মত-বিশ্লেষণ

সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বিকশিত শিশুবান্ধব বাজেট

সফিউল আযম : টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং বর্তমান সরকারের রূপকল্প ও কৌশলগত পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শিশুদের উন্নয়নে গুরুত্ব প্রদান অত্যাবশ্যক। এ কারণে সব ক্ষেত্রে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণসহ সার্বিক উন্নয়নে সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘ কনভেনশন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক কনভেনশনে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করার মাধ্যমেও শিশুদের প্রতি সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে।

বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মননশীলতার বিকাশে সর্বোচ্চ যত্ম নেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নে সরকারের কার্যক্রমও প্রশংসনীয়।

শিশু বাজেটের প্রাথমিক ধারণা শুরু হয়েছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে শিশুবান্ধব করার উদ্যোগ থেকে। জাতীয় বাজেটের অংশ হিসেবে শিশু বাজেট প্রতিবেদন শিশুদের অধিকার ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সব মহলে ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পঞ্চমবারের মতো প্রকাশিত হয়েছে বিকশিত শিশু: সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শিরোনামে শিশু বাজেট প্রতিবেদন।

বাজেট হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরসহ দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনমান প্রভাবিত করা যায়। সমগ্র বাজেটে শিশুদের কল্যাণে যে বরাদ্দ রয়েছে তা পৃথকীকরণ এবং বিশ্লেষণই হলো শিশু বাজেটের মূল উদ্দেশ্য। সরকারের সামগ্রিক বাজেটের কী পরিমাণ শিশুদের কল্যাণে ব্যয়িত হয়, বরাদ্দকৃত অর্থ শিশুদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত কি না এবং বরাদ্দকৃত অর্থ দক্ষ ও কার্যকরভাবে ব্যয়িত হয় কি না, সেগুলো সঠিকভাবে জানার জন্য শিশু বাজেট অতি গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত শিশু বাজেট প্রতিবেদনে সরকারের সামগ্রিক বাজেটে শিশুদের অধিকার ও প্রয়োজনের বিষয়গুলো কীভাবে সন্নিবেশিত থাকবে, তা তুলে ধরা হয়। বাজেটে শিশুদের আর্থসামাজিক অধিকার সংরক্ষণে যেসব নীতিমালা, কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নে যেসব পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে, সেসব বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে শিশু বাজেট প্রতিবেদনে।

সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল সমাজ গড়তে শিশুদের ওপর কাক্সিক্ষত মাত্রার বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এ সত্যকে সামনে রেখে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শিশুবান্ধব করা, নীতি ও কৌশলসহ সব শিশুর জন্য অভিন্ন ও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের বিধানসহ শিশুদের অনুকূলে সুবিধা সৃষ্টিকারী আইন প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে শিশু বাজেটে।

সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো, একটি সুস্থ, সবল ও সুদক্ষ শ্রমশক্তি এবং একটি সৃজনশীল উদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে তোলা। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন শিশুর বিকাশে সামর্থ্যরে মধ্যে সর্বোচ্চ সম্পদের সুদক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় পারিবারিকভাবে শিশু বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সরবরাহ সম্ভব হয় না বিধায় সরকারকেই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। এ বিষয়ে বর্তমান সরকার সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও জাতীয় বাজেটে শিশুদের বিকাশে সম্পদ সঞ্চালনে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি জোরদার করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শিশুদের জন্য বিনিয়োগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচনা করা হয়। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, এই ধারণা নীতিনির্ধারক মহলকে দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য বিকল্প কৌশলের সন্ধান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে একটি বিকল্প হচ্ছে শিশুদের জন্য বিনিয়োগ। যার মধ্য দিয়ে প্রজন্মান্তরে দারিদ্র্যচক্র দূর করা সম্ভব।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম উত্তম পন্থা হলো শিশুদের ওপর কাক্সিক্ষত মাত্রায় সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। আবার জাতীয় বাজেটে শিশুর হিস্যা দক্ষতা, স্বচ্ছতা, সমতা ও জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে ব্যয় হচ্ছে কি না তাও সার্বক্ষণিক পরিবীক্ষণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর মহান জাতীয় সংসদ ও জনগণের অবগতির জন্য শিশু বাজেট প্রতিবেদন প্রকাশ হয়ে আসছে। বিগত অর্থবছরের বাংলাদেশে শিশুদের ওপর মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি দক্ষ শ্রমশক্তি সৃষ্টি এবং যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য এই বিনিয়োগ কমপক্ষে ২০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।

