সাদিক এগ্রোর ব্রাহামা গরু নিয়ে বিপাকে এনবিআর

রহমত রহমান: কোনো ধরনের আইন না মেনেই নিষিদ্ধ ‘ব্রাহামা’ জাতের গরু আমদানি করেছে সাদেক এগ্রো লিমিটেড। ‘লাইভ ক্যাটেল’ ঘোষণা দিয়ে ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হয় ১৮টি ব্রাহামা জাতের গরু। এসব গরু আমদানির প্রতিটি ক্ষেত্রেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। গরু ছাড়করণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জাল প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়েছে। রপ্তানিকারক দেশকে পাঠানো চিঠিও জাল। আইন অমান্য করে আমদানি করা এসব গরু রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে দেয়া হয়েছে অর্থদণ্ড।

যদিও প্রতিষ্ঠানটি অর্থদণ্ড পরিশোধ করেনি, উল্টো সেই গরু ছাড় করাতে চায়। এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে ঢাকা কাস্টম হাউস। বাজেয়াপ্ত করা এসব গরুর বিষয়টি নিষ্পত্তিকরণে নির্দেশনা চেয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছেন কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। সম্প্রতি এই চিঠি দেয়া হয়। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে সাদিক এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা আপিলাত ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছি, এখনও তা অনুমোদিত হয়নি।’ গরু আমদানির জন্য আপনারা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জাল প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেনÑএ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যয়নপত্রের জন্য আবেদনই করিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো আমদানিকারক নই, রিসার্চ প্রতিষ্ঠান। আমাদের কৃত্রিম প্রজনন করানোর মতো সেটআপ নেই। আমরা গরু আমদানির জন্য এলসি করিনি। ট্রেড এক্সপো নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছে। তারা আমাদের গরুগুলো রিসার্চের জন্য পাঠিয়েছে। আমরা এই গরু দিয়ে রিসার্চ করব। যদি আমাদের রিসার্চ সফল হয়, তাহলে আমরা ভবিষ্যতে এই গরু থেকে মাংস রপ্তানি করব। আমরা তো কোনো এলসি খুলিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আমাদের ফ্রি অব কস্টে গরুগুলো পাঠিয়েছে। আমরা এলসি করলে তো মানি লন্ডারিং হতো। মন্ত্রণালয় আমাদের কাজে সন্তুষ্ট হয়েছে, আমাদের সিপি দিয়েছে। আমরা কোনো আইন লঙ্ঘন করিনি, আশা করি আমরা প্রতিকার পেয়ে যাব।’

ঢাকা কাস্টম হাউস সূত্রমতে, ৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা ব্রাহামা জাতের ১৮টি গরু জব্দ করে ঢাকা কাস্টম হাউস। তার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসে গরুগুলো। বাংলাদেশে ব্রাহামা জাতের গরু আমদানির অনুমতি না থাকা এবং গরুর আমদানিকারককে খুঁজে না পাওয়ায় সেগুলো জব্দ করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জব্দ করা ১৩ মাস থেকে ৬০ মাস বয়সী এসব গরু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার সাদিক এগ্রো লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি এসব গরু ছাড়াতে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং আমদানিকারককে খুঁজে না পাওয়ায় গরুগুলো সাময়িকভাবে সংরক্ষণের জন্য সাভারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয় (১৭টি জীবিত, একটি মৃত)।

সূত্র আরও জানায়, বিল অব এন্ট্রিতে গরুর মূল্য ধরা হয় ৪০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। সাদিক এগ্রো ব্রাহামা গরু আমদানির জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কোনো প্রত্যয়নপত্র নেয়নি। কোনো ধরনের বিল অব এন্ট্রি দাখিল ছাড়াই ৭, ১১ ও ১৪ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গরু ছাড়করণে ঢাকা কাস্টম হাউসে আবেদন করা হয়। ১৫ জুলাই আমদানি নীতি অনুসরণ করে বিল অব এন্ট্রিসহ সব কাগজপত্র দাখিল করতে প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দেয় কাস্টমস হাউস। ২১ দিন পর ২৬ জুলাই কোয়ারেন্টাইন শর্ত ও ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র দিয়ে গরুগুলো খালাস নিতে ২৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেয় কাস্টমস হাউস। এর মধ্যে সাদিক এগ্রো গরুগুলো ছাড়াতে উচ্চ আদালতে রিট দাখিল করে। আদালত আইন অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে কাস্টমসকে নির্দেশ দেয়। তবে প্রোফর্মা ইনভয়েস, এলসি, ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্ট ছাড়া শুল্কায়ন ও খালাস করা সম্ভব নয় বলে কাস্টম হাউস প্রতিষ্ঠানটিকে জানিয়ে দেয়।

সূত্র জানায়, ৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিপি নিয়ে পণ্যচালানটি খালাস করতে আবারও আবেদন করে। ১০ আগস্ট প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে কাস্টম হাউস। ৩১ আগস্ট শুনানিতে সাদিক এগ্রো কর্তৃপক্ষ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা হাজির হন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা শুনানিতে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কোনো আইন না মেনেই ব্রাহামা গরু আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, বিমানবন্দরের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কোয়ারেন্টাইন স্টেশন থেকে পশু আমদানির জন্য ‘ক্যাটেল ইমপোর্ট অথরাইজেশন’ পত্র দেয়া হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে। এই পত্র কোয়ারেন্টাইন স্টেশন ইস্যু করেনি। প্রতিষ্ঠানটি এক্ষেত্রে বড় জালিয়াতি করেছে।

তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়, কৃত্রিম প্রজননের জন্য যেসব মেশিনারিজ প্রয়োজন, তা তাদের নেই। এতে প্রতিষ্ঠানটি কোনো আইন লঙ্ঘন করেনি। গবাদিপশু আমদানির ১৫ দিন আগে সঙ্গনিরোধ কর্মকর্তাকে জানাতে হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করে, আমদানির দুই মাস আগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মৌখিকভাবে আশ্বাস দেয়। আর রপ্তানিকারক টার্কিশ এয়ারলাইনসের প্যাকেজের আওতাভুক্ত বিমান ভাড়া ছাড় পাওয়ায় এয়ারলাইনসের নির্ধারিত তারিখেই প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই পশুগুলো আমদানি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির সব যুক্তি আর দাখিল করা কাগজপত্র পর্যালোচনা করেন কাস্টম হাউস কমিশনার। যাতে প্রতিষ্ঠানটির সব ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পায়। আইন লঙ্ঘন করায় গরুগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের রায় দিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর আদেশ জারি করেন কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান। ১৫ দিনের মধ্যে এই অর্থদণ্ড জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি তা জমা দেয়নি। গরুগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিতে হবেÑসে বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে ৫ অক্টোবর এনবিআরকে চিঠি দেয় কমিশনার।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের এনিমেল কোয়ারেন্টাইন যে-ই সনদ দেয়, তার ওপর বিশ্বাস করে আমাদের পশু-পাখিসহ অন্যান্য প্রাণী ছাড়তে হয়। তবে এর আগে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ৩০টি হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু আটক করা হয়। আর সাদিক এগ্রো লিমিটেডের ১৮টি ব্রাহামা জাতের গরুর ক্ষেত্রেও আগে থেকে আমাদের কাছে তথ্য ছিল। সেজন্য আটক করা সম্ভব হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এর আগে হয়তো দু-একটি চালান মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি হতে পারে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯০  জন  

সর্বশেষ..