সাক্ষাৎকার

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এগিয়ে যাবে জীবন বিমা খাত

দেশের প্রথম সারির বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানি পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও বিএম ইউসুফ আলী। একই সঙ্গে তিনি বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জীবন বিমা খাতের চলমান সংকট-সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পলাশ শরিফ

শেয়ার বিজ: জীবন বিমায় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির তুলনায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনার কোম্পানিগুলো ভালো করছে। এর মূল কারণ কী?

বিএম ইউসুফ আলী: বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাফল্যের কারণ হচ্ছে কোম্পানি কর্মী-কর্মকর্তা ও বোর্ড সার্ভিসটা একটু ভালো দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ সার্ভিস ভালো না হলে মানুষ আসবে না। সাধারণত সরকারি কোম্পানির প্রতি মানুষের আস্থা বেশি থাকে। কিন্তু বিমার ক্ষেত্রে বেসরকারি কোম্পানির দিকে মানুষের আগ্রহ বেশি। কারণ এখানে সেবাটা স্বল্প সময়ে পাওয়া যায়। এখানে কর্মকর্তাদের ওপরও বড় চাপ থাকে। তাই সরকারি জীবন বিমা করপোরেশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম।

শেয়ার বিজ: পপুলার লাইফের অর্জন সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বলুন…

ইউসুফ আলী: আমরা ইতোমধ্যে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ম্যাচুরিটি ক্লেইম পরিশোধ করেছি। সেখানে বিমা গ্রাহকের সংখ্যা ২৬ লাখেরও বেশি। মাত্র সাড়ে তিন বছরে এত বেশিসংখ্যক মানুষের দাবি পরিশোধ করার কারণে পপুলার লাইফের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে মানুষ এখনও বিমাকে বিশ্বাস করে না। কিন্তু পপুলার লাইফকে বিশ্বাস করে। কারণ দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলেই পপুলার লাইফের সুফলভোগী গ্রাহক আছেন। পাশের মানুষ বিমা করে সুফল পাওয়ায় আস্থা তৈরি হয়েছে। তাই আমাদের প্রবৃদ্ধি অনেক ভালো। সবচেয়ে মজার বিষয়Ñযারা টাকা পেয়েছেন, তাদের অনেকেই নতুন করে বিমা করছেন। কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়েও কাজ করছেন।

শেয়ার বিজ: কোন ধরনের বিমার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি?

ইউসুফ আলী: আমাদের বিভিন্ন বিমা প্রকল্পের মধ্যে ডিপিএসটা খুব ভালো চলছে। কারণ মানুষ মাসে মাসে সুবিধামতো এটা দিতে পারে। এজন্য এটা বেশ ভালো বিক্রি হয়। এরপর রয়েছে তিন কিস্তি বিমা। এছাড়া মেয়াদি বিমা ও শিক্ষা বিমাও ভালো চলছে।

শেয়ার বিজ: জনসংখ্যার তুলনায় দেশের বিমা খাতের অবস্থা বর্তমানে কেমন?

ইউসুফ আলী: আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি এগিয়েছি। কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এখন সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করছে। তারা এ খাতের উন্নয়নে কাজ করছে। সংস্থাটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এটি এখন যে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ে শক্তিশালী। ওই সংস্থার উদ্যোগের কারণেই বিমা খাত এগিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার বিজ: বিমা কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে যাওয়ার প্রবণতা কম। এটা আপনি কীভাবে দেখেন?

ইউসুফ আলী: পুঁজিবাজারে যাওয়াটা সব কোম্পানির জন্য জরুরি। কারণ পুঁজিবাজারে না গেলে সেটা জনগণের হয় না, প্রাইভেট থাকে না। আর প্রাইভেট না থাকলে মানুষের আগ্রহ থাকে না। অন্যদিকে পাবলিক কোম্পানিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারি কোম্পানির মতোই ধরে নেওয়া হয়। সেখানে সবার অংশগ্রহণ থাকে। তাই প্রত্যেকটি কোম্পানিরই আইনি নির্দেশনা মেনে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: বিমা খাতের পিছিয়ে পড়ার পেছনের কারণগুলো সম্পর্কে বলবেন কী?

ইউসুফ আলী: বিমা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আমরা পাই না। এর আগে গণশিক্ষা প্রকল্প চালুর সময়ে প্রচারের জন্য সরকারিভাবে রেডিও-টিভিতে প্রচার চালানো হয়েছে। স্যানিটারি ল্যাট্রিন, পরিবার পরিকল্পনা নিয়েও একইভাবে প্রচার চালু হয়েছে। প্রচারের কারণে ওই প্রকল্পগুলো সফল হয়েছে। কিন্তু বিমার প্রচারের ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নেই। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিমা খাতকে অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া যাবে। এ দেশে বিমার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এখন রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

শেয়ার বিজ: চলমান অসুস্থ প্রতিযোগিতা কাটিয়ে উঠতে করণীয় কী?

ইউসুফ আলী: বিমা খাত অসুস্থ প্রতিযোগিতায় রয়েছে। যার সুযোগে এ খাত নিয়ে অপপ্রচার চলছে। সমসাময়িক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে জীবন বিমা কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হলে এ অবস্থা হতো না। একসঙ্গে অনেক কোম্পানি আসার কারণে জনবল সংকট প্রকট হয়েছে। কর্মী নিয়ে টানাটানি চলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা নিজেরাও কাজ করছি। আশা করছি ধীরে ধীরে অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমে আসবে।

শেয়ার বিজ: জীবন বিমা ব্যবসার বড় অংশই একটি বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। বহুজাতিক কোম্পানিটির এগিয়ে থাকার কারণ কী?

ইউসুফ আলী: সেটি অনেক পুরোনো বহুজাতিক একটি কোম্পানি। পাকিস্তান আমলে দেশে প্রায় ৬৭টি বিমা কোম্পানি ছিল। পরবর্তীকালে সেগুলোকে সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা করপোরেশনের সঙ্গে মার্জ করা হয়েছে। কিন্তু বিমা কোম্পানিগুলো একসঙ্গে হলেও গ্রাহক পাওনা টাকা পাননি। পেলেও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাই বিমা সম্পর্কে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। মূলত গ্রাহকের আস্থার কারণেই কোম্পানিটি কয়েক দশকে এগিয়েছে। আমাদের দেশে বেসরকারি বিমা কোম্পানিগুলো এসেছে অনেক পরে। তাই জুনিয়র হওয়ায় আমরা বিদেশি কোম্পানিটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..