প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সম্ভাবনাময় নদী পর্যটন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মারুফ হোসেন: বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশের বুক চিরে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী। তাই বাঙালির জীবনের পরতে পরতে নদীর প্রভাব বিদ্যমান। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির যোগাযোগ, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিÑসবখানেই নদীর ছাপ স্পষ্ট। কবিতা, গান, প্রবন্ধ, উপন্যাসসহ সাহিত্যের একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে নদীর কথা। দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি এই নদীর কথাই তুলে ধরেছেন। নদী আমাদের জীবনে আশীর্বাদস্বরূপ। আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া এ নদী আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করলেও আমরা কি নদীর বন্ধু হতে পেরেছি? আজ বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা দেখলে তার উত্তর সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। জবরদখল ও দূষণযন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মৃতপ্রায় নদীগুলো। অথচ এ নদী আমাদের নিঃস্বার্থভাবে উপকার করে যাচ্ছে। আসুন নদীগুলো ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি। নদীখেকোদের উৎপাত বন্ধ করি। নদী বাঁচলেই সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি। এগিয়ে যাবে পর্যটনশিল্প।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে নদী পর্যটন সম্ভাবনাময় একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে সেটি হতে পারে সোনায় সোহাগা। বাংলাদেশের অধিকাংশ শহর নদীর তীরে গড়ে উঠেছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে রাজধানী ঢাকা, কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশাল শহর ও কর্ণফুলী নদীর তীরে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম অবস্থিত। এছাড়া প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত বাংলার গ্রামগুলোও নদীর স্পর্শ থেকে মুক্ত নয়, বরং গ্রামের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে নদীর অবদান অপরিসীম।

রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণের শিকার। দখলদারি আর কলকারখানার বর্জ্যে একসময়কার প্রমত্তা নদীগুলো আজ মরণদশায় জর্জরিত। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এলে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করা কঠিন হলেও অসম্ভব কিছু নয়। এখনই সময় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালিসহ ঢাকার চারপাশের নদী ও খালগুলোকে দূষণমুক্ত করার। রাজধানী ঢাকার কর্মব্যস্ত মানুষের একটু অবকাশ যাপনের জন্য হলেও এ নদীগুলোকে দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে পর্যটনমুখী করে গড়ে তোলা দরকার।

নদী আর মানুষের সম্পর্ক অনেক গভীর। নদীর প্রতি ভালো লাগা মানুষের মধ্যে সব সময়ই থাকে। তাই তো নদীর তীরে বেড়ানো তরুণ-তরুণীদের পছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে উঠলে কিশোর-তরুণদের মোবাইলের স্ক্রিনবন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে আনা সহজ হবে। তারা প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে উঠবে। এ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে নদী সংরক্ষণের বিকল্প নেই। আবার নদী পর্যটন গড়ে উঠলে নদী রক্ষাও সহজ হবে। কেননা নদীতীরবর্তী মানুষ এ খাতে বিনিয়োগ করে লাভবান হবে। ফলে তারা নদীর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে এবং নদী রক্ষায় এগিয়ে আসবে।

দেশি কিংবা বিদেশি সব পর্যটকেরই নদীর প্রতি ঝোঁক রয়েছে। নৌকায় চরে নদীর তীরের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করা, সূর্যাস্ত দেখা, নদীপারের মানুষের সঙ্গে মেশা, তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানা প্রভৃতি বিষয় একজন পর্যটককে যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারেন তারা, যা পাঠ্যপুস্তক থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়। শহরে ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি শিশু-কিশোররা গ্রামবাংলার অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। ফলে তারা নিজেদের অজান্তেই দেশি সংস্কৃতি বাদ দিয়ে বিদেশি কালচারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। নদী পর্যটনের মাধ্যমে তাদের কাছে দেশি সংস্কৃতি তুলে ধরা সম্ভব হবে। মাঝির পালতোলা নৌকা কিংবা নৌকাবাইচের মতো বাংলাদেশের হারাতে বসা ঐতিহ্য আবার প্রাণ ফিরে পাবে। মোদ্দা কথা হলো, হাওর-বাঁওড়, খাল, বিল, ঝিল ও নদ-নদীতে ভরা এদেশে নদী পর্যটন গড়ে উঠলে তরুণরা নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে।

পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে, যাতে করে প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুন্ন থাকে, নদী প্লাস্টিক দূষণের শিকার না হয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন না হয়। পর্যটকদের অবশ্যই নদীতে বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেক পর্যটন এলাকায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপস বা বিস্কুটের প্যাকেট ইত্যাদি যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা পরিবেশ দূষিত করছে। আবার পর্যটন এলাকাকে কেন্দ্র করে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট, হোটেল-মোটেল ও ভবন স্থাপন করায় সেখানকার পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটনশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই। কাজেই পর্যটনশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে অনেক বেশি যতœশীল হতে হবে।

পর্যটনশিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। কিন্তু আমরা কি সেভাবে পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে পারছি? প্রতিদিন যখন বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় চুরি-ছিনতাই, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মতো খবর পত্রিকার শিরোনাম হয়, তখন পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সম্প্রতি কক্সবাজারে ধর্ষণের ঘটনা সে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে দিল। এছাড়া দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ পেলেই ঘুরতে আসা মানুষদের কাছ থেকে হোটেল ভাড়া কিংবা অন্যান্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে অতিরিক্ত দাম আদায় করে থাকে। পর্যটকদের যদি আমরা নিরাপত্তা না দিতে পারি, ভালো সুযোগ-সুবিধা না দিতে পারি, তাহলে পর্যটনশিল্প কী করে এগিয়ে যাবে?

বাংলাদেশের মতো দিগন্তবিস্তৃত শস্য-শ্যামল মাঠ, নদীনালা, খালবিল, পুকুর, হাওর-বাঁওড়সমৃদ্ধ এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ কোথায় আছে? দুঃখের বিষয় হলো, এমন একটি দেশ পেয়েও আমরা নদীকেন্দ্রিক পর্যটন গড়ে তুলতে পারিনি। তবে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা আমাদের আশান্বিত করে। পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী পর্যটন এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়