দিনের খবর সারা বাংলা

সাতক্ষীরায় ব্যাপক হারে হ্রাস পাচ্ছে গমের ফলন ও আবাদ

জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার প্রভাব

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা: কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় জলবায়ুর বড় প্রভাব রয়েছে। জলবায়ু আর কৃষি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জীবন-জীবিকার ওপর সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু থেকে। ফলে কৃষিতে অনেক ফসলের আবাদ ও উৎপাদনের পরিমাণ কমছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় এর ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষত এ অঞ্চলের গমের আবাদ ক্রমেই কমছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক সম্পদ তথা মাটি ও পানির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পরিবেশ উপযোগিতার বিবেচনায় দেশে গমের উৎপাদন বাড়ানো আবশ্যক। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলে ফসলের গুণাগুণ ও উৎপাদন কমে আসছে। মাটির উর্বরাশক্তি কমে যাচ্ছে এবং ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ফসলে নতুন নতুন রোগ দেখা দেয়ায় কৃষিব্যবস্থায় মারাত্মক কুফল বয়ে আনছে।

জানা গেছে, দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় এক তৃতীয়াংশ দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। তবে এ অঞ্চলের আবাদি জমির ৫০ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। ফলে স্বাদু পানির অভাবে রবি মৌসুমে অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। এ জেলায় মাটির প্রকারভেদে গম আবাদে দুই-তিনটি সেচের প্রয়োজন হয়। প্রথম সেচ চারার তিন পাতার সময় (বপনের ১৭-২১ দিন পর), দ্বিতীয় সেচ শীষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৫০-৫৫ দিন পর) এবং তৃতীয সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫-৮০ দিন পর) দিতে হয়। এ সেচ সঠিক নিয়ে দেয়া না হলে চারার পাতা হলুদ এবং সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ অঞ্চলের চাষাবাদে সঠিকভাবে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আবাদের পরিমাণও কমছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তদরের দেয়া তথ্যমতে, সাতক্ষীরা জেলায় ২০১৬-১৭ মৌসুমে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৫৩৬ হেক্টর। চাষ হয়েছিল প্রায় এক হাজার ৬৭৫ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ হাজার ২৯৮ মেট্রিক টন। একইভাবে ২০১৭-১৮ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৫৫০ হেক্টর, চাষ হয়েছিল ৯৯০ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিল তিন হাজার ১৬৮ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে জমি চাষের  লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৯৮ হেক্টর, চাষ হয়েছিল ৬৯৮ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছিল দুই হাজার ৩০৩ মেট্রিক টন। এছাড়া ২০১৯-২০ মৌসুমে জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০০ হেক্টর জমি, আবাদ হয় ৮১০ হেক্টর এবং উৎপাদন হয়েছিল দুই হাজার ৭৫৪ মেট্রিক টন। আর সর্বশেষ ২০২০-২১ মৌসুমে জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৫০ হেক্টর জমি, কিন্তু আবাদ হয়েছে ৯০০ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৫০ মেট্রিক টন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বাবুলিয়া এলাকার কৃষক মাহাবুব উদ্দিন বলেন, ‘এ বছর আমি দুই বিঘা জমিতে বারি গম-২৮ এবং ছয় বিঘা জমিতে বারি গম-৩৩ চাষ করেছি। অনান্য বছরের তুলনায় গম খুব ভালো হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে গমের পাতার মরিচা রোগ দেখা দেয়। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছি, এতে বেশ ভালো ফল পাওয়া গেছে। আশা করছি গমের ফলন ভালো হবে।’

এ বিষয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সব্যসাচী কুমার কয়াল বলেন, গমের ভালো ফলনের জন্য নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতগুলোই নির্বাচন করা উচিত। এ অঞ্চলে সাধারণত চাষ হয় বারি গম-২৮, যা স্বল্পমেয়াদি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত। বারি গম ৩০ হলো তাপসহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল গমের জাত, যা পাতার দাগ রোগ সহনশীল ও পাতার মরিচা রোগ প্রতিরোধী জাত। বারি গম ৩৩ একটি তাপ সহনশীল উচ্চ ফলনশীল গমের জাত। এই জাতটি গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলায় গম চাষের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ কম হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গমের আবাদ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে দায়ী করেন। এছাড়া এ অঞ্চলের কৃষকরা রবি শস্য সরষে চাষের প্রতি বেশি আগ্রহী হওয়ায় গমের আবাদ কমেছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, গম আবাদের পর জমিতে পাট ও আউশ ধান ছাড়া অন্য কিছু আবাদ সম্ভব হয় না। কিন্তু সরষে চাষের পর জমিতে বোরো আবাদ করা সম্ভব হয়। যে কারণে কৃষক একই জমিতে অল্প সময় ও কম খরচে অধিক লাভের আশায় গমের আবাদ কমিয়ে দিয়েছে। গমের ভালো আবাদের জন্য ঠাণ্ডা আবহাওয়া খুবই জরুরি। গম চাষে আমরা কৃষকদের সার, বীজ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছি। সেই সঙ্গে আমরা আধুনিক উপায়ে গম চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তবে জেলার কোথাও ব্লাস্টের কোনো আক্রমণ দেখা দেয়নি। এছাড়া এ বছর গম চাষের আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে। রোগবালাইও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৭০ লাখ টন বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১১ লাখা ৫৩ হাজার টন গম। আর প্রতি বছর আমদানি করতে হচ্ছে ৫৮ লাখ ৪৭ হাজার টন, যা জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশজ উপাদান বাড়াতে পারলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে দেশ। বর্তমানে দেশে গমের হেক্টর প্রতি গড় ফলন তিন দশমিক ২৮ টন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..