দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সহসাই চালু হচ্ছে না এমারাল্ড অয়েল

পুঁজিবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ ধসের পর ২০১১ সালে পুনর্গঠন করা হয় বিএসইসি। বাজার ভালো হবেÑএ প্রত্যাশায় কমিশনকে নতুন করে সাজানো হয়েছিল; কিন্তু উল্টো এ সময় দুর্বল কোম্পানিগুলো বেশি তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে রকম কিছু কোম্পানি নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় পর্ব

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের (বিএসইসি) বর্তমান কমিশনের আমলে পুঁজিবাজারে আসার অনুমোদন পায় খাদ্য খাতের কোম্পানি এমারাল্ড অয়েল। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। তালিকাভুক্তির তিন বছরের মাথায় ঋণ জালিয়াতির মামলায় পড়ে বন্ধ হয়ে যায় কোম্পানির উৎপাদন।

উদ্যোক্তারা ঋণ জালিয়াতির মামলায় পড়লে প্রতিষ্ঠানটির ভাঙনের সুর বেজে ওঠে। এরপর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি কোম্পানিটি। বর্তমানে এর সব ধরনের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৬ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার জালে জড়ান এমারাল্ড অয়েলের উদ্যোক্তারা। পরে দেশ ত্যাগ করেন কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ কারণে ২০১৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর নতুন রূপে উৎপাদন চালুর চেষ্টা করা হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। সহসাই উৎপাদন চালু হচ্ছে কোম্পানির পক্ষ থেকেÑএমন কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিপাকে রয়েছেন এই কোম্পানির শেয়ারধারীরা।

এদিকে দীর্ঘদিন থেকে কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। সময়মতো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কর্মকর্তাকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি। অন্যদিকে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। ফলে কোম্পানির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন তারা।

এদিকে কোম্পানির দুর্দিন দেখে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও চাকরি ছেড়েছেন। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানিটি জালিয়াতির ঋণ ও মামলায় ডুবলেও তখন সেই তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি। সেই থেকে এখনও অন্ধকারে বিনিয়োগকারীরা।

বর্তমানে কোম্পানির কারখানাসহ বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ করার সবগুলো ল্যান্ডফোন। নেই রাজধানী বিজয়নগরের কার্যালয়। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে তাদের।

প্রতিষ্ঠানটির সচিব সুজন কুমার বসাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ল্যান্ডফোন বন্ধ থাকলেও শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। কোম্পানির বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোম্পানির অবস্থা আগেও যা ছিল, এখনও সেই পরিস্থিতি রয়েছে। তবে উন্নয়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এদিকে ২০১৬ সালের পর কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি। ওই বছরের জুন শেষে কোম্পানিটির বকেয়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৯৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এমারাল্ড অয়েলের খেলাপি ঋণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১১ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল এমারাল্ড অয়েল। নতুন কৃষিভিত্তিক প্রকল্প, চলতি মূলধন জোগানো ও পরে আধুনিকায়নের জন্য (বিএমআরই) ঋণ হিসেবে ওই অর্থ নেয় এমারাল্ড অয়েল। তবে চালের কুঁড়া থেকে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী ওই কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করেনি বেসিক ব্যাংক। জামানত ঘাটতি রেখে ঋণ দেওয়া থেকে শুরু করে ডাউনপেমেন্ট ছাড়াই দফায় দফায় পুনঃতফসিল করা ও কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এই উদ্যোক্তারা এমারাল্ড অটোব্রিকসের নামেও বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। ওই ঋণও খেলাপি হয়েছে, যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ১২৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে কোম্পানির অবস্থা নাজুক দেখে পরিচালকরা হাতে থাকা অনেক শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে আসা এমারাল্ড অয়েলের পরিশোধিত মূলধন ৫৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। বর্তমানে মোট শেয়ারের মধ্যে ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশ উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৯ দশমিক ২২ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬২ দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। ২০১৬ সালের জুন শেষে ১৮ কোটি সাত লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা দেখিয়েছে এমারাল্ড অয়েল। এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের ২০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া হয়।

এ ধরনের কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান বলেন, আমরা কোম্পানির কাগজপত্র দেখে সবকিছু সঠিক মনে হলে তবেই এর অনুমোদন দিই। পরবর্তীকালে কোম্পানিটি কেমন হবে, তা আমাদের জানা থাকে না। তাই এটা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন না করাই ভালো।

এদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও মাঝে মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে কারসাজির গুঞ্জন পাওয়া যায়। অস্বাভাবিকহারে বাড়তে দেখা যায় শেয়ারদর। এ নিয়ে ডিএসই থেকে কয়েকবার দর বৃদ্ধির কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। যদিও কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রতিবারই জানানো হয়েছে, তাদের কাছে দর বৃদ্ধির কোনো সংবেদনশীল তথ্য নেই। যদিও বর্তমানে বাজার পতনের জের ধরে কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে দর। গতকাল দিন শেষে প্রতিটি শেয়ার কেনাবেচা হয় ১৫ টাকা ৭০ পয়সা। গত এক বছরের মধ্যে এ শেয়ার সর্বনি¤œ আট টাকা ৯০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ ২৮ টাকা ৫০ পয়সায় লেনদেন হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..