দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা সাক্ষাৎকার

‘সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন হয়নি ওষুধ নীতি’

দেশের মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধই একসময় বিদেশ থেকে আমদানি হতো। কালের বিবর্তনে এখন পুরোপুরি তার উল্টো চিত্র। এখন ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশে তৈরি হচ্ছে। আমদানি করা লাগে মাত্র দুই শতাংশ। ওষুধ খাতের এ অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে সরকারের নানা সহায়ক নীতি। এসব নীতির মধ্যে অন্যতম ১৯৮২ সালে প্রণীত ওষুধ নীতি। এটি তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ওই নীতির হাত ধরে বিস্তৃতি লাভ করে দেশের ওষুধ খাত। স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ হিসেবে মেধাস্বত্ব সুবিধা পেতে থাকে বাংলাদেশ। এভাবেই ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। দেশের ওষুধ শিল্পের ইতিহাস ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে সম্প্রতি শেয়ার বিজের মুখোমুখি হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শেখ সাজিদ

শেয়ার বিজ: ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক বলা চলে ওষুধ খাতে বিপ্লব সাধিত হয়েছে নীতির হাত ধরে ওই নীতির ফলে কম দামে ওষুধ পেতে শুরু করে সাধারণ মানুষ কিন্তু প্রায় ৪০ বছরের বিবর্তনে সে নীতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সরকার ওষুধের দাম অনেক বেড়ে গেছে বলা হচ্ছে যে, সিন্ডিকেট করে ওষুধের দাম বাড়ানো হচ্ছে বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতিটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত পৃথিবীর প্রথম ওষুধ নীতি। এটা নিঃসন্দেহে ওই সময়ের সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। এ নীতির ফলে মানুষ কম দামে ওষুধ পাওয়ার পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওষুধ তৈরির সুযোগ পায়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে একটা দুর্ভাগ্য নেমে আসে। সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের পরামর্শে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ নীতি অনেকটা পরিবর্তন করেন। এ নীতির একটা বৈশিষ্ট্য ছিল যে, কোনো ওষুধের দাম কোম্পানি নির্ধারণ করতে পারবে না। সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করবে সরকার। কারণ ওষুধ কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এটি এমন একটি পণ্য, যেটি কেনার জন্য জনগণ পয়সা দেয় ঠিকই, কিন্তু এর গুণাগুণ জনগণ নির্ণয় করে না। যেমন শাড়ি বা পারফিউমের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে যিনি পয়সা দেন, তিনিই নির্ণয় করেন তার পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টা। কিন্তু ওষুধের ক্ষেত্রে ডাক্তারদেরও পড়ানো হয় না যে, কীভাবে এর মূল্য নির্ধারণ হয়। আর সাধারণ জনগণ তো এ বিষয়ে কিছুই জানে না। সে কারণে ১৯৮২ সালের নীতিতে আমরা বলেছিলাম, সব ধরনের ওষুধের মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে; অবশ্য পর্যাপ্ত লাভ বিবেচনা করেই। এই লাভটা কত হবে, সেটা পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যাবে। ১৯৮১ সালকে যদি আমরা ভিত্তি ধরি, তাহলে দেখা যাবে, ওই সময় সারা বছরে বেক্সিমকোর বিক্রি ছিল মাত্র ২৯ লাখ থেকে ৩২ লাখ টাকা। এখন তারা প্রতি ঘণ্টায় তার চেয়ে বেশি মূল্যের ওষুধ বিক্রি করে। এটা হলো ওষুধ নীতির সুফল। তখন স্কয়ার কোম্পানির সারা বছরের বিক্রি ছিল এক কোটি টাকা। সেটা এখন কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা হলো কুকুরের লেজের মতো। একটু হলেই বাঁকিয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে তারা যখনই সুবিধা পেয়ে বসল, তখন তারা বাড়াতে শুরু করল।

