প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সাভারে কুটিরশিল্পের অনুপ্রেরণা জাহাঙ্গীর আলম

অভাবের তাড়নায় এক যুগ আগে ঢাকার সাভারে কাজের সন্ধানে আসেন তিনি। একটু নির্দিষ্ট করে বলা যায়, আশুলিয়ায় তখন কাজ শুরু করেন মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার জাহাঙ্গীর আলম। শুরুতে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বিপরীতে কুটিরশিল্প বাজারের সামনের সড়কে বিভিন্ন পোস্টার বিক্রি করে জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। এরপর কুটিরশিল্প বাজারের একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। বেশ কয়েক বছর কেটে যায় এভাবে।

শুরু থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, কুটিরশিল্পনির্ভর একটি কারখানা গড়বেন। জানতেন পথটি কঠিন। তবু থামেননি। সামান্য পুঁজি সহায় করে স্বজনদের কাছ থেকে কিছু ধারদেনা করে ভাড়াবাড়িতে সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। আশুলিয়ায় গাজীরচটে চলে কুটিরশিল্প কারখানা নির্মাণের স্বপ্ন বোনা। সঙ্গী স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে। একসময় দাঁড় করান ‘হাসান কুটিরশিল্প’। বড় ছেলের নামে প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখেন। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে ও তার পরিবারকে। বছর দুই না ঘুরতেই সফল হন জাহাঙ্গীর আলম। তার তৈরি জিনিসপত্র এখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। এখানে কাজ করছেন নারী ও পুরুষসহ ১০ জন।

নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশায় ১০ মিনিটের পথ। শাখাসড়কের সঙ্গে হাতের ডানপাশে টিনশেড ভবনের সামনে বড় সাইনবোর্ড ‘হাসান কুটিরশিল্প’। এখানে প্রায় তিন বছর ধরে চলছে কুটিরশিল্পের কাজ। সামনে মাঝারি ধরনের ফার্নিচারের দোকান। ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ছোট ছোট বাঁশের টুকরো। নারী-পুরুষ মিলে আট থেকে ১০ জন। কেউ বাঁশ চেঁছে রাখছেন। কেউ রং করছেন সেই বাঁশে।

হাসান কুটিরশিল্প কারখানায় একদিন

ছোট-বড় বাহারি ফুলের টব তৈরি করছেন কেউ। একটু ভেতরে যেতেই ছোট আরেকটি ঘরে জাহাঙ্গীর আলমের দেখা মিললো। তিনি হার্ডবোর্ড আর বাঁশ দিয়ে টবে নকশা করছেন। ঘরজুড়ে হস্তশিল্পের তৈরি নানা নান্দনিক জিনিসপত্র। পাশের টেবিলে তার স্ত্রী মরিয়ম ছোট টবগুলোতে বাহারি পাথর বসানোর কাজে ব্যস্ত।

বাঁশ, বেত ও মাটি দিয়ে হাতে তৈরি কুটিরশিল্পের জিনিসপত্রের কদর রয়েছে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে। একটু ভিন্ন আদলের পণ্য কিনতে আগ্রহী অনেক ক্রেতা। মাটির টান পাওয়া যায় এ ধরনের পণ্যে। তাই তৈরি জিনিসপত্র ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়াটা ভীষণ আনন্দের কারিগরের কাছে। এমন অনুভ‚তির কথা জানিয়ে হাসান কুটিরশিল্পের কর্মচারী সালাম ইসলাম জানান, বেতন-ভাতা কিংবা সুযোগ-সুবিধা চেয়ে কাজের আনন্দটাকেই বেশি উপভোগ করি। পাবনায় নিজের জš§স্থানে এমন একটি কারখানা গড়ে তোলার স্বপ্ন তার চোখেমুখে।

কথা হয় কারখানার ব্যবস্থাপক কাশেম আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, আশুলিয়ার এই গাজীরচট এলাকায় রিকশা চালাতাম। একসময় জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার উৎসাহে ওই পেশা ছেড়ে এখানে এসেছি। এখন খুব ভালো আছি। খেয়ে-পড়ে বেঁচে আছি। ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ালেখা করছে।

জাহাঙ্গীরের স্ত্রী মরিয়ম জানান, সংসারের কাজের পাশাপাশি স্বামীর সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করি। জাহাঙ্গীর আলম পণ্য কেনাবেচার জন্য বিভিন্ন সময় কারখানার বাইরে থাকলে তখন তাকেই সামলাতে হয় সবকিছু।

কারখানা মালিক জাহাঙ্গীর আলম জানান, স্বল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করি কুটিরশিল্পের কাজ। এখন পরিবারের খরচ মিটিয়ে ভালোই চলছে আমার কারখানা। এখানকার তৈরি জিসিনপত্র দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়, এমনকি বিদেশেও যায়। তবে পুঁজির অভাবে সরাসরি রফতানি করতে পারি না। সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা যাবে।

সাভারের সমবায় অফিসার মনিরা আখতার জানান, কুটিরশিল্পে আগ্রহীদের জন্য জাহাঙ্গীর আলম হতে পারেন অনুপ্রেরণা। পুঁজির সংকট মেটানো গেলে এসব ক্ষুদ্র কারখানা দেশের অর্থনীতিতে ভ‚মিকা রাখবে। তিনি আরও জানান, সাভারের বিভিন্ন এলাকার কুটিরশিল্পগুলো আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। অনেকে এ কাজে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কারখানা মালিক বা আগ্রহীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

 

জাহিদ হাসান, সাভার