প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সারাদেশে একজনও নেই রাসায়নিক পরীক্ষক!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: সারাদেশে একজনও নেই রাসায়নিক পরীক্ষক! মাত্র দুজন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক দিয়ে চলছে দেশের প্রধান তিনটি রাসায়নিক পরীক্ষাগার। যদিও বর্তমান অর্গানোগ্রাম অনুসারে দেশের বৃহৎ শুল্ক স্টেশন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারেই ১২ জন পরীক্ষকের পদ রয়েছে; যা প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে ৫৮ জন। কিন্তু দেশের প্রধান বন্দরের এ ল্যাবটিই চলছে মাত্র একজন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক দিয়ে। বাকি মোংলা ও বেনাপোল বন্দর মিলেই আছে একজন পরীক্ষক।

অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ৬ মাসের সময় বেঁধে দিলেও গত আট বছরেও মানা হয়নি নির্দেশনা। দেশের সব স্থল ও সমুদ্রবন্দরের শুল্ক ভবন/কমিশনারেট ও এলসি স্টেশনসমূহে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন ও আধুনিকায়নের কথা থাকলেও এখনও বাস্তবায়ন হয়নি হাইকোর্টের নির্দেশনা। ফলে চট্টগ্রাম, মোংলা ও বেনাপোল শুল্ক স্টেশন ছাড়া দেশের সব কয়টি শুল্ক ভবন চলছে রাসায়নিক পরীক্ষাগার ছাড়া। আর যে তিনটি রাসায়নিক পরীক্ষাগার আছে, সেগুলো চলছে খুঁড়িয়ে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন নেই কোনো সেন্ট্রাল কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি। যার অধীনে দেশের সব কাস্টমস ল্যাবরেটরি পরিচালিত হবে এবং সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নমুনা বিশ্লেষণের কাজও করবে।

কিন্তু দেশের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি-রপ্তানি যে কাস্টমস হাউস দিয়ে হয়ে থাকে, সেই কাস্টমসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারটিও পড়ে আছে মুহূর্ষু অবস্থায়। নিয়োগ দেয়া হয়নি পর্যাপ্ত লোকবল। অভাব আছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের। আর এই পরীক্ষাগারে যে একজন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক আছেন তিনি করতে পারেন না সব ধরনের রাসায়নিক পরীক্ষা। ফলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ফরমালিন ও সাইট্রিক অ্যাসিড ছাড়া বর্তমানে কোনো ধরনের রাসায়নিক পরীক্ষা হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এক কর্মকর্তা জানান ‘ফরমালিন ও সাইট্রিক অ্যাসিড’ ছাড়া কোনো ধরনের রাসায়নিক পরীক্ষা হচ্ছে না ফলে অন্য সব ধরনের পরীক্ষার জন্য বহিঃল্যাবে পাঠাতে হচ্ছে। এতে সময় ব্যয় হচ্ছে। যার ফলে ডুয়িং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি মাহবুব আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও লোকবল না থাকায় সঠিক পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। অনেক নমুনা পরীক্ষায় ভুল রিপোর্ট আসে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের পরীক্ষাগারের সঙ্গে বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবের রিপোর্টের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না। এতে ব্যবসায়ীদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। তাই এটি দ্রুত সময়ের মধ্যে আধুনিকায়ন ও লোকবল নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন’।

অন্যদিকে মোংলা ও বেনাপোল স্থল বন্দরের আরও বেহাল অবস্থ! কারণ ওই দুটি বন্দর চলছে মাত্র একজন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক দিয়ে। বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানিকারক মো. মাইন উদ্দিন জানান, ‘তিনি স্টিল মিলের রড গলানোর কাজে ব্যবহার হয়, এমন এক ধরনের বিশেষ মাটির ইট ভারতের গুজরাট থেকে আমদানির জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে এলসি খোলেন। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে বন্দরে পণ্য এলেও রাসায়নিক পরীক্ষকের অভাবে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষার করতে পারেনি। ফলে দুই মাসের অধিক সময় পার হয়েছে ওই চালান খালাস করতে। এতে আমদানিকারকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।’

দেশে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশ্রিত ফলের প্রবেশ রোধ করতে জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিটের বিপরীতে ২০১০ সালের ১০ মে একটি রুল জারি করেন হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।