খালেদা জিয়া না বুঝেই সালমান এফ রহমানের পরামর্শে নীতিটি সংশোধন করেছিলেন। তখন তাকে বোঝানো হয়েছিল, আমাদের ওষুধ রপ্তানিতে সুবিধা হবে, দাম নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণটা উঠিয়ে দেন। এটা খালেদা জিয়াকে বোঝানো হলো। আর ওই সময় যিনি সচিব ছিলেন, তাকে বলা হলো যে, আপনাকে বিশ্বব্যাংকে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেব, আপনি এই বিশ্বাসঘাতকতাটি (প্রজ্ঞাপন জারি) করেন। এভাবেই সর্বনাশটা ডেকে আনা হয়। ১৯৯৪ সালে মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে দাম নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়া হয়।

ওই সময় যা করা হলো তা হলো ভ্যাকসিনসহ ১১৭টি ওষুধের মূল্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। আর বাকি সব ওষুধের দাম কোম্পানি নির্ধারণ করবে। কোম্পানি যে দামটি নির্ধারণ করে তার নাম হলো ইন্ডিকেটিভ প্রাইস (নির্দেশক মূল্য)। আর যেটা সরকার নিয়ন্ত্রণ করে সেটির দাম হবে এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য)। এখন যেটা করা হয়, কোম্পানি ওষুধের দাম নির্ধারণ করে তারা সেটা নিয়ে যায় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে। পরে সে দাম চূড়ান্ত হয়। এটা হচ্ছে ইন্ডিকেটিভ প্রাইস। যে কারণে এগুলোর দাম হু হু করে বাড়ছে। অন্যদিকে সরকার যে ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলোর মধ্যে এর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনাসংক্রান্ত ওষুধ আছে (ফ্যামিলি প্ল্যানিং), ভ্যাকসিন আছে, প্যারাসিটামল আছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন এগুলোর দাম ১৯৯৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বছরের ব্যবধানে তেমন একটা বাড়েনি। ৫-৭ শতাংশও বাড়েনি। আর অন্যগুলোর দাম শতগুণ বেড়ে গেছে।

সুতরাং আমার কথা হলো ব্যবসায়ীদের কাছে জনগণের স্বার্থ ছেড়ে দেয়া যাবে না। কিন্তু ১৯৯৪ সালেই ওষুধ নীতির সর্বনাশটা হলো। খালেদা জিয়া এই ভুলটা করলেন। কিন্তু শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তিনি এটি পরিবর্তন করেননি।

ওষুধের যখন দাম বাড়ে, তখন ওষুধে ভেজালও বাড়ে। ওষুধ নকল হওয়ার বিষয়টিকে বলে কাউন্টারফিট। সারা পৃথিবীতেই এই প্রবণতা দেখা যায়। আমি ডব্লিউএইচওতে প্রায়ই একটা প্রশ্ন করতাম, তা হলো আমাকে একটা উদাহরণ দাও যে, কম দামি ওষুধ নকল হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও কম দামি ওষুধ নকল হওয়ার রেকর্ড নেই। ওষুধের দাম যত বেশি হবে, তার নকল-ভেজাল হওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। ঠিক একই ঘটনা ঘটবে বেসরকারি খাতে ভ্যাকসিন আনা হলে। এখানে কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে না যে, ভারত থেকে যে ভ্যাকসিন আসছে সেটা মানুষের ভ্যাকসিন, নাকি মুরগির ভ্যাকসিন। ফলে যেটা হবে, সরকারি যে ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেয়া হয়, সেটা চুরি হয়ে ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে বাজারে বিক্রি হবে। সে জন্য ওষুধের মূল্য একটি বিরাট ব্যাপার। এটা সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে। এখন সবাই বেশি দাম দিয়ে খারাপ ওষুধ কিনছে।

