দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সমুদ্র নজরদারির সক্ষমতা নেই সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের

সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৫২ সালে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। এক সময় দপ্তরটি শিল্প বিভাগের অধীনস্থ ছিল। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান অবস্থায় এলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও নৌযানের অভাবে ধুঁকছে সরকারি এ সংস্থাটি। দপ্তরটির নানা সমস্যা নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ছাপা হচ্ছে প্রথম পর্ব

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমান, অর্থাৎ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু প্রয়োজনীয় সার্ভিল্যান্স চেকপোস্ট, নিজস্ব পেট্রোল বোট ও চাহিদামতো জনবল না থাকায় ৭১০ কিলোমিটারের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বেইজ লাইন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশাল অর্থনৈতিক এলাকা নজরদারির সক্ষমতা নেই সামুদ্রিক মৎস দপ্তরের। একই সঙ্গে সরকার ঘোষিত ৬৮৯ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে ব্লু ইকোনমি-সংশ্লিষ্ট দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে সমুদ্র। বাংলাদেশের রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে ব্লু ইকোনমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেজন্য সামুদ্রিক মৎস্য খাতের অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হবে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমুদ্রসম্পদ সংরক্ষণ ও স্থিতিশীল আহরণ অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সক্ষমতা না থাকায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না।

তথ্যমতে, টেকনাফ হতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চল এবং বেইজ লাইন থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক এলাকা রয়েছে বাংলাদেশের। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল অন দ্য ল অব দ্য সি’র (আইটিএলওএস) মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে ও পারমানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের (পিসিএ) মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকার অধিকার অর্জন করে। এতে গত দুই দশকে মৎস্য উৎপাদনও বেড়েছে দ্বিগুণ। একই সঙ্গে নতুন নতুন মৎস্য আহরণক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক এলাকার বাইরে প্রলম্বিত মহিসোপানে টুনা, মেকারেল, সোর্ড ফিশ, ব্ল্যাক মারলিনসহ অতি মূল্যবান মৎস্য আহরণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় মৎস্য আহরণে সহায়তা ও নজরদারিতে সক্ষমতা নেই সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের।

এদিকে অতি আহরণের ফলে মৎস্যসম্পদ যাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত না হয়, সেজন্য সরকার মৎস্য আহরণে নিয়োজিত বাণিজ্যিক ট্রলার (বর্তমানে ২৫৫টি) সংখ্যা না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও প্রায় ৬৮ হাজার যান্ত্রিক ট্রলার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলাচল করছে। এসব ট্রলার উপকূলীয় এলাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি করে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত। একই সঙ্গে বাতিক জাল নিয়ন্ত্রণ, সুন্দরবন এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ, চিংড়ি বন্ধ মৌসুম বাস্তবায়ন, সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ এলাকা, জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম, ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারেনি সংস্থাটি। কারণ, দপ্তরটির নেই প্রয়োজনীয় সার্ভিল্যান্স চেকপোস্ট। ফলে চেকিং কার্যক্রম জোরদার করতে পারছে না। একই সঙ্গে নিজস্ব পেট্রোল বোট ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ এলাকায় নজরদারি করতে পারছে না।

এদিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে একটি মাত্র সার্ভিল্যান্স চেকপোস্ট রয়েছে। আর মনিটরিংয়ের জন্য একটি গাড়ি রয়েছে। দুটি পুরোনো স্পিডবোট থাকলেও সেগুলো নষ্ট হয়ে আছে; তার মধ্যে একটি মেরামত-অযোগ্য। বাকিটির মেরামত কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে মঞ্জুরিকৃত ৮৩ পদের মধ্যে ২৪টি পদ শূন্য পড়ে আছে।

এ অবস্থায় মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সমুদ্রে নজরদারি বাড়ানোর জন্য মঞ্জুরিকৃত শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি উপকূলীয় প্রতিটি জেলায় একটি করে সার্ভিল্যান্স চেকপোস্টসহ মেরিন ফিশারিজ সার্ভিল্যান্স পন্টুন স্থাপন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি চেকপোস্টে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি করে পেট্রোল ভেসেল ও প্রয়োজনীয় যানবাহন থাকতে হবে। আর এসব কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য কর্মকর্তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বরাদ্দ রাখতে হবে।

এ বিষয়ে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. লতিফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে মৎস্য দপ্তরের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। ব্লু ওশান ইকোনমি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীরও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। আমাদের জনবল ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা কম রয়েছেÑকথাটি সত্য। তাই এরই মধ্যে সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে এক হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেবে এক হাজার ৫৮৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বাকি ৩০৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে পাওয়া যাবে। প্রকল্পটির আওতায় ১৬ উপকূলীয় জেলার ৭৫ উপজেলায় কার্যক্রম চলবে। আর এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সমস্যা অনেকটাই দূর হবে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..