীন আরবে জুয়া খেলার ব্যাপক প্রচলন ছিল এবং এটাকে সম্মানজনক অভ্যাস মনে করা হতো।

জুয়া খেলায় হেরে মানুষ অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো। ফলে ব্যাহত হতো সামাজিক জীবন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সমাজকে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।

কুসীদপ্রথা উচ্ছেদ: কুসীদ এক ধরনের সুদের কারবারের প্রথা। আরব সমাজে জঘন্য কুসীদপ্রথা বিদ্যমান ছিল। তারা এত উচ্চহারে সুদের কারবার করত যে সুদ পরিশোধ করতে না পারলে সুদগ্রহীতার স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির সঙ্গে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে নেয়া হতো। আরবে প্রচলিত ব্যবস্থা সুস্থ সমাজ বিকাশে প্রচণ্ড বাধাস্বরূপ ছিল। নবীজি (সা.) সুদ হারাম ঘোষণা করেন এবং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে ‘করজে হাসানা’ দানে উৎসাহিত করেন।

কুসংস্কার থেকে মুক্তি: আরবের জাহেলি সমাজে নানা কুসংস্কার ছিল। ভাগ্যনির্ধারক তীর, দেবদেবীর সঙ্গে অলীক পরামর্শ, মৃতের অজ্ঞাতযাত্রার ধারণা প্রভৃতি চালু ছিল। শুধু তা-ই নয়, নানা ধরনের ভূত-প্রেত, দৈত্য, পরী প্রভৃতিকে বিশ্বাস করত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে তাদের মন-মগজ থেকে সব কুসংস্কার দূর করেন।

নিষ্ঠুরতার অবসান: প্রাচীন আরব নিষ্ঠুরতায় ভরপুর ছিল। ভোগবাদী আরবরা দাস-দাসী, এমনকি শত্রু গোত্রের লোকদের সঙ্গে অমানবিক নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিত। বিত্তবানরা খেলার ছলে দ্রুতগামী ঘোড়ার লেজের সঙ্গে নারীকে বেঁধে দিত। এর ফলে হতভাগা নারীর প্রাণপ্রদীপ নিভে যেত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সমাজ থেকে এ ধরনের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা দূর করে সমাজের আমূল পরিবর্তন সাধন করেন।

জাকাতের বিধান জারি: অর্থনৈতিক দৈন্যদশা বিদূরিত করে সমাজের সার্বিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সৌধ নির্মাণের নিমিত্তে হজরত মুহাম্মদ (সা.) জাকাতের বিধান প্রবর্তন করেন, যাতে সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনের পথ সুগম হয়। তিনি ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য সমাজ থেকে চিরতরে উৎখাত করেন।

আর্থ-সামাজিক অসাধুতা দূর: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আর্থ-সামাজিক অসাধুতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি, হঠকারিতা, মজুতদারি, কালোবাজারিসহ যাবতীয় সমাজবিরোধী কাজ হারাম ঘোষণা করে সেগুলো সমাজ থেকে উচ্ছেদ করে একটি সুন্দর ও পবিত্র সমাজ কাঠামো বিনির্মাণ করেন।

জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা: হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিটি মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করেন। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা এবং কারও সম্পদ গ্রাস করা যাবে না। সবার জীবন-সম্পদ পবিত্র আমানতÑএ বিশ্বাসের ওপর তিনি সমাজকাঠামোকে গড়ে তোলেন।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: বিভিন্ন ধরনের অবিচার ও অনাচার দূরীকরণের জন্য বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আইনের শাসন কায়েম করেন। আইনকে ব্যক্তিবিশেষ অথবা কোনো গোত্রের হাতে না দিয়ে কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের কাছে ন্যস্ত করেন। যেন আইন কারও ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা না হয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) অতি অল্প সময়ে স্বীয় প্রচেষ্টা ও অদম্য শক্তিবলে সব অনাচারের মূলোচ্ছেদ করে অসভ্য, দ্বিধাবিভক্ত ও সদা কলহপ্রিয় সে সময়কার সর্বাপেক্ষা অধঃপতিত আরবকে সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যবন্ধনে সঙ্ঘবদ্ধ জাতিতে পরিণত করে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এভাবেই তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব ও আখেরি নবী। মহাপ্রলয় পর্যন্ত যারা তাঁকে অনুসরণ করবে, অবশ্যই তারা হেদায়েত পাবে; ইহকালে শান্তি ও পরকালে কল্যাণ লাভ করবে।

দাওরায়ে হাদিস

ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ

বসুন্ধরা, ঢাকা

পাঠকের চিঠি

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..