১৯৮২ সালের ওষুধ নীতিতে ১৬টি নীতিমালা ছিল। এর মধ্যে একটি বিষয় ছিল যে, নিজস্ব কারখানা না থাকলে কেউ ওষুধ বানাতে পারবে না। এক্ষেত্রে থার্ড পার্টি লাইসেন্স বলে একটি বিষয় আছে। যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বিনিয়োগ না করেও ওষুধ বানাতে পারে। তোমার ওষুধটা আমার কোম্পানিতে বানালাম; কিন্তু সিলমোহরটা তোমার। অথচ এখানে তোমার কোনো বিনিয়োগ নেই। এসব কারণে ওই ওষুধ নীতিটা যুগান্তকারী ছিল। দুর্ভাগ্যবশতও ওষুধের দাম বাড়ছে সরকারের কারণে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, ওষুধের যত দাম বেড়েছে, তা হয়েছে সরকারের মনোরঞ্জনকারীদের কারণে।

শেয়ার বিজ: কভিডের কারণে আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা খুবই নাজুক খাতকে ঢেলে সাজাতে সরকার বেসরকারি খাতকে কী ভূমিকা নিতে হবে বলে আপনি মনে করেন?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: প্রথমত সবচেয়ে বড় যে বিষয় তা হলো, তৃণমূলে ডাক্তার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে কিছুই হবে না। আমাদের একটি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ৩০-৫০ হাজারের মতো লোক বসবাস করে। আগামী ১০ বছরে তা এক লাখে পৌঁছে যাবে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে, একটি ইউনিয়নে ৫০ হাজার লোক একজন ডাক্তারেরও চেহারা দেখতে পাবে না। এটা হতে পারে না। আমি অনেকবার বলার পর প্রধানমন্ত্রী নিয়ম করলেন যে, যারা নতুন ডাক্তার হবেন, তাদের সবাইকে ইন্টার্নশিপের সময় কমপক্ষে এক বছর বাধ্যতামূলকভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকতে হবে। তিনি এটা ঘোষণা দিলেন, প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে সে প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নেয়া হলো। সে জন্য কোনো ব্যবস্থাপনায় কাজ হবে না, যতক্ষণ না পদ্ধতি ঠিক করা হচ্ছে।

শুধু যে চিকিৎসকরাই গ্রামে থাকতে চান না তা নয়, এমনকি প্রশাসনের লোকজনও অবস্থান করেন না। তারা ঢাকা শহরে বা বড় শহরে পরিবারকে রাখেন, আর কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। আর এই দুই জায়গায় পরিবার থাকাটাও ঘুষ খাওয়ার অন্যতম কারণ। কেননা অতিরিক্ত যে ব্যয় হয়, তা তো জোগাড় করতে হবে। এ জন্য এসব কিছু যদি ঢেলে সাজানো না হয়, তাহলে হবে না।

এখন টিকার ব্যাপারে আসা যাক। এ টিকা যতটুকুই পাওয়া গেছে, তা কারা আগে পাবে? দেখা যাবে যার বেশি প্রয়োজন সে পাবে না। সরকার অগ্রাধিকারের তালিকা করেছে। তারা বলছে, আগে পাওয়ার তালিকায় রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মী। ঠিক আছে, তারা এক্সপোজড হচ্ছেন (সম্মুখযুদ্ধে আছেন)। তারপরে আছেন পুলিশ, সামরিক বাহিনী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু এ অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা উচিত রিকশাওয়ালা। যে আমাদের জীবনযাত্রা সচল রেখেছে। আমাদের কৃষক-শ্রমিক, যারা খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছেন। আর বয়োবৃদ্ধরা অবশ্যই ভঙ্গুর অবস্থায় আছেন। সুতরাং অগ্রাধিকারের চিন্তাই করা উচিত অন্যভাবে।

আজকে সরকার বলছে, ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। অথচ সরকার যদি মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তাহলে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র হবে বাংলাদেশে। আর ভ্যাকসিনের দাম হবে এক ডলারের কম। সেটা করা হলে দেশবাসী লাভ হবে, সরকারের লাভ হবে; কিন্তু ব্যবসায়ীদের কোনো লাভ হবে না। আর সরকার তো চলছে ব্যবসায়ীদের দ্বারা। সুতরাং সরকার এসব কোনো কিছুই করবে না। এজন্যই বলছি, জবাবদিহিতামূলক প্রকৃত গণতন্ত্র না থাকলে দেশের কোনো মঙ্গল হয় না।

