নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : রপ্তানির ক্ষেত্রে কাগজে ছিল সম্ভাবনার গল্প, কিন্তু হিসাবের পাতায় জমেছে খেলাপির পাহাড়। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্পগোষ্ঠী সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ও তহবিল অপব্যবহারের ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার এক বড় প্রতিচ্ছবি। খুব পরিচিত নাম না হলেও গত এক দশকে ব্যাংক খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে গ্রুপটি। শিল্প বা রপ্তানির বিস্তারে নয়, বরং একের পর এক ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা খেলাপিতে পরিণত করার ঘটনায়। গ্রুপের কর্ণধার মুহাম্মদ মোহসিনের নেতৃত্বে রপ্তানির নামে ভুয়া কাঁচামাল কেনাবেচা দেখিয়ে একের পর এক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয় হাজার কোটি টাকার ঋণ। সময়ের ব্যবধানে সেই ঋণ শুধু খেলাপিতেই পরিণত হয়নি, সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার কোটিরও বেশি, যার বোঝা আজ টানছে দেশের অন্তত দুই ডজন ব্যাংক। তবে প্রায় ৫৬ কোটি টাকার চেক প্রত্যাখ্যান (ডিজঅনার) মামলায় সাদ-মুসা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন পাঁচ বছর কারাদণ্ডে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এর বাইরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খেলাপি এসব ঋণের টাকা উদ্ধারে নতুন কোনো উদ্যোগই নিতে পারেনি বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত প্রায় এক দশকে সাদ-মুসা গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর পুরো অঙ্কই এখন খেলাপি। এই ঋণের বড় অংশ নেওয়া হয়েছে রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানি দেখিয়ে। কিন্তু বাস্তবে সেই রপ্তানি হয়নি বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে মুহাম্মদ মোহসিনের পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থায় তদবির করে ইচ্ছাকৃত খেলাপির মর্যাদা থেকে মুক্তি এবং নতুন ঋণের চেষ্টা চালালেও আইনি ও নীতিগত বাধার কারণে তা সফল হয়নি। গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যত বন্ধ, সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া চললেও তা ঋণের অঙ্কের তুলনায় নগণ্য। আইনি চাপ ও দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়মের ফলে সাদ-মুসা গ্রুপ বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতে প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ঘটনা ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ জোরদারের প্রয়োজনীয়তাই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণ কারসাজিতে বর্তমানে ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের ২৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ন্যাশনাল ব্যাংক (এনবিএল)। ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখায় সাদ মুসা গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। এনবিএলের বাইরে আরও ১৬টি ব্যাংক সাদ মুসা গ্রুপকে দিয়েছে ৩ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা, আর সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিয়েছে ২৬৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই গ্রুপের কারণে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ন্যাশনাল ব্যাংকে খেলাপি হয়ে পড়ার পরও মুহাম্মদ মোহসিন তথ্য গোপন করে নতুন করে ঋণ তুলেছেন। চাচাতো ভাই মঈন উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখিয়ে ‘রেডিয়াম কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল’ নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। এর বিপরীতে এনবিএল থেকে নেওয়া হয় ৭৫৫ কোটি টাকা।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংকে ভুয়া বিল বেচাকেনা ও লোকাল এলসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে রেডিয়াম কম্পোজিট এবং সাদ মুসা গ্রুপের এক কর্মচারীর নামে খোলা ইইএসএম করপোরেশনের হিসাব। করোনার সময় সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় দেওয়া ১৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণও ব্যবসায় ব্যবহার না করে নগদে তুলে নেওয়ার তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ।
২০১১ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঙ্গে সাদ-মুসা গ্রুপের সম্পর্ক শুরু হয় ১২০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের তৎকালীন মালিকপক্ষের আনুকূল্যে এই সীমা বাড়তে বাড়তে দাঁড়ায় ৯৫৯ কোটি টাকা। তবে সীমা অমান্য করে নামে-বেনামে ঋণ গিয়ে পৌঁছায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকায়। ২০১৬ সালে সাদ মুসা হোমটেক্স অ্যান্ড ক্লথিংয়ের নামে নেওয়া ৪১৫ কোটি টাকা চলতি মূলধন ঋণের বড় অংশ সরাসরি স্থানান্তর করা হয় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ সমন্বয়ে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্তেও গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট শাখা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের জ্ঞাতসারেই এসব লেনদেন হয়েছে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকে সাদ মুসা গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৬৪ কোটি টাকা। