দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সরকার ও বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বিস্তর ব্যবধান

জিডিপির অনুপাতে রাষ্ট্রীয় ঋণ

মাসুম বিল্লাহ: মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে একটি রাষ্ট্রের মোট ঋণসীমা কত শতাংশ হওয়া উচিত, তা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত কোনো মানদণ্ড নেই। একটি দেশ তার দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তি ও অর্থনীতির আকারের ওপর ভিত্তি করে ঋণ গ্রহণের মাত্রা নির্ধারণ করে। তবে ঋণের হিসাবটা সঠিকভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশেরও রাষ্ট্রীয় ঋণের একটি নির্দিষ্ট হিসাব রয়েছে। কিন্তু করোনাকালে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়ে যে প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে, সরকারের হিসাবের সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ‘বিটেন অর ব্রোকেন’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। ওই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস অংশে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে জানানো হয়, বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের চূড়ান্ত হিসাবে ঋণ জিডিপি অনুপাত দাঁড়াবে ৩৯ দশমিক দুই শতাংশ। আর সরকারের হিসাবে এ অনুপাত দাঁড়াবে ৩৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাতের যে প্রাক্কলন সংস্থাটি দিয়েছে, তার সঙ্গে সরকারের প্রাক্কলনের ব্যবধান বিস্তর। সংস্থাটি বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের ঋণ জিডিপি অনুপাত বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এ অনুপাত দাঁড়াবে ৩৫ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। আগামী অর্থবছরের ঋণ-জিডিপি অনুপাত বিষয়ে বিশ্বব্যাংক যে প্রাক্কলন দিয়েছে, সেটিও অনেক বেশি। সংস্থাটির হিসাবমতে, ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়াবে ৫১ দশমিক চার শতাংশ। অথচ সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ওই সময়েও ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৬ শতাংশের বেশি হবে না।

সরকারের হিসাবের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনের এত বড় ব্যবধানের কারণ কী হতে পারেÑসে বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এই হিসাবের একটি যোগসূত্র রয়েছে। বিশ্বব্যাংক যেহেতু বাংলাদেশের জিডিপির প্রাক্কলন কম হারে করেছে, তাই সেটির ভিত্তিতে ঋণের অনুপাত হিসাব করলে জিডিপির অনুপাতে আকারটা বড় দেখাবে। আর সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করছে, সেটির ভিত্তিতে ঋণ-জিডিপি অনুপাত হিসাব করলে ঋণের অনুপাতটা কম হবে। মূলত এ কারণেই ব্যবধানটি সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর বিশ্বব্যাংক বলছে, এ প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশ। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরে আট দশমিক দুই শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করেছে সরকার। আর বিশ্বব্যাংক বলছে, এটি হবে মাত্র এক দশমিক ছয় শতাংশ। এই মাত্রার প্রবৃদ্ধি মোট জিডিপির সঙ্গে যুক্ত করে তার ভিত্তিতে যদি ঋণের অনুপাত বের করা হয়, তাহলে সরকারের প্রাক্কলিত ঋণ-জিডিপি অনুপাতের তুলনায় অঙ্কটি বড় দেখাবে। আগামী অর্থবছরের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে তিন দশমিক চার শতাংশ। ওই অর্থবছরেও সরকারের প্রাক্কলন আট দশমিক দুই শতাংশের বেশি। যদি বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, আর ঋণ গ্রহণের চলমান মাত্রা অব্যাহত থাকে, তাহলে ঋণ-জিডিপি অনুপাত সরকারের প্রাক্কলিত ধারায়ই প্রবাহিত হবে। আর ঋণ গ্রহণের চলমান মাত্রা অব্যাহত থাকার বিপরীতে যদি বিশ্বব্যাংকের ধারণা করা প্রবৃদ্ধি সত্যি হয়, তাহলে জিডিপির অনুপাতে ঋণের অনুপাত বেড়ে যাবে।

সরকার মূলত দুটি উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে। একটি অভ্যন্তরীণ উৎস, অন্যটি বৈদেশিক উৎস। বর্তমানে সরকারের ঋণের স্থিতি ১০ লাখ কোটি টাকার মতো। এ ঋণের দুই-তৃতীয়াংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এসেছে। দেশীয় উৎসের মধ্যে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকেই ঋণ গ্রহণ করে সরকার। আর বৈদেশিক উৎসের মধ্যে রয়েছে বহুপক্ষীয় উৎস ও দ্বিপক্ষীয় উৎস। বহুপক্ষীয় উৎসের মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) ও এআইআইবি। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকেই সবচেয়ে বেশি ও কম সুদের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় ধীরে ধীরে সুদহার বাড়ছে। দ্বিপক্ষীয় উৎসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ আসে জাপান থেকে। তাদের ঋণের সুদও অনেক কম।

বর্তমানে প্রতিবছর দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে (ঋণসেবা) প্রতিবছর জিডিপির দুই দশমিক ৫৭ শতাংশের মতো অর্থ ব্যয় হয়। এর মধ্যে সিংহভাগই যায় অভ্যন্তরীণ ঋণ ও সুদ পরিশোধে। ফলে ওই অর্থটি দেশেই থাকে। বৈদেশিক ঋণের প্রাক্কলন ও হিসাব করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। তাদের হিসাবমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে দেশে মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল দেশের মোট জিডিপির ১৪ দশমিক সাত শতাংশ। আর অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ২০ শতাংশের মতো। ইআরডি বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বৈদেশিক হিসাব এখনও চূড়ান্ত করতে পারেনি। আগামী ডিসেম্বরে বৈদেশিক ঋণের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করা হবে বলে ইআরডির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সে সময় ঋণ-জিডিপি অনুপাত দাঁড়াবে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ। ওই সময় প্রতিবছর ঋণসেবা কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় হবে জিডিপির তিন দশমিক ২৮ শতাংশ। অথচ বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, বিগত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবেই বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৪০ শতাংশের কাছাকাছি হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, করোনার কারণে সরকারকে নানা ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এ জন্য কিছুটা ঋণও বাড়াতে হয়েছে। এতে করে প্রাক্কলনের চেয়ে ঋণ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক ঋণ-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির যে প্রাক্কলন দিয়েছে, সেই হারে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই। তারা কীসের ভিত্তিতে হিসাব করেছে, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে। আর বাংলাদেশ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও সহনীয় মাত্রায়ই অবস্থান করছে। ঋণ-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে যা রয়েছে, তার থেকে ১০-১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়লেও ঝুঁকির কিছু নেই।

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি। এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। তবে তাদের অর্থনীতির ভিত্তি অনেক শক্তিশালী। তাই ঋণের মাত্রা বেশি হলেও তাদের অর্থনীতিতে তেমন ঝাঁকুনি লাগে না। তবে সাধারণত একটি রাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের মাত্রা জিডিপির ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত বলে বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করেন। সে হিসাবে বাংলাদেশের আরও ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা রয়েছে। তবে হঠাৎ করে ঋণের সীমা বাড়িয়ে দেওয়াও যুক্তিযুক্ত নয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..