এসএমই

সাতমাথা’র মুখরোচক স্ট্রিট ফুড…

বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থল বলা চলে সাতমাথাকে। এখানে রয়েছে অনেক বাহারি দোকান। বলা যায়, প্রজন্মের সান্ধ্য আড্ডাস্থল এ সাতমাথা চত্বরে ব্যবসা করেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

আড্ডা ইদানীং চলে এসেছে খোলা আকাশের নিচে, অর্থাৎ ফুটপাতের দোকানে; যাকে বলা যায় স্ট্রিট ফুডের আসর। বগুড়ায় যিনি সন্ধ্যায় একবার এখানে অর্থাৎ শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথায় কৃষ্ণচূড়া চত্বরে এসেছেন, এ নেশা তিনি আর কাটাতে পারবেন না। কী নেই, কে নেই এ জমজমাট আড্ডায়? নানা শ্রেণির পেশাজীবী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের নিত্য আগমন ঘটে এ চত্বরে। এ আড্ডার আসর চলে গভীর রাত অবধি, প্রজন্মের এ জম্পেশ আড্ডার পাশাপাশি চলে খানাপিনা।

বগুড়া নগরীর টেম্পল রোড ও নবাববাড়ি সড়কের মধ্যবর্তীস্থলে প্রধান ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। টেম্পল রোডের ধারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আওয়ামী লীগ, জাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয় রয়েছে। এ চত্বর ঘিরে পাশের নবাববাড়ি সড়কের ধারে ছড়িয়ে পড়েছে স্ট্রিট ফুডের বাহারি ভ্রাম্যমাণ দোকান। কী নেই এসব স্ট্রিট ফুডশপে! ফুচকা, চটপটি, বুটসিদ্ধ, পেঁয়াজু, বেগুনি, কলা ভাজা, লাউ ভাজা, চিকেন রোল, ভেজিটেবল রোল, বার্গার, এগ ফ্র্রায়েড, চিকেন ফ্রাই, চিকেন গ্রিল, সব ধরনের কাবাব, চাপ, বিরিয়ানিসহ বাহারি সব খাবার মেলে এখানে। ফাস্টফুড ও চীনা রেস্তোরাঁর খাবার চলে এসেছে এ স্ট্রিট ফুডে।

ভাসমান দোকানগুলোয় এলপিজি সিলিন্ডারসহ গ্যাসের চুলা রয়েছে। এতেই চলে রান্না। কাঠের বাক্সে কাঁচঘেরা  দোকানগুলোর একেকটি চার চাকার ওপর দাঁড়িয়ে। স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোর সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার ও কাঠের বেঞ্চ বসানো আছে। এর কিছুটা দূরে বাদামওয়ালা, চানাচুরওয়ালা, সিদ্ধ ডিম, ভাপা পিঠা ও চিতই পিঠাসহ নানা খাবারের পসরা বসানো হয়েছে। আশেপাশে আছে চা দোকান। এই দোকানগুলোও আপগ্রেড হয়েছে। এখন শুধু চা পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কফি, চিনি ছাড়া কফি, হরলিক্স মেশানো চা, দুধ চা, র’ চা বা লাল চা, মরিচ-মসলা দিয়ে লাল ঝাল চা প্রভৃতি। অনেক ধরনের বিস্কুট তো আছেই। দ্রুত কফি বানানোর জন্য অনেক দোকানি কফিমেকার বসিয়েছেন।

স্ট্রিট ফুডের এমন আয়োজন গড়ে উঠতে অনেকটা সময় লেগেছে। অনেক আগে পোস্ট অফিসের সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ভ্রাম্যমাণ চা দোকান প্রফুল্ল চন্দ্র দাস, তারপর নিকুঞ্জ কুমার কিশোর বয়সে চায়ের দোকান বসিয়ে বিক্রিবাট্টা শুরু করেন। এ চায়ের দোকান এতটাই জনপ্রিয় যে, কৃষ্ণচূড়া চত্বরের সঙ্গে নিকুঞ্জের চা দোকান যুক্ত হয়েছে। কেউ কাউকে খুঁজতে লোকেশনের পরিচিত দেন এভাবেই: ‘সন্ধ্যায় নিকুঞ্জের দোকানের সামনে এসো’। কেউ কাব্য করে বলেন, কৃষ্ণচূড়ার তলে আসবেন, দেখা হবে, কথা হবে, অনেক আড্ডা হবে। এভাবে দিন দিন শহরে এর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

