সারা বাংলা

সমান শ্রম দিয়েও বৈষম্যের শিকার নারী শ্রমিক

ইমতিয়াজ উল ইসলাম, সাভার: চল্লিশোর্ধ্ব মনি দাস। মাথার ওপর প্রখর রোদ উপেক্ষা করে ইটভাটায় কয়লা ভাঙার কাজ করেন। দৈনিক মজুরি পান আড়াইশ টাকা। কয়লার কালিতে মুখাবয়ব ঢেকে গেলেও কাজের চাপে ভুলে যান সব। সন্ধ্যায় কাজশেষে পারিশ্রমিক নিয়ে হাসিমুখে ফেরেন বাড়ি। এভাবেই সংসারের টানাপড়েনে জর্জরিত মনি দাস ও স্বামী হরিপদ দাস। প্রায় চার বছর ধরে তারা কাজ করছেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার শ্রীরামপুরের জনতা ব্রিকস নামে ইটভাটায়।

ইটভাটায় গিয়ে দেখা যায় স্বামী হরিপদ দাসসহ অনেকের সঙ্গে কয়লা ভাঙছেন মনি দাস। কারও যেন ফুরসত নেই কথা বলার। অনেক অনুরোধের পর কথা বলেন ভাড়াড়িয়া গ্রামের মনি দাস।

তিনি জানান, অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। এর পর শুরু হয় জীবনসংগ্রাম। সন্তানদের কষ্ট করে বড় করলেও এখন তারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। তাই স্বামী-স্ত্রী পেটের দায়ে কাজ করেন এই ইটভাটায়। বড় আকৃতির কয়লা মেশিনে ভেঙে ছোট করা ও কয়লার গুঁড়ো আলাদা করার কাজ করেন তিনি। আর স্বামী হরিপদ ঝুড়িতে করে সেগুলো তুলে দেন মেশিনে। তবে অতিরিক্ত গরমে শরীর জ্বালাপোড়া

করে। এছাড়া ইটভাটার ধুলো ও কয়লার কালির কারণে মাঝেমধ্যে সর্দি, কাশি ও জ্বরে ভোগেন।

পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে ১০০ টাকা কম পান নারী শ্রমিকরা। তিনি দিনশেষে পান আড়াইশ টাকা। আর তার স্বামী কিংবা পুরুষ শ্রমিকদের দেওয়া হয় সাড়ে তিনশ টাকা। অথচ তার স্বামীর চেয়ে তার পরিশ্রম বেশি। কিন্তু পুরুষদের চেয়ে নারীরা কম পরিশ্রম করেÑএই অজুহাতে তাদের মজুরি কম দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শত কষ্ট হলেও এখন অনেক ভালো লাগে একটা কারণেÑআগে কোথাও তার মতো নারীদের কাজ দেওয়া হতো না। অথচ এখন কাজশেষে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে পারছেন।

এ ব্যাপারে জনতা ব্রিকসের ম্যানেজার সুধীর চন্দ্র সরকার জানান, পুরুষদের পরিশ্রম নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই মজুরিও তারা বেশি পায়।

মনি দাসের মতো প্রান্তিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত নারীকে দেখা যায় সাভারের আমিনবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন এলাকায় বড় বড় ট্রলার থেকে পাথর ও কয়লা নামানোর কাজ করতে। প্রচণ্ড রোদ উপেক্ষা করে তারা সেখানকার পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাথায় পাথর ও কয়লাবোঝাই ঝুড়ি টানছেন দিনভর।

ল্যান্ডিং স্টেশনের নারী শ্রমিক দিনাজপুরের আমেনা, বগুড়ার জোছনা, মিঠাপুকুরের হাজরা ও আছমাসহ অনেকেই জানান, এখানে অনেক নারী একসঙ্গে কাজ করেন। তবে প্রথম যখন তারা কাজে এসেছিলেন তখন পুরুষ শ্রমিকরা বিদ্রƒপ করত। কিন্তু এখন আর তেমনটা হয় না। বেশিরভাগ সময় পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে বেশি কাজ করেন তারা। কিন্তু দিনশেষে মহাজনরা তাদের মজুরি দেন আড়াইশ টাকা। আর পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্তও হয়। তবে নারী ও পুরুষের মজুরি বৈষ্যমের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি ল্যান্ডিং স্টেশনের মহাজনরা।

অপরদিকে সাভারের আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার গোল্ডেন ক্যাপ নামে একটি ক্যাপ রফতানিকারক কারখানার শ্রমিক রেহেনা আক্তার ও শাহনাজ বেগম। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে গার্মেন্টে কাজ করলেও ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে তারা জানান।

রেহেনা আক্তার জানান, সাংসারিক টানাপড়েনে ছোটবেলায় গার্মেন্টে কাজ নিয়েছেন তিনি। এরপর দীর্ঘ দশ বছর কেটে গেলেও ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। একই কারখানায় স্বামী জিয়াউর রহমানও কাজ করেন। অপারেটর পদে কাজ করে সাড়ে সাত হাজার টাকা বেতন পান। স্বামী জিয়াউর রহমানও সমপরিমাণ বেতন পাচ্ছেন। তার পরও তিন সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ বহন করতে গিয়ে

হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। বাধ্য

হয়েই বড় ছেলেকেও কারখানায়

চাকরি দিয়েছেন।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা খালেদা আক্তার জাহান জানান, নারীর অধিকার আদায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন দিবসে উঠান বৈঠকসহ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। তবে নারীর ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্যের শিকার হন তারাই যারা দিনমজুর হিসেবে দূর থেকে এই এলাকায় কাজের জন্য আসেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দরিদ্রতার সুযোগ নিয়েই তাদের তুলনামূলক কম মজুরিতে কাজ করান কিছু প্রতিষ্ঠানের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পাশাপাশি এত দিনমজুর নারী কোথায় মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তা খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..