শেয়ার বিজ: ওষুধ নীতির সুবাদে আমরা জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করছি, প্রকৃত পক্ষে আমরাকপি করছি নিজস্ব কোনাে গবেষণা নেই সেরামের মতো প্রতিষ্ঠান কি বাংলাদেশে তৈরি সম্ভব নয়?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: সেরামকে আপনারা খুব বেশি উপরে উঠাচ্ছেন। আমি সেরামকে তার জন্মকালেই দেখেছি। আমি সেখানে কয়েকবার গিয়েছি। এটা ছিল ঘোড়ার প্রজনন কেন্দ্র। এ কারণেই এটির নাম সেরাম। এটি কিন্তু ম্যানুফ্যাকচারিং এজেন্ট, গবেষণা কেন্দ্র নয়। এটা কিন্তু আপনাদের মনে রাখতে হবে। অন্যরা গবেষণা করে, তারা সেখানে সেটা তৈরি করে। যেমন আমাদের এতগুলো ওষুধ কারখানা আছে। কিন্তু আমরা তো ওষুধ আবিষ্কার করিনি। তবে আমরা ওষুধ বানাতে পারি। এটা অনেকটা ভাত রান্না করার মতো। এটার মধ্যে আবিষ্কারের কিছু নেই। সেই আদিকালে মানুষ দেখেছে পানির মধ্যে চাল দিয়ে আগুনে জাল দিলেই ভাত হয়। এভাবেই সবাই শিখেছে। এটা তো আবিষ্কারের কিছু নেই। এজন্য আমাদের গবেষণা দরকার। আমি যেটা বললাম, ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গবেষণাগার হবে। গবেষণা কেন্দ্র হলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের ভাড়া করে আনা যায়, প্রযুক্তিবিদ আনা যায়, আমাদের দেশের লোকজনও আছে। এরপর দরকার ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট। এটা তেমন কঠিন কিছু নয়। আমরা এখন ওষুধ বানাই, তখন ভ্যাকসিনও বানাতে পারব। কিন্তু সেটা করতে হলে সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। ভ্যাকসিন গবেষণায় টাকা লাগে অনেক। কিন্তু উৎপাদন খরচ খুব কম। ওটাতে প্রতিটির খরচ এক ডলারও পড়বে না। এক ডোজ ভ্যাকসিন বানাতে ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ হবে।

শেয়ার বিজ: টিকা নিয়ে সারা বিশ্বে কী হচ্ছে এবং দেশে কী হচ্ছে বলে মনে করেন?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: টিকার দরকার আছে। কিন্তু টিকার সব তথ্য এখনও জ্ঞাত হয়নি। সে জন্য আমি বারবার বলছি, টিকা যা এসেছে এর প্রথম টিকাটি নেয়া উচিত আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। আর সেটা নেয়া উচিত টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে। এতে নিরাপত্তা (সেইফটি) নিয়ে মানুষের ভয়ভীতিটা দূর হবে। তারপরে নেয়া উচিত রাষ্ট্রপতির। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে যদি আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভ্যাকসিন নেন, তাহলে মানুষের মনে আস্থা জš§াবে যে, ভয়ভীতি কমে আসবে। লোকজন তখন ভ্যাকসিন নিতে আসবে। আর মন্ত্রীরা এক একটা জেলায় গিয়ে তারা ভ্যাকসিন নিয়ে শুরু করবেন। এটি হওয়া উচিত। আমার মতে, ভ্যাকসিন সবচেয়ে বেশি দরকার যাদের, তারা হচ্ছেন সবচেয়ে এক্সপোজড মানুষ যারা। যেমন রিকশাওয়ালা, নৌকার মাঝি, ট্রাক ড্রাইভার, বাস ড্রাইভার। এরা অনেক বেশি এক্সপোজড। এরা লোকজনের সঙ্গে চলাফেরা করে। এদেরকেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এরপরে রয়েছেন আমাদের কৃষক-শ্রমিক। কিন্তু প্রথম তালিকার মধ্যে এদের নামই নেই। এটা দুর্ভাগ্যজনক।

