প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সাফল্যের গল্প শরবত বেচে লাখপতি

শরিফুল ইসলাম পলাশ: মনির হোসেন, বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সদা হাস্যময়ী তরুণ। স্ত্রী ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়–য়া ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাটের পাশেই থাকেন। ছয়-সাত বছর আগেও তিনি নরসিংদীর বিভিন্ন স্থানে চানাচুর-ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। দিনগুলো মোটেই সুখকর ছিল না। ঝালমুড়ি বিক্রি করতে করতেই একদিন আসে বাবুরহাটে। সেখান থেকেই তার মাথায় নতুন ব্যবসার ধারণা আসে। শ্বশুরের সঙ্গে পরামর্শ করে শরবত বিক্রিতে নেমে পড়েন। ব্যবসাটিই হয়ে ওঠে মনির হোসেনের দিনবদলের হাতিয়ার।

দেশের সবচেয়ে বড় কাপড় কেনাবেচার স্থান বাবুরহাট। ‘প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার’ খ্যাত ওই হাটটি কারও কারও কাছে ‘শেখেরচর বাবুরহাট’ নামেও পরিচিত। বাবুরহাটে সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা ধূমকেতু মাঠ। ক্রেতাদের কিনে রাখা কাপড় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে ওই মাঠেই পিকআপ-ট্রাকে তোলা হয়। তাই ওই মাঠে বিক্রেতা-ক্রেতা, কুলি-ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিকসহ বহু মানুষের আনাগোনা। সপ্তাহে হাটের দিনগুলোয় ওই মাঠে তিলধারণের ঠাঁই থাকে না। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফাঁকে শরীরের পানীয় ঘাটতি পূরণের জন্য অনেকেই ভিড় জমান শরবতের দোকানে। ঘুরতে আসা ক্রেতারাও ‘মনিরের স্পেশাল বেলের শরবত’ পরখ করতে স্বাদ নিতে চান। যে কারণে বাবুরহাটে আসা মানুষের কাছে মনিরের শরবতের আলাদা কদর রয়েছে। ছোট্ট ওই দোকানে দৈনিক ৫০০ গ্লাস শরবত বিক্রি হয়।

বেসরকারি চাকরিজীবী মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে ওই শরবতের নাম শুনেছি। এখানে তাজা ফলমূল থেকে স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়ায় শরবত তৈরি হয়। শরবতের দামও তুলনামূলক কম। সে কারণে আমার আগ্রহ সব সময়ই ছিল। তাই এখানে এসে শরবত খাওয়ার ইচ্ছাটা পূরণ করলাম।’

সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে

রোববার গভীর রাত পর্যন্ত চার দিন শেখেরচর বাবুরহাটে ইসপগুল আর বেলের শরবত বিক্রি করেন মনির হোসেন। শরবত তৈরির কাঁচামাল বেল, লেবু, ইসপগুলের ভুসি, গুড় ও গ্লুকোজ। দুই কর্মচারীর বেতন আর আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হয়। সেই হিসাবে মাসে শেষে আয়ের অঙ্কটা ২৫ হাজারের কাছাকাছি থাকে। গরমে বিক্রি বাড়ে, তখন মাস শেষে আয়ও বেড়ে যায়। তবে শীতের কয়েক মাস  শরবতের চাহিদা কম থাকায় আয়ও কিছুটা কম হয়।

শেয়ার বিজের সঙ্গে আলাপকালে মনির বলেন, ‘এখানে তিন ধরনের শরবত বিক্রি করি। ইসপগুলের ভুসির সঙ্গে চিনি-গ্লুকোজ মিশিয়ে শরবত বানাই। প্রতি গ্লাস শরবতের দাম ১০ টাকা। বেলের শরবত আছে দুই ধরনের। তুলনামূলক পাতলা প্রতি গ্লাসের দাম ২০ টাকা। আর বেল, লেবুর রস, গুড়, চিনি মিলিয়ে স্পেশাল শরবত তৈরি করি, যার প্রতি গ্লাস বিক্রি হয় ৩০ টাকা দামে। ছয় বছর ধরেই এ ব্যবসা করি। এখন শীতকাল, বেচা-বিক্রি কম। এ সময় ভালো মানের বেলও পাওয়া যায় না। তারপরও সপ্তাহে ছয়-সাত হাজার টাকা থাকে।’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ধূমকেতু মাঠের একপাশে মনিরের ওই শরবতের দোকানে প্রায় সব সময় গ্রাহকের ভিড় লেগেই থাকে। গরমের সময় তো বটেই, শীতকালেও বিকিকিনি মন্দ নয়। ভোর ৬টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। ছোট্ট ওই দোকানের আয়েই দোকানের দুই কর্মচারী ও মনির হোসেনের নিজের সংসার চলে।

মনির হোসেন আরও বলেন, ‘গুণগত মানই ধরে রাখাই আমার ব্যবসার মূলমন্ত্র। কারণ এখানে আমার খুব বেশি পুঁজি লাগে না। কারণ ব্যবসা করার জন্য ঘর ভাড়া বা অন্য কোনো খরচ দিতে হয় না। আমি ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্থান থেকে বেল-লেবুসহ অন্য ফল সংগ্রহ করি। তারপর নিজেই শরবত তৈরি করি। শুধু দেশি ফল ও শরবতের গুণগত মানের কারণেই সবাই আসে। ব্যবসা করে ভালোভাবেই সংসার চলছে। পাঁচ-ছয় বছরে দুই-তিন লাখ টাকা সঞ্চয়ও করতে পেরেছি। সব মিলিয়ে ভালো আছি।’