প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আশানুরূপ বিকশিত হয়নি চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্প

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটন শিল্প বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও সেটি তেমন বিকশিত হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের দূরদৃষ্টিহীনতা, অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ জ্ঞানের অভাব, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারের অভাবসহ নানা কারণে বিকাশের বাধাগ্রস্ত হয়। চট্টগ্রামের কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকা, নীলগিরি পাহাড়চূড়া, রামুর বৌদ্ধমন্দির, বান্দরবানের স্বর্ণমন্দির, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতসহ অনেক প্রাকৃতিক ও থিম পার্ককেন্দ্র রয়েছে। যা পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য। এতো সব সম্ভাবনা থাকার পর আশানুরূপ বিকশিত হচ্ছে না এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্প।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে চট্টগ্রামসহ পুরো দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও তেমন বিকাশ হয়নি। এর মূল কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া। সরকারে নীতিনির্ধারকদের দূরদৃষ্টিহীনতা, অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ খাত, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ জ্ঞান কম থাকায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার-প্রচারণার অভাবসহ সময়ে-অসময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানান কারণে বিকশিত হতে পারছে না দেশের পর্যটন শিল্প।
সেন্টমার্টিন হোটেলের চেয়ারম্যান এএসএম জাকির হোসেন মিজান বলেন, নৈসগিক সৌন্দর্যের অপার এক লীলাভূমি চট্টগ্রাম। দেশ-বিদেশ হতে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে আসে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। এ চট্টগ্রামে যেমন আছে সাগর, নদী, পাহাড়, তেমনি আছে জীব-বৈচিত্র্যেও বিপুল সমাহার। আর আছে নানান ধর্মের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন।
সড়ক পথে পর্যটন শহর কক্সবাজার যাওয়াটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক। ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি দখলদারদের কবলে পড়ে শুধু সরুই নয়, বেশ আঁকাবাঁকা এবং বেহাল। অনেক স্থানে দখল হয়ে যাচ্ছে মূল সড়কও। বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে পাথরের কার্পেটিং। চট্টগ্রাম থেকে তিন ঘণ্টায় কক্সবাজারে যাওয়া-আসার কথা থাকলেও লেগে যাচ্ছে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা।
কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবদুল খালেক সোহেল বলেন, ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চললেও তিন ঘণ্টায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু সরু রাস্তা, সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাট-বাজার ও সড়কের অনেক স্থানে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় গাড়ি ঠিকমতো চালানো যায় না। এতে কক্সবাজারে পৌঁছতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এ ছাড়া বাঁকগুলোর বিপদ তো রয়েছেই।
চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে প্রকল্পটি সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত হলো সেবা খাত। আর সেবা খাতের অন্যতম অঙ্গ পর্যটন খাত। এ খাতের উন্নয়নের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন করা হচ্ছে। এটা করা হলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকের আগমন বাড়বে। ফলে পর্যটন থেকে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, পর্যটন খাত বিকাশে প্রধান বাধা যোগাযোগ সমস্যা। যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে চট্টগ্রামের পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পর্যটন খাত বিকশিত হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে ভালো হোটেল, দক্ষ ও মানসম্মত সেবার অভাব, বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিনোদনের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা, যোগাযোগ ও যাতায়াত সমস্যা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সরকারের সুনজর ও পরিকল্পনার অভাবে এ খাতের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে পর্যটনে বাংলাদেশের সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কাও দেখছেন ভ্রমণবিষয়ক পাক্ষিক দ্য বাংলাদেশ মনিটরের সম্পাদক কাজী ওয়াহেদুল আলম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, প্রতিটি পর্যটন স্পটেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অবকাঠামো গড়ে ওঠে। যেগুলো প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে। সরকারের এদিকটায় কড়া নজরদারি রাখতে হবে।
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দর খান বলেন, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত সঠিক তথ্য ও উপাত্তের অভাব। তার সঙ্গে আমাদের স্বভাবজাত উচ্ছ্বাসের আতিশয্য তো আছেই। বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। পেনিনসুলা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা তাহসিন আরশাদ বলেন, বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় এ পর্যটন শিল্পকে পুরোমাত্রায় অর্থনৈতিকভাবে রূপ দেওয়ার জন্য সরকার ও ব্যক্তি উদ্যোগ উভয়েরই কিছু করণীয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান কাজ হলো সার্বিক নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বিধান করা, যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা নিরাপদে সারা দেশ ঘুরে বেড়াতে পারে, যা থেকে প্রচুর জাতীয় আয় বাড়ানো সম্ভব। আর ট্যুরিজমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের গড়ে তুলতে হবে জুুতসই পরিবহন ব্যবস্থা, তৈরি করতে হবে আধুনিক ও মানসম্পন্ন হোটেল, মোটেল ইত্যাদি। এগিয়ে আসতে হবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বস্ত ট্যুরিজম অপারেটর, ভালো সার্ভিস ও পর্যটন গাইড।