এ আড্ডা বগুড়াবাসী ও তরুণ-তরুণীর আন্তরিকতার পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কোন কাগজে কি ছাপা হয়েছে, কোন লিটল ম্যাগ প্রকাশিত হয়েছে, কোন সাময়িকী প্রকাশ হবে, এতে কে কি লিখছেনÑকোনো কিছুই বাদ যায় না এ চত্বরের আড্ডায়। এর মধ্যে কোনো এক ফাঁকে চলে আসেন শিল্পীরা। কেউ অভিনেতা, কেউ নাট্যকার, কেউ গায়ক, কেউ আবৃত্তিকার, কেউবা নৃত্যশিল্পী। সাহিত্য রস-সুধার আড্ডায় তারাও যুক্ত হতে থাকেন। আড্ডায় কতবার কতভাবে যে ট্র্যাক পাল্টে যায়, তাও ঠাওর করা যায় না। সুশৃঙ্খল এমন আড্ডা থেকে অনেক কিছু জানাও যায়। কেউ দেশি-বিদেশি মিডিয়ার বিশ্লেষণ-খবর নিয়ে আলাপ শুরু করেন। পক্ষে-বিপক্ষে নানা মন্তব্যে আড্ডা জমে ওঠে। সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে যেখানে এই আড্ডা জমে ওঠে, তার কাছের দোকানগুলোয় বেচাকেনা বেড়ে যায়। তখন সূক্ষ্ম কৌশলে অল্প দূরের দোকানিরা তাদের টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সফল হন। কাজেই, সঠিক দামে ক্রেতাকে তার পছন্দের পণ্যটি তুলে দিতে পারেন। এভাবে অনেক ব্যবসায়ীর সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা।

জায়গাটি আকাশের নিচে উম্মুক্ত। ভর বছর এ আড্ডা চলে। বগুড়ায় স্ট্রিট ফুডের আড্ডার সূত্রপাত গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুতে। ওই সময় থানা রোডের পাশে উত্তরা সিনেমা হলের গলির ভেতরে টিনের চালায় আধাপাকা ঘরে উড়িয়া ঠাকুর দোকান চালু করেন। সেখানে সন্ধ্যার পর চপ, পরোটা, সবজি, ছোট বাটিতে বিরিয়ানি ও খাসির মাংস বিক্রি শুরু করেন। দেয়ালের ধারে লম্বা টেবিল এঁটে বেঞ্চ দিয়ে বসার ব্যবস্থা ছিল। মধ্যিখানে উড়িয়া ঠাকুর তার ধামার মতো পেট নিয়ে ও তার স্ত্রী চুলার ধারে বড় ডেকচিতে খাবার রান্না করতেন। কয়েকজন বয় কলাপাতায় খাবার সরবরাহ করত টেবিলে। বাটি পিস (এক বাটি বিরিয়ানি ও এক টুকরো মাংস) ও চপের স্বাদ আজও স্থানীয় প্রবীণদের মুখে লেগে রয়েছে। এত সুস্বাদু ছিল খাবারগুলো যে, চেটেপুটে খেতেন তারা! এভাবে স্ট্রিট ফুড ও আড্ডা যুগ যুগ ধরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহায় হয়ে রয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও সাবেকি চালচলন ও ব্যবসায়ী ধ্যান-ধারণা নিয়ে চলতে চান তারা। এতে ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে আড্ডার পাশাপাশি মুখরোচক খাবার পেয়ে যান স্বল্পদামে।

পারভীন লুনা, বগুড়া

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..