শেয়ার বিজ: দেশে ফাইজারের মতো প্রতিষ্ঠান করা কি সম্ভব? এর জন্য কী দরকার?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: ফাইজার একটা ওষুধ কোম্পানি। ফাইজারের অন্যান্য কার্যক্রমও আছে। আপনি ফাইজারের নাম বললেন। আপনার বলা উচিত ছিল অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার নাম। অক্সফোর্ড হলো সেই বিশ্ববিদ্যালয়, যারা প্রথম পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু তারা সেটার প্যাটেন্ট করেনি। আর যে ৯টি পাত্রে তারা পেনিসিলিন তৈরি করেছিলেন, তার একটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে দান করেছিলেন; যা বর্তমানে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সংরক্ষিত আছে। আপনারা চাইলে সেটা দেখে আসতে পারেন। আমাদের দেশে গবেষণা হচ্ছে না। গবেষণষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিনিয়োগ করছে না। আবার যতটুকু বিনিয়োগ আছে, সেটিরও যথার্থ ব্যবহার হচ্ছে না। এতে সরকারের আগ্রহ নেই। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এটির ব্যাপারে সরকারি মদদ নেই, উৎসাহ নেই। এটাতে আমাদের অনেক বেশি নজর দেয়া উচিত।

শেয়ার বিজ: দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভঙ্গুর হওয়া সত্ত্বেও কভিড মোকাবিলায় অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো করেছে এর কারণ কী?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: এটা নিয়ে গবেষণার দরকার আছে। আমাদের মহামারি গবেষকদের উচিত এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা। যেমন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্প। সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন নেই, পর্যাপ্ত পানি নেই। সেখানকার মানুষের শরীরে করোনাও নেই। কারণটা কী? গ্রামগঞ্জে তো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অনুপস্থিত। সেখানেও করোনা নেই। কেন নেই, তা নিয়ে গবেষণা দরকার। একটা বিষয় অবশ্য ঘটছে, প্রকৃত শনাক্তের চেয়ে কম দেখানো হচ্ছে (আন্ডার রিপোর্টিং)। তবে তা সত্ত্বেও আমাদের সংক্রমণের হার কমই আছে।

গ্রামগঞ্জে করোনা কম। তার একটা কারণ হলোÑ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে করোনার লক্ষণ দেখা যায় না। জ্বর হলেই সে ডাক্তারের কাছে দৌড়ায় না। আমরা নগরবাসী যেটা করি। এটা একটা কারণ। আরেকটি বিষয় হতে পারে, তবে আমি নিশ্চিত নয়। এটা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। বিষয়টি হলোÑআমাদের এখানে রোগশোক অনেক বেশি। মোহাম্মদপুরের কথাই যদি ধরি, বিহারি ক্যাম্পে ছোট একটি কক্ষে ১০-১২ জন মানুষ বসবাস করে। সব ধরনের জীবাণু সেখানে রয়েছে। তারা এসব জীবাণুর সঙ্গে থাকতে থাকতে সেগুলো প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো পাড়ায় যদি দুটি কুকুর থাকে, তাহলে তারা তৃতীয় কুকুরকে আসতে দেয় না। সে ঘেউ ঘেউ করে। অন্য কাউকে আসতে দেয় না। তেমনিভাবে বিহারি ক্যাম্পে এত জীবাণু আছে যে, তারা নতুন জীবাণুকে ঢুকতে দেয় না। এ জাতীয় একটা পরিস্থিতি হয়তো কাজ করছে। তবে এটা নিয়ে আমাদের আত্মতুষ্টির পরিবর্তে এ নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।

শেয়ার বিজ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: শেয়ার বিজকেও ধন্যবাদ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..