শিশুদের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নয়। শিশু অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রক্রিয়া সৃষ্টি, প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং যুগোপযোগী নতুন প্রতিষ্ঠান সৃজনের জন্য নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে। দেশে খর্বাকৃতির হার এখনও ৩৬ শতাংশ এবং বাল্যবিয়ের হারের আধিক্যও দৃশ্যমান। কিশোরী গর্ভধারণের হারও বিশ্বের সমতুল্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি। শিশুদের ওপর বর্ধিত বিনিয়োগ এসব সমস্যা-সমাধানসহ শিশু দারিদ্র্য বিমোচন, শিশু শ্রমের অবসান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, উন্নতমানের স্বাস্থ্য সেবার জোগান, অপুষ্টি দূরীকরণ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ, সহিংসতা ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঝুঁকির মধ্যে থাকা শিশুদের উদ্ধার এসব ক্ষেত্রে ব্যবহƒত হতে পারে।

আশার কথা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরের নির্বাচিত ১৫টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকটিতেই মোট বাজেটের অনুপাতে শিশুকেন্দ্রিক বাজেট বেড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জাতীয় বাজেটের প্রবৃদ্ধির তুলনায় শিশুকেন্দ্রিক বাজেট প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শিশুকেন্দ্রিক বাজেট ৬৫ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ হাজার ১৯৭ কোটি টাকায়, প্রবৃদ্ধির হিসেবে যা ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। যেহেতু মন্ত্রণালয়গুলোর সার্বিক বরাদ্দের প্রবৃদ্ধির চেয়ে শিশুকেন্দ্রিক বাজেটের প্রবৃদ্ধির হার বেশি, তাই এটা সহজেই অনুমেয় যে, শিশুকেন্দ্রিক প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোর প্রচেষ্টা বিগত বছরের তুলনায় বেড়েেেছ। এর ফলে নির্বাচিত মন্ত্রণালয়গুলোর মোট বাজেটের অনুপাতে শিশু সংবেদনশীল বরাদ্দও বিগত অর্থবছরের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি সরকারের মোট বাজেটের হিস্যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৩ শতাংশে। জিডিপির অনুপাতে শিশুকেন্দ্রিক কার্যক্রমে বাজেট বরাদ্দের হার গত এক বছরে দুই দশমিক ৫৯ থেকে বেড়ে দুই দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে সাধারণত শিশুদের মতামতকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ তাদের প্রকাশের ক্ষমতা কম। তাই বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা হয় না। ফলে তাদের বক্তব্য অশ্রুত থেকে যায়। এ কারণে তাদের মতামত চাওয়ার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি। অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হলে শিশুরা তাদের প্রত্যাশা ও চাহিদার কথা প্রকাশ করতে পারবে।

জাতীয় উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কোনো কর্মসূচি চিহ্নিত করতে হলে প্রথমে সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। উপকারভোগীদের লক্ষগোষ্ঠী হতে পারে সব শিশু অথবা জনতাত্ত্বিক ভিত্তিতে নির্ধারিত শিশুদের একটি বিশেষ অংশ। সে ক্ষেত্রে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক চুক্তি ও রাষ্ট্রীয় আইনগত বাধ্যবাধকতাও বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোতে নির্ধারিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান রেখে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

শিশু সংবেদনশীল বাজেট ব্যয়ে সর্বোচ্চ বাজেট দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য বিলম্ব ও অপচয় রোধসহ বরাদ্দকৃত বাজেট যাতে পরিপূর্ণরূপে ব্যয় হয় এবং তা সেবা সরবরাহ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শিশু সংবেদনশীল বাজেটের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃত অর্থেই একটি ফলাফলভিত্তিক বাজেটকাঠামো সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া শিশু সংবেদনশীল সরকারি বাজেট সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির অনুকূলে অধিক পরিমাণ ব্যয় করার মাধ্যমে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের উপায় অনুসন্ধান করা দরকার।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..