এরপর ২০১৪ সালের জুলাইয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। ওই রায়ে বলা হয়, আমদানি করা ফল পরীক্ষা করে দেশের বাজারে ছাড়ার জন্য ছয় মাসের মধ্যে সব স্থল ও সমুদ্রবন্দর কেন্দ্রিক সব শুল্ক ভবন ও এলসি স্টেশনে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে।

নির্দেশনা পেয়ে একই বছরের ৩ আগস্ট এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সব শুল্ক ভবন এবং শুল্ক, আবগারি ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার বরাবর চিঠি পাঠায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকাসহ রাসায়নিক পরীক্ষকের পদ সৃষ্টির নির্দেশনা দেয়া হয়। এ নির্দেশনায় অত্যাধুনিক ল্যাব করতে কোনো বন্দরের শুল্ক ভবনে কী প্রয়োজন হবে, জনবল কত লাগতে পারে তার একটি হিসাব চাওয়া হয়। এরপর প্রত্যেকটি শুল্ক ভবন থেকে এই হিসাব পাঠানো হয়েছে এনবিআরে। কিন্তু আট বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি সে সিদ্ধান্ত।

জানা যায়, হাইকোটের নির্দেশনার আগে থেকেও এনবিআরে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে রাসায়নিক পরীক্ষাগার আধুনিকায়নের জন্য প্রস্তুতকৃত অর্গানোগ্রামসহ একাধিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর এসব চিঠি পাঠানোর পরও কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাস্টমসের যে কেমিক্যাল ল্যাবটি আছে, তাও পুরোনো অবস্থায় পড়ে আছে। যুগোপযোগী ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় জটিল মিশ্রণের পরিমাণগত বিশ্লেষণের জন্য ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রে ছুটতে হয় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), সায়েন্স ল্যাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা বুয়েটের ল্যাবে। এ ছাড়া এ ল্যাবে তরল কোকেনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্যের পরিমাণগত বিশ্লেষণের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও লোকবল নেই।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের রাসায়নিক পরীক্ষাগারের সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক মো. হেলাল হাসান বলেন, ‘আমি গত মাসের শেষ সপ্তাহে এখানে জয়েন করেছি। এখানে অন্য দুই ল্যাবের তুলানায় নমুনার পরিমাণ বেশি ও বিভিন্ন প্রকারের। দেশের বৃহৎ শুল্ক স্টেশনের রাসায়নিক পরীক্ষাগারে মাত্র একজন পরীক্ষক দিয়ে হয় না। ফলে বর্তমানে সব ধরনের রাসায়নিক পরীক্ষাও এখানে হচ্ছে না। যেসব পরীক্ষা ভুল হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো এখন করা হচ্ছে না। কারণ ওগুলো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। কিন্তু আমাদের হাতে সেই সময় নেই। একই সঙ্গে লোকবলের পাশাপাশি কিছু আধুনিক সরঞ্জামেরও প্রয়োজন।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সারদেশে তৃতীয় শ্রেণির মাত্র দুজন সহকারী রাসায়নিক পরীক্ষক রয়েছে, বিষয়টি আশ্চর্যজনক। এটি ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের ক্ষেত্রে বড় বাধা। আমরা রাসায়নিক পরীকক্ষাগার আধুনিকায়নের জন্য প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠিয়েছি। আশা করি, এ সমস্যার সমাধান হবে। তবে এটির সমাধান পুরোপুরি এনবিআরের হাতে নেই। এই কাজগুলো সম্পাদন হতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ঘুরতে হয়। তাই কাজ হতে সময় লাগছে।’

এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডর সদস্য (প্রশাসন) মাসুদ সাদিক শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের আরও ল্যাব হলে ভালো হতো। এ খাতে জনবল বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠিয়েছি। তবে কাস্টম হাউসের ল্যাবগুলোয় পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় আমরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা চালিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, সায়েন্স ল্যাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের ল্যাবে নমুনা পাঠাচ্ছি। এছাড়া চট্টগ্রাম, মোংলা ও বেনাপোল ছাড়া বাকি কাস্টম হাউসগুলোয় রাসায়নিক পরীক্ষা করার মতো তেমন পণ্য আসে না। ফলে ওইসব কাস্টম হাউসে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়নি। তবে দেশে কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগার নির্মাণের পরিকল্পনা আছে; যা নিয়ে কাজ চলছে।’