দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

সাত বছরে বন্ধ হলো ৩৩৫ কারখানা

সংকটে চট্টগ্রামের পোশাকশিল্প

সাইফুল আলম মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম: দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্ম শহর বলা হয় চট্টগ্রামকে। এ শহরের কালুরঘাট থেকে ৪০ বছর আগে দেশে প্রথম রফতানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এর শিল্পসহায়ক জমি, অবকাঠামোগত সুবিধা, বন্দর, ব্যাংক, সস্তা শ্রম এবং দক্ষ ও যোগ্য উদ্যোক্তা সবই আছে। কিন্তু সেভাবে এ শিল্পের বিকাশ হয়নি। উল্টো অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, শিল্প প্রকৌশল ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে প্রতিবছর কমছে কারখানার সংখ্যা। গত সাত বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ৩৩৫ কারখানা। আর যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আছে। ফলে চট্টগ্রামের গার্মেন্টশিল্প ক্রান্তিকাল পার করছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্যানুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালÑএ ১০ বছরে চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০ নতুন তৈরি পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছিল। সে হিসেবে প্রতিবছর গড়ে ৪০টি করে নতুন কারখানা স্থাপিত হয়েছে চট্টগ্রামে। তার বিপরীতে ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে গড়ে উঠেছে ১৭৪ কারখানা। সে হিসেবে শেষ ১০ বছরে প্রতিবছর গড়ে কারখানা স্থাপিত হয়েছে ১৭টি করে। অর্থাৎ, কারখানা স্থাপনের হার প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।

অপরদিকে বর্তমানে চট্টগ্রামে ৬৮৬ তৈরি পোশাক শিল্পকারখানার মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৩৩৫টি। বাকি ৩৫১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১৮৪ প্রতিষ্ঠান আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে নিয়োজিত আছে। বাকিগুলো সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করছে। এসব কারখানায় কাজ করছেন প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক। আর বন্ধ হয়ে কারখানাগুলো থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন প্রায় দেড় লাখ। এর মধ্যে চলতি ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে চট্টগ্রামে ৩৮ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে  গেছে।

চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে ১০ কারণ চিহ্নিত করেছে বিজিএমইএ। এগুলো হলো: অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের ফর্মুলা অনুযায়ী সংস্কার করতে না পারা, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নে অক্ষমতা, পণ্যের যথাযথ মূল্য না পাওয়া, বিদেশি বায়ারদের চট্টগ্রামবিমুখতা, কিছু বায়ার ও বায়িং হাউসের প্রতারণা, চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত সমস্যা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যাংকঋণ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা অব্যবহƒত থাকা এবং অসম প্রতিযোগিতা। এছাড়াও পোশাক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে দক্ষতা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতিকেও দায়ী করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্মেন্ট বন্ধের এ ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রামের প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক হুমকির মুখে পড়বেন। তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, ‘গার্মেন্টের বর্তমান অবস্থাকে মজুরি বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। কারণ, ন্যায়সংগত মজুরি নিশ্চিত না হলে দক্ষ শ্রমিক গড়ে উঠবে না।’

পোশাক খাতের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসকেন্দ্রিক কিছু সমস্যার কারণেও পিছিয়ে পড়ছে পোশাকশিল্প। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো বহির্নোঙ্গরে গড়ে প্রায় সাত-আট দিন অপেক্ষা করতে হয়। পরবর্তীকালে জেটিতে তিন দিনের মধ্যে কার্যক্রম শেষ করে বন্দর ত্যাগ করে। পোশাকশিল্পের আমদানি করা পণ্য ছাড়করণে বন্দরের অবকাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যায় ১০-১২ দিন এবং কাস্টমস কর্তৃক বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় অনেকাংশে ১০-১৫ দিন অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। ফলে পণ্য খালাসে বিঘœ সৃষ্টি হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো রফতানিতে সক্ষমতা হারাচ্ছে। এছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে মন্দার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার শক্তিশালী অবস্থান, আন্তর্জাতিক বাজারে অব্যাহতভাবে পণ্যের দরপতনও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

তাদের মতে, বিদেশি ক্রেতার পরিদর্শন সংস্থা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের সংস্কার কর্মসূচি প্রতিপালন, সর্বশেষ শ্রমিকদের মজুরি ৫১ শতাংশ বৃদ্ধিসহ নানা অবকাঠামোগত সমস্যায় ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। লিড টাইম বা উৎপাদন সময়ের জন্য এমনিতেই বাংলাদেশ অন্যান্য দেশ থেকে পিছিয়ে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানিতে ব্যর্থ হয়ে স্টকলটসহ অর্ডার বাতিল হয়ে রুগ্ণশিল্পে পরিণত হয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমেই বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সক্ষমতা হারাচ্ছে। শুধু চট্টগ্রামের কারখানাগুলোই নয়, পুরো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে।

সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মুনসুরাবাদের সাদাপ ফ্যাশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহেদ চৌধুরী অনেকটা আক্ষেপের সুরে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে অনেক সাক্ষাৎকার দিয়েছি। কোনো কাজ হয়নি। আমি ব্যবসায়ী নই। আমার অক্ষমতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সাবেক পরিচালক শওকত ওসমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ৪০ বছরের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে এখন চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। প্রথম এক দশকে, অর্থাৎ ৯০-এর দশকেও দেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির ৪০ শতাংশেরও বেশি হিস্যা ছিল চট্টগ্রামের। এখন সেটি কমে ১২ থেকে ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০০ সালের পর থেকে চট্টগ্রামের বাজারে অংশীদারিত্ব কমতে থাকে। এ সংকটের মূল কারণ ব্যাংকগুলোর ঢাকা প্লাস ওয়ান নীতি, অর্থাৎ এখানকার শাখা ব্যবস্থাপকরা প্রধান অফিসের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকেন কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ীদের এ সমস্যায় পড়তে হয় না। কারখানার জমি সংকট ও জমির উচ্চমূল্য, দক্ষ শ্রমিক সংকট রয়েছে। অথচ বন্দর সুবিধার কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ গড়ে তিন শতাংশ কম হয় ঢাকার তুলনায়।’

যদিও দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে চট্টগ্রামের পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছেÑএমনটা মনে করেন না বিকেএমইএ’র পরিচালক ও স্টিচ টোন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব দাশ সুজয়। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাব থাকলে এতদিন গার্মেন্ট কারখানাগুলো কীভাবে চলেছে? বর্তমানে বাজারে অনেক প্রতিযোগিতা। ক্রেতারা ভিয়েতনামের দিকে চলে যাচ্ছে। ভিয়েতনামে লিড টাইম কম, বাংলাদেশে লিড টাইম বেশি। আমাদের এক্সেসরিজ আনতে হয় চীন থেকে। এতে ১২-১৫ দিন নষ্ট হয়। চট্টগ্রাম বন্দরেও জটিলতা রয়েছে। বন্দরে জাহাজ ভিড়লে পাঁচ-সাত দিনের আগে পণ্য পাওয়া যায় না। ক্রেতাবিমুখিতার কারণেই মূলত চট্টগ্রামের গার্মেন্ট কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’

উল্লেখ্য, ১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম শহরের কালুরঘাটে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা নুরুল কাদের খানের দেশ গার্মেন্টস স্থাপনের মাধ্যমে গোড়াপত্তন হয়েছিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ও পোশাক রফতানি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..