প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সাতক্ষীরায় কোরবানির পশুতে লোকসানের শঙ্কায় খামারিরা

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় কোরবানির ঈদ ঘিরে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ পশু লালন-পালন করা হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা হওয়ায় এবং জেলায় চাহিদার তুলনায় পশুর মজুত বেশি হওয়ায় ন্যায্য দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন জেলার খামারিরা।

খামারিরা বলছেন, চলতি বছর গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় গরু মোটাতাজাকরণে ব্যয় বেড়েছে অনেক। সে অনুযায়ী দাম না পেলে তাদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তবে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এ বছর সাতক্ষীরায় চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ কোরবানির পশু মজুত রয়েছে, যা জেলার চাহিদা মিটিয়ে বাইরের জেলাগুলোয়ও সরবরাহ করা যাবে। এ কারণে লোকসানে পড়তে হবে না জেলার খামারিদের।

সাতক্ষীরা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এবার জেলায় কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৯০৭টি। আর কোরবানির জন্য মোট পশু মজুত রয়েছে এক লাখ আট হাজার পাঁচটি, অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৪৭ হাজার ৯৮টি পশু বেশি। জেলার সাত উপজেলার ৯ হাজার ৯৩০টি খামারসহ পারিবারিকভাবে এসব পশু লালনপালন করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু ২৮ হাজার ৮০৩টি, ছাগল ৭৪ হাজার ৪৯৯টি, ভেড়া ৩৭০৭টি ও মহিষ রয়েছে ৯৯৬টি।

এ ব্যাপারে জেলার একাধিক খামারি বলেন, গত দু’বছর করোনার মধ্যে কোরবানি ঈদ গেছে। ফলে লকডাউনসহ অর্থনৈতিক কারণে কোরবানি কম হয়েছে। পশু বিক্রি কম হওয়ায় সেইসময় তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। তবে এ বছর কোরবানি ঈদে করোনার প্রভাব না থাকলেও গত দু’বছরের মতো এবারও লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা। কারণ হিসেবে তারা বলেন, দেশে গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় এমনিতেই বিপাকে রয়েছেন তারা। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাক্সিক্ষত মূল্যপ্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন খামারিরা। এমন পরিস্থিতিতে দেশের উত্তর, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে দেখা দিয়েছে বন্যা। আর বন্যাদুর্গত ওইসব এলাকার অনেক খামারি গো-খাদ্য ও শুকনো জায়গার অভাবে এরই মধ্যে লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এর কারণে সাতক্ষীরার স্থানীয় হাটবাজারগুলোয় বাইরের পশু ব্যাপারীদের না আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তার ওপর একদিকে জেলায় চাহিদার তুলনায় কোরবানি পশুর জোগান বেশি, অপরদিকে চড়া দামে খাবার কিনে পশুকে খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের হাতে এখন টাকা নেই। তাই দাম নিয়ে শঙ্কা তাদের। আর প্রতিবেশী দেশ থেকে গরু এলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও জানান খামারিরা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খামারি শহিদুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর ধরে গরু পালন করে আসছেন তিনি। বর্তমানে তার খামারে দেশি ও বিদেশি জাতের ১৮টি গরু রয়েছে। খামারটি এতদিন ভালো চললেও গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, আশায় ছিলেন গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় পশুর দামও বাড়বে। কিন্তু খামারটিতে গরু ক্রয়ের জন্য এখন পর্যন্ত বাইরে থেকে কোনো ব্যাপারী আসেননি। স্থানীয় পর্যায়ে কয়েকজন ব্যাপারী এলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো দাম বলছেন না তারা। ফলে প্রত্যাশিত দামে গবাদি পশু বিক্রি না করার শঙ্কাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

ভোমরা এলাকার খামারি রেজাউল ইসলাম বলেন, আগের বছরে ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ করলেই একটা গরু পোষা যেত। এখন গো-খাদ্যের এত দাম যে মাসে খরচ সাত হাজার টাকা পড়ে যাচ্ছে। তাই কোরবানির বাজারে খামারিরা বেশি দাম চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের হাতেও টাকা কম। তাই পশুর দাম কেমন উঠবে, তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত রয়েছেন।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এবিএম আব্দুর রউফ বলেন, এবছর সাতক্ষীরায় চাহিদার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এরই মধ্যে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৪৮ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। তিনি আরও বলেন, সারাবছর খামারিরা অপেক্ষায় থাকেন কোরবানির জন্য।

তবে একদিকে চাহিদার চেয়ে পশুর জোগান বেশি, তার ওপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হওয়ায় সেখানে অপেক্ষাকৃত কম দামে পশু বিক্রি হচ্ছে, যার প্রভাব কিছুটা হলেও জেলার বাজারে পড়বে। তবে পদ্মা সেতু হওয়ায় খামারিরা ইচ্ছা করলে কম সময়ের ভেতরে দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে তাদের গরু সরবরাহ করতে পারবে। এ কারণে লোকসানের মুখে পড়তে হবে না খামারিদের।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, কোরবানির ঈদ ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে চোরাই গরু দেশে প্রবেশ ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন। বিজিবিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তারা যেন সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করে। আর হাটগুলোয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা এরই মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিকভাবে মাঠে থাকবেন।

তিনি আরও বলেন, যদি কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা নগদ টাকা পরিবহনে অসুবিধা মনে করেন, তাহলে তারা জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারবেন। বড় ধরনের নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও জেলা প্রশাসনের সহায়তা থাকবে। আশা করছি ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে নিরাপদে পশু ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবেন।