প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য

মাসুম বিল্লাহ: দারিদ্র্যহার কমিয়ে আনা ও অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনতে পরিচালনা করা হয় সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাসহ সরকারের সব পরিকল্পনা দলিলে দারিদ্র্য নিরসনে সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। যে অঞ্চলে দারিদ্র্যহার বেশি, ওই অঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সুবিধা সে হারে বণ্টন করা হচ্ছে না। অপেক্ষাকৃত কম দারিদ্র্য যে অঞ্চলে, সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সুবিধা বণ্টনের হার বেশি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত খানা আয়-ব্যয় জরিপের ফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপের ফলে দেখা যায়, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধার আওতায় থাকা জনগোষ্ঠীর হার সবচেয়ে বেশি বরিশাল বিভাগে। এ বিভাগের ৫৬ দশমিক দুই শতাংশ খানা আর ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী সামাজিক নিরাপত্তার কোনো না কোনো সুবিধা ভোগ করে। যদিও এ বিভাগে দারিদ্র্যের হার অন্য চার বিভাগের চেয়ে কম। বরিশাল বিভাগে উচ্চ দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২৬ শতাংশ যা জাতীয় দারিদ্র্য হারের চেয়ে কিছুটা বেশি। জাতীয়ভাবে উচ্চ দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক তিন শতাংশ। আর জাতীয়ভাবে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাপ্রাপ্ত খানার হার ২৭ দশমিক আট শতাংশ এবং সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর হার ২৮ দশমিক সাত শতাংশ। বরিশাল বিভাগের চেয়ে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও খুলনা বিভাগে দারিদ্র্য বেশি। কিন্তু সেখানে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় থাকা জনগোষ্ঠীর হার বরিশাল বিভাগের চেয়ে অনেক কম।

রংপুর বিভাগে সাধারণ দারিদ্র্য বা উচ্চ দারিদ্র্যের হার ৪৭ দশমিক দুই শতাংশ। অথচ সেখানে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাপ্রাপ্ত খানার হার ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ৪৫ দশমিক দুই শতাংশ। সাধারণভাবে দারিদ্র্য হারের চেয়ে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর হার অন্য বিভাগগুলোয় বেশি। কিন্তু রংপুর বিভাগে এর উল্টো চিত্র। এখানে দারিদ্র্য হারের চেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার মোট দারিদ্র্য হারের চেয়ে কম।

সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিইডির সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা বণ্টনে সমতা আনার জন্য সব দরিদ্র মানুষকে এ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্ত কৌশলে (এনএসএসএস) এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। এছাড়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়ও সমতাভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা বণ্টনের কথা বলা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় থাকা জনগোষ্ঠীর হার সবচেয়ে কম ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগের ১২ দশমিক আট শতাংশ জনগোষ্ঠী ও ১২ দশমিক চার শতাংশ খানা এ সুবিধা পায়। তবে এ বিভাগে দারিদ্র্যের হারও সবচেয়ে কম। এ বিভাগে মোট জনগোষ্ঠীর ১৬ শতাংশ উচ্চ দারিদ্র্য হারের মধ্যে আছে।

অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে ১৮ শতাংশ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পায়। সেখানে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক চার শতাংশ। খুলনা বিভাগে উচ্চ দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক পাঁচ শতাংশ। আর সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ৪২ দশমিক আট শতাংশ। ময়মনসিংহ বিভাগে উচ্চ দারিদ্র্যের হার ৩২ দশমিক আট শতাংশ। বিভাগটিতে সুবিধাভোগীর হার ২৭ দশমিক সাত শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে দারিদ্র্যের ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ, বিভাগটিতে সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ৩৭ দশমিক সাত শতাংশ। আর সিলেট বিভাগে এ হার ১৬ দশমিক দুই শতাংশ। সেখানে সুবিধাভোগীর হার ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

এদিকে সামাজিক বৈষম্য কমানো, টেকসই ও সুষম উন্নয়নের জন্য সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পিছিয়ে পড়া এলাকার জন্য ‘পশ্চাৎপদ অঞ্চল তহবিল’ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ তহবিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য বিমোচনে নানা কর্মসূচি নেওয়াসহ ক্লাস্টারভিত্তিক কর্মকাণ্ড হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দুবছর পার হলেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সামাজিক নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘মিস টার্গেটিং’ একটা বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা বণ্টনে প্রকৃত প্রাপ্য ব্যক্তি নির্বাচন করা হয় না। তাছাড়া দুর্নীতি ও লিকেজও বড় সমস্যা। এসব সমস্যা দূর করতে হলে একটি পোভার্টি ডেটাবেজ করতে হবে। এরই মধ্যে সে বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ওটা সম্পন্ন হলে সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে অনেকটা সুশাসন আসবে।

তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্যহার বেশি হলেই যে সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বণ্টনের হার বেশি হবে, তেমনটি নয়। কারণ এটি বণ্টনের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত অনেক জটিলতা আছে। শুধু দারিদ্র্যহার বিবেচনায় নিয়েই এটি করা হয় না, ভৌগোলিক অবস্থানও একটি ব্যাপার।