সারা বাংলা

সালথাকাণ্ডে পুরুষশূন্য গ্রাম আতঙ্কে নারী ও শিশু

প্রতিনিধি, ফরিদপুর: ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় ‘গুজব ছড়িয়ে’ হামলা চালানোর ঘটনায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিভিন্ন গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়েছেন এসব গ্রামের নারীরা। পরিবারের সব কাজ সামলে বাইরের কাজও করতে হচ্ছে তাদের। তারা হাটবাজারে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন। কিন্তু ক্ষেতের ফসল নিয়ে তারা পড়েছেন বিপদে।

উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, নারী ও শিশু ছাড়া আর কেউ বাড়িতে নেই। তাদের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। বাইরের কাউকে দেখলেই ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। ফসলের মাঠেও দেখা মেলেনি কোনো কৃষকের।

৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের লোকজন রামকান্তপুর এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়ন করতে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। পরে সালথা থানা, উপজেলা পরিষদ ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে আগুন দেয়া হয়। এ সময় দুটি সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেয় তারা। গুজব ছড়িয়ে এ ঘটনা ঘটানো হয় বলে প্রশাসন ও স্থানীয়দের ভাষ্য।

এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬১ জনকে গ্রেপ্তার ও পাঁচ মামলায় ২৬১ জনের নাম উল্লেখসহ কয়েক হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে।

সালথা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন গ্রামের নারীরা পেঁয়াজ-পাটসহ নিত্যপণ্য কেনাবেচা করছেন। পেঁয়াজ বেচতে আসা নাম প্রকাশে ইচ্ছুক এক নারী বলেন, বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। ওই ঘটনার পর থেকে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে সবাই। বাড়িতে পেঁয়াজ ছিল। সেগুলো বিক্রি করতে এসেছি। বিক্রি করে যে টাকা পাব তাই দিয়ে বাজার-সদাই করব আর কিস্তি দেব।

ঘটনার শুরু ফুকরা বাজারে। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, সব দোকান বন্ধ। এখানে কথা বলার মতো কোনো পুরুষকে পাওয়া যায়নি।

কয়েক নারী জানিয়েছেন, কোনো সময় পুলিশ আসে সে আতঙ্কে কাটে তাদের দিনরাত। বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। সবাই গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে রয়েছে। অনেকে সংকোচ কাটিয়ে বাজারে যেতে পারছেন না। তারা ক্ষেতের ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ফসল ওঠানোর সময় এখন। কোনো পুরুষ না থাকায় মাঠের ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না তারা। অথচ এই ফসল বিক্রি করে সারা বছর সংসার চালাতে হয় তাদের।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, কোনো সহিংস ঘটনা ঘটলে কয়েক দিনের জন্য বিভিন্ন গ্রামে এ জাতীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আশা করি শিগগির এ অবস্থা কেটে যাবে।

পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামানের বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় তাদের আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। পুলিশ কাউকে হয়রানি করছে না। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

গ্রেপ্তারের বিষয়ে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জামাল পাশা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দুজন গুলিবিদ্ধ। তাদের পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আর মিরান মোল্লা (৩৫) নামে একজন গ্রেপ্তারের পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাছাড়া হামলার সময় জুবায়ের হোসেন (২০) নামে আহত একজনের মৃত্যু হয় চিকিৎসাধীন অবস্থায়।

জামাল পাশা আরও বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর পর ৪৮ জনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত ও এক মাওলাকে মারধরের গুজব ছড়িয়ে এলাকাবাসীকে উত্তেজিত করা হয় মাইক থেকে। তাছাড়া বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন থেকে ফেসবুক লাইভে গুজব ছড়ানো হয়। পরে রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ধরে উপজেলা কমপ্লেক্স, উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তর তছনছ করার পাশাপাশি আগুন দেয় হামলাকারীরা। এতে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য যোগ দেয়। তারা সাত শতাধিক গোলাগুলি নিক্ষেপ করে।

এদিকে সালথাকাণ্ডে এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পায়নি তদন্ত কমিটি। ফুকরা বাজারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হীরামনির গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ব্যক্তিকে পেটানোর অভিযোগ ওঠে। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে এসিল্যান্ডের গাড়ি থেকে নেমে কাউকে মারধরের সত্যতা পায়নি জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটি। গত রোববার জেলা প্রশাসকের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, তাণ্ডবের ঘটনায় এসিল্যান্ডের ভূমিকার বিষয়টি প্রশাসনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখেছে কমিটি। তাকে অনেক জেরা করা হয়েছে। ওই তদন্ত কমিটির পাশাপাশি প্রