প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিন

সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির আকার বেশ আলোচিত হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ অচিরেই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। তাহলে এটি সরকারের যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, অগ্রগতির পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যদি বঞ্চিত থেকে যায়, তাহলে ওই অগ্রগতি আদৌ অগ্রগতি নয়। 

আজকাল বিশ্বব্যাপী আয় ও সম্পদবৈষম্য কথাটা খুবই আলোচিত। এ নিয়ে আলোচনাকালে জিনি সহগের কথা উঠে আসে। মূলত এটি আয়বৈষম্য মাপার একটি পদ্ধতি। ১৯১২ সালে ইতালির সংখ্যাতত্ত্ববিদ কোরাদো জিনি এর উদ্ভাবক। শতবর্ষ পেরোলেও বৈষম্য মাপার ক্ষেত্রে এটি সর্বাপেক্ষা নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য। অর্থনীতিবিদ ও জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা জিনি সূচক দিয়েই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি পরিমাপ করেন। কোনো উন্নয়ন নিয়ে বা সূচক নিয়ে মতানৈক্য থাকতেই পারে; কিন্তু এ বিষয়ে সবাই একাত্ম হবেন যে, সাধারণ মানুষকে উন্নয়নবঞ্চিত করে জিনি সহগে এগিয়ে থাকা সম্ভব নয়। সবার আয় সমান হলে জিনি সূচক হবে শূন্য। এর অর্থ হলো চরম সাম্যাবস্থা বিরাজ করছে। এটি অবশ্য সহজ ও সম্ভব নয়। আর সব আয় একজনের হাতে গেলে সূচকটি হবে ১। এটি আবার চরম অসাম্য অবস্থা। এ দুই সীমার মধ্যে সূচক যত বাড়ে, অসাম্য তত বেশি। এতেই বোঝা যায়, সূচকটির গুরুত্ব। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জিনি সহগ ছিল মাত্র ০.৩৬। তখন বাংলাদেশ দারিদ্র্যকবলিত দেশ হলেও আয়বৈষম্য ছিল তুলনামূলকভাবে সহনীয়। সেই জিনি সহগ সর্বশেষ (২০১৬) বেড়ে হয়েছে ০.৪৮৩। অর্থাৎ আয়বৈষম্য অনেক অনেক বেড়েছে। এখন আমরা ভাবছি, আমাদের চেয়ে বেশি আয়বৈষম্য কোথায়!

সারাবিশ্বে অতিধনী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে আমাদের দেশেও। মাথাপিছু আয় ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমান কভিডকালে এর মান আরও ভয়াবহ। সরকারি খানা জরিপের তথ্যমতে, দেশের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের মালিক ওপরের দিকে থাকা এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য আকাশচুম্বী ব্যবধান কমাতে হবে।

আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয় যখন এর সুফল ভোগ করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের বেশিরভাগ মানুষ। যে প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে না, যার সুফল কেবল সমাজের উঁচুস্তরের নাগরিকরা ভোগ করে, ওই প্রবৃদ্ধি নিছক সংখ্যা। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বৈষম্য দূর করা না হলে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।

সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি না হলে বৈষম্য বাড়বেÑধনী আরও ধনী হবে, গরিব হবে আরও গরিব। এমনটি হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদপ্রবাহ বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য ও অসমতা দূর করতে হবে। কেবল সম্পদশালীদের প্রণোদনা-সুবিধা দিয়ে অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা সম্ভব নয়। আর্থিক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে সবাই।