আনোয়ার হোসাইন সোহেল : দেশের চলমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার সংকট কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষ বা গণপরিবহনের জ্বালানি পাওয়া সহজ হবে। যদিও সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অফিস-আদালত তিন দিন খোলা রাখার কথা ভাবছে, তবে দেশের অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়। বরং দিনের আলোয় অফিসের কর্মঘণ্টা বাড়ানো দরকার।
অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্টজনেরা আরও বলেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হলে দেশে ভয়াবহ এ সংকট থেকে কিছুটা হলেও উত্তরণ ঘটবে।
প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের কর্মকর্তাদের পরিবহন ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্বান্ত নিয়েছে। অপরদিকে কর্মকর্তাদের অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।
জ্বালানি ব্যবহারে ৫০ শতাংশ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব স্তরের কর্মকর্তাদের অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিকেএসএফ। পাশাপাশি যথাসম্ভব বিদ্যুৎসাশ্রয়ী উপায়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনারও উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গত রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানায় পিকেএসএফ।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতায় সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সব প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তার জন্য এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পিকেএসএফের সব পর্যায়ের কর্মকর্তারা ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে দাপ্তরিক কাজে অফিসের গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবেন। এছাড়া অফিস ভবনে সীমিত মাত্রায় এয়ারকন্ডিশনার (এসি) ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম প্রদর্শনেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমদ শেয়ার বিজকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে সারের দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং ইনফ্লেশন রেট বেড়ে যেতে পারে। এসব কারণে জ্বালানি প্রাইমারি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এটা বিশ্বব্যাপী হচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে বেশি হবে কারও ক্ষেত্রে কম হবে। আমাদের জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা কম। কিন্তু আমরা জ্বালানি বেশি দামে কিনি। অতীতে সরকার জ্বালানি তেলে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়েছে। যদি আরও দিতে হয়, তা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দিতে পারে। সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সাড়ে ৮টার মধ্যে শপিং মল বন্ধ করতে হবে। তবে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার যে তিন দিনের ছুটির কথা চিন্তা ভাবনা করছে, তা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। বরং দিনের আলোতে কর্মঘণ্টা বাড়াতে হবে। গত সাত মাসে সরকার ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ করেছে। এই বোঝা আরও বাড়লে আমাদের অর্থনীতিতে বড় আঘাতের জন্য যথেষ্ট।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সারা দেশে স্কুলগুলোতে অনলাইন ও অফলাইনÑদুই পদ্ধতিতেই ক্লাস পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত একটি কার্যকর উদ্যোগ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সড়কে যানবাহনের চাপ কমানো। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে ব্যবহƒত জ্বালানির একটি বড় অংশ যানজটের কারণে অপচয় হয়। মানুষকে প্রতিদিন যাতায়াত করতে না হলে স্বাভাবিকভাবেই সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমবে, ফলে যানজটও হ্রাস পাবে এবং জ্বালানি সাশ্রয় হবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, অনেক দেশ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে থাকে। যেমন-কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দিনে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, অথবা জোড় ও বিজোড় নম্বর প্লেট অনুযায়ী গাড়ি চালানোর নিয়ম চালু করা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে সড়কে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ড. হোসেন বলেন, বর্তমানে রাইড শেয়ারিং সেবা ও গণপরিবহন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি ব্যবহার আরও কমানো সম্ভব। তবে তিনি মনে করেন, কেবল অনুরোধ করে জনগণকে এসব অভ্যাসে অভ্যস্ত করা কঠিন। অনেক সময় মানুষ ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করতে চায় না।
তিনি উদাহরণ হিসেবে বিদ্যুৎ খাতের কথা তুলে ধরে বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য মানুষকে সচেতন করা হলেও তা সবসময় কার্যকর হয় না। কিন্তু লোডশেডিংয়ের মতো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ব্যবহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের ফলে জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ে, যা আবার জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি করে।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও পরিণতি ভালোভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এই সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা সম্ভব।
ইজাজ হোসেন আরো বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে সরকারি কর্মকর্তারা গণপরিবহন ব্যবহার করলে একদিকে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে সারা দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি হবে।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই পরিস্থিতি রাজস্ব স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সামষ্টিক অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। দেশের আর্থিক সক্ষমতা, ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা ও বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতির অবস্থা পরিষ্কারভাবে নিরূপণ না করে জ্বালানি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ভুল পথে যেতে পারে।
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুল কাদের শেয়ার বিজকে বলেন, অন্যদের উৎসাহ দিতে আমরা আমাদের অফিসে জ্বালানি সাশ্রয়ে কাজ করছি। অনেক আগে থেকেই আমরা মাঠ পর্যায়ে এনার্জি অ্যাফিসিয়ান্সি নিয়ে কাজ করছি, যাতে উৎপাদন বাড়ে এবং আগের চেয়ে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। আমরা আমাদের ২০ হাজার ব্রাঞ্চকে একাজে উদ্বুদ্ধ করেছি। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করার কথা বলছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অডিট করেছি, কীভাবে ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কাজ করা যায়। এক্ষেত্রে আইইউটি-বেইজড কিছু সিস্টেম চালু করেছি। পানির ট্যাঙ্কিতে পানি ওঠাতে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়। এজন্য ব্যবহারকারীরা কলের সামনে হাত দিলে যেন পানি পড়ে, আর হাত সরালেই যেন পানি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া রুমে ঢুকলে লাইট চালু হবে আর বের হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি বন্ধ হয়ে যাবে।
সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের জ্বালানি সাশ্রয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন: বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন তার রুমে এসে বন্ধ রেখেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ সচিবালয়ের কয়েকটি মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে সিনিয়র সচিব, সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবের রুমে এসি বন্ধ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যুৎ বিভাগ) মো. সবুর হোসেনের রুমের এসি বন্ধ ছিল।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের একান্ত সচিব ড. একেএম তাজকির-উজ-জামানের রুমে গিয়েও এসি বন্ধ পাওয়া যায়।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহƒত গাড়ির কোনো সুনির্দিষ্ট বা হালনাগাদ তালিকা বর্তমানে সরকারিভাবে নেই। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহƒত গাড়ির হিসাব নেওয়ার জন্য একনেক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ডিসি ও ইউএনওদের জন্য ২০০ নতুন পাজেরো জিপ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জ্বালানি তেলে সরকার প্রতিদিন গড়ে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।
প্রতিবেশী কোনো কোনো দেশ তেলের দাম বাড়িয়েছে। শতাংশের হিসেবে পেট্রোলের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অস্ট্রেলিয়ায়Ñ প্রায় ৪২ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে এক লিটার পেট্রোল কিনতে খরচ হচ্ছে ১৩৭ দশমিক ৭৭ টাকা। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ আর্থিক সংকটের প্রতিফলন দেখা গেছে তেলের বাজারেও; সেখানে দাম বেড়েছে ৩৩ দশমিক ৮০ শতাংশ, এতে বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩৭.৩৫ টাকা। এছাড়া পাকিস্তানে দাম ২৪ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ১৪৩ দশমিক ০৩ টাকায় উঠেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১১টি নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তারা যদি জ্বালানিসাশ্রয়ী হয়, দেশে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post