প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ও অধিদপ্তরের মতো বিবেচনা করলে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়ন এবং এসব প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীলতা খর্ব হবে। কেননা নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। এগুলোর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বিভাগ বা অধিদপ্তরের মতো একই ধরনের হায়ারয়ার্কি অনুসরণ করে পরিচালিত হয় না। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সংসদে পাস হওয়া আইনবলে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যও আলাদা আলাদা; পরিচালন পদ্ধতিও ভিন্ন। কাজেই  এগুলোকে এক করে ফেললে চলবে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পাবলিক লেকচারে এসব কথা বলেন মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। ‘সিস্টেমেটিক ভিউ অব দ্য বাংলাদেশ কনস্টিটিউশন’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে সংস্থাটির সম্মেলন কক্ষে এই লেকচার অনুষ্ঠিত হয়।

মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘সংবিধানই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রণীত সব আইনকানুনের মূল ভিত্তি। কিন্তু বিভিন্ন আইন নিয়ে যতটা চর্চা হয়, সংবিধান নিয়ে বেশিরভাগ মানুষেরই সেই মাত্রায় আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। সংবিধান নিয়ে সবাইকে নাড়াচাড়া করা দরকার। এক্ষেত্রে খাপছাড়াভাবে কিছু নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ পড়লে হবে না। এতে অন্ধের হাতি দেখার মতো অবস্থা হবে। কারণ সংবিধানের অননুচ্ছেদগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কাজেই সংবিধানের পুরোটাই জানতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী, নিজেদের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সার্বিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই জনগণই তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে এ সংবিধান প্রণয়ন করেছে। তাই রাষ্ট্রে একমাত্র জনগণই সার্বভৌম। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান সার্বভৌম নয়, কেননা জনগণই তাদের প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে। কাজেই আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রের অবধারিত অঙ্গগুলো জনগণের জন্য এবং জনগণকে সেবা নিশ্চিত করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে।’

মুসলিম চৌধুরী পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে একটি বাড়ির সঙ্গে তুলনা করে এর বিভিন্ন অঙ্গকে একেকটি ঘরের সঙ্গে তুলনা করেন। এ বিবেচনায় আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগকে তিনি প্রধান তিনটি ঘর এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠিত তিনটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, তথা নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়কে তিনটি ছোট ঘরের সঙ্গে তুলনা করেন। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাখ্যা করেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে কী ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয়, সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।

ড. বিনায়ক সেন বলেন, ‘আমরা অনেক বিষয় নিয়েই গবেষণা করে থাকি। কিন্তু রাষ্ট্র কীভাবে চলে এবং রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো কীভাবে পরিচালিত হয়, সেসব বিষয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। মানুষের বোঝার উপযোগী করে এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করা দরকার।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে  আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী, ন্যায়পাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মতো জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনকে  (জেএসসি) সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা দরকার। রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক সময় সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে অনেক কথা বলা হয়। এক্ষেত্রে সংবিধানের অনুচ্ছেদকে যে যার মতো করে ব্যাখা দিয়ে থাকেন। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার। বক্তারা আরও বলেন, জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সংসদে পাঠান। তাদের প্রতিনিধিরা যাতে এমন কিছু করেন, যা জনগণের কল্যাণে এবং মঙ্গলের জন্য হয়। এক্ষেত্রে জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু প্রতিনিধিরা অনেক সময় তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন না; অনেক ক্ষেত্রে মনিবের ভূমিকা পালন করেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।