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে লোকাল এলসি ও স্বীকৃত বিলের মাধ্যমে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়। কোনো রপ্তানি না হলেও কাগুজে বাণিজ্যের মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিল দেখানো হয়েছে। এক্সিম ব্যাংকে গ্রুপটির তিন প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯৮ কোটি টাকা। এখানেও ভুয়া বিল, নন-ফান্ডেড দায়কে ফান্ডেড ঋণে রূপান্তর এবং ডাউন পেমেন্ট জোগাড়ে বেনামি হিসাব ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। প্রাইম ব্যাংকে সাদ-মুসা গ্রুপের ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ভবন নির্মাণ ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরানোর বিষয়ে।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুহাম্মদ মোহসিন দাবি করেন, চীন, বেলজিয়াম ও জার্মানির কয়েকটি ব্যাংক থেকে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঋণ আসছে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল নতুন করে ব্যাংকঋণ পাওয়ার পথ তৈরি করা। তবে পরবর্তীকালে যাচাইয়ে ব্যাংকগুলো জানতে পারে, এই দাবি ভিত্তিহীন। ফলে কোনো ব্যাংক নতুন ঋণ দেয়নি। বরং একের পর এক অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে ব্যাংকগুলো।
জানা যায়, চট্টগ্রামের অদূরে আনোয়ারা উপজেলায় সাদ-মুসা শিল্পপার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাতে ২৪টি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে না পারায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে এই গ্রুপ। ২০১৫ সালে এই পার্কটির কয়েকটি ইউনিট চালু হলেও এখনো লোকসান গুনছে তারা। এরপর আমেরিকায় একটি গুদাম কিনতে গিয়েও আইনি ঝামেলায় পড়ে বড় ধরনের লোকসানে পড়ে এ গ্রুপ। লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কর্ণফুলী জুট মিলস ২০০৮ সালে ভাড়া নিয়ে উৎপাদন শুরু করে সাদ-মুসা গ্রুপ। তবে ২০১২ সালে মিলটিকে আবার সরকারের কাছে ফেরত দিতে হয়। কিন্তু ওই চার বছরে কারখানাটির আগের গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বকেয়াসহ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধ করে তারা। ফলে তাতেও লোকসান গুনতে হয় তাদের।
সরেজমিনে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সাদ-মুসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে দেখা গেছে, একাধিক কারখানার ফটকে তালা ঝুলছে। টিনশেড কারখানাগুলোতে ঝুলছে পুরোনো সাইনবোর্ড। নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে ধরেছে জং।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এখানে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন। এখন কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ। বেতন-ভাতাও অনিয়মিত। ব্যাংকঋণের টাকায় এখানে প্রায় ২০০ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। তবে কারখানা চালু না হওয়ায় পুরো এলাকাটিই স্থবির।
মুহাম্মদ মোহসিনের বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। ব্যবসা শুরু করেন ১৯৮২ সালে পাইকারি পণ্য সরবরাহ দিয়ে। পরে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল খাতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৪ সালে বাবা ও চাচার নামের অংশ নিয়ে গড়ে তোলেন সাদ-মুসা গ্রুপ। তিনি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের উদ্যোত্তদ্ধা পরিচালক ছিলেন। খেলাপি হয়েও তার স্ত্রী শামীমা নারগিস একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন, যেখান থেকে সম্প্রতি পদ ছাড়েন। ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকা ব্যাংকের এক মামলায় মোহসিন ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত। আরও কয়েকটি মামলায় তার নামে জারি করা হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাদ-মুসা গ্রুপের তিন হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি ছিল। তবে এগুলো পরিশোধের জন্য সুদ মওকুফ ও দুই দফা পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়; কিন্তু তারা সে সুযোগ গ্রহণ করেননি। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫৬ কোটি টাকার চেক প্রত্যাখ্যান (ডিজঅনার) মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন মোহাম্মদ মহসিন। তবে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তার জামিন নামঞ্জুর করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারের যাওয়ার আগে মুহাম্মদ মোহসিন দাবি করেন, তিনি প্রতিহিংসার শিকার। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকে তার ঋণ রয়েছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা, আর সম্পদ রয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, স্বেচ্ছা ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার জন্য যে প্রমাণ দরকার, মুহাম্মদ মোহসিনের ক্ষেত্রে তার ঘাটতি নেই।
সাদ মুসা গ্রুপের ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির পেছনে শুধু একজন ব্যবসায়ী নয়, ব্যাংকের ভেতরের দুর্বলতা ও যোগসাজশও বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি স্বেচ্ছা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নীতিমালা করেছে। সাদ-মুসা গ্রুপের মামলা সেই নীতিমালার প্রথম বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে সাদ-মুসা গ্রুপের দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি। তাই তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post