প্রচ্ছদ শেষ পাতা

সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ ব্যয়ে শুভংকরের ফাঁকি

মাসুম বিল্লাহ: সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন সচল রাখতে ২০১৫ সালে প্রণীত হয় জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএসএস)। এতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিন শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। যদিও এখনও সে লক্ষ্য অর্জন হয়নি। সরকারের হিসাবে বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তায় যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ। তবে সামাজিক নিরাপত্তার মোট বরাদ্দের ৩৫ দশমিক তিন শতাংশই ব্যয় হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন বাবদ। জিডিপির অনুপাতে যা প্রায় এক শতাংশ। অথচ এটি সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হওয়া উচিত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি বাদ দিলে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয়িত সামাজিক নিরাপত্তার পরিমাণ জিডিপির দেড় শতাংশের মতো; যা লক্ষ্যের চেয়ে অনেক কম। আবার বিভিন্ন খাতে সামাজিক নিরাপত্তায় যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার সিংহভাগই অপচয় হচ্ছে।

এমনই চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে। গত বুধবার রাজধানীর বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার মিলনায়তনে সামাজিক নিরাপত্তা সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে উত্থাপিত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হয় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে; যা ওই সময়ে দেশের মোট জিডিপির আড়াই শতাংশ এবং ওই অর্থবছরের বাজেটের ১৩ দশমিক আট শতাংশ। অর্থবছরটিতে সামাজিক নিরাপত্তায় মোট কর্মসূচি ছিল ১১৪টি।

এই ১১৪টি কর্মসূচির মধ্যে শীর্ষ ২০টিতেই ৯০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। আর ছোট ৫০টি কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র দুই শতাংশ। সম্মেলনে উত্থাপিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক খাতে বরাদ্দ অর্থের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন প্রদানে। ওই অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ৬৪ হাজার কোটি টাকার ৩৫ দশমিক তিন শতাংশই ব্যয় হয়েছে এ খাতে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার মতো। যদিও অবসরোত্তর সুবিধাদি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, একজন সরকারি কর্মচারী চাকরি জীবনে যে সেবা প্রদান করেন, অবসরকালে তার এক ধরনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেনশন দেওয়া হয়। সুতরাং এটিকে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় আনা ঠিক নয়।

এদিকে দেশের মোট জিডিপির তিন শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় করার যে লক্ষ্য রয়েছে, তা অর্জনের জন্যই কৌশলে পেনশন সুবিধাকে এর আওতাভুক্ত করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এটি সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বাদ দিলে এটির আওতা মোট জিডিপির দেড় শতাংশে নেমে আসবে। আর জিডিপির অনুপাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায়ও এখন কম বলে জানান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

অন্য যেসব খাতে সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ ব্যয় হয় তার মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল পাঁচ দশমিক এক শতাংশ। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী বাবদ পাঁচ দশমিক এক শতাংশ, বয়স্ক ভাতা তিন দশমিক সাত শতাংশ, ভিজিএফ দুই দশমিক সাত, ইজিপিপি দুই দশমিক ছয়, ভিজিডি দুই দশমিক ছয়, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বৃত্তিবাবদ দুই দশমিক চার, টেস্ট রিলিফ (টিআর) খাতে দুই দশমিক দুই এবং সামাজিক প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তাবাবদ ব্যয় হয়েছিল মোট বরাদ্দের এক দশমিক আট শতাংশ।

এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন খাতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার আদর্শ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দীর্ঘদিন থেকেই। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সুবিধাভোগী বাছাই করার ফলে প্রকৃতপক্ষে যারা এ সুবিধার যোগ্য, তারা পান না বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী সচ্ছল পরিবারের সদস্য পেয়ে যান বলে সম্মেলনে উঠে আসে।

২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য উত্থাপন করে জানানো হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ করা সুবিধার ৭৫ শতাংশই গেছে সচ্ছল পকেটে। আর এ সুবিধার সঠিক বিতরণ নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে যে সুপারিশ করা হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি। ওই কৌশলপত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি তথ্যভাণ্ডার প্রস্তুত করার কথা ছিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। কিন্তু কৌশলপত্র প্রণয়নের পর চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সামাজিক নিরাপত্তার অর্থ পাওয়ার যোগ্য নয়, এমন ব্যক্তিদের পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি বহুবার এ বিষয়ে কথা বলেছি। যে পদ্ধতি অনুসরণ করলে প্রকৃত দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া মানুষ সামাজিক নিরাপত্তার সুফল ভোগ করতে পারেন, তা অনুসরণ করা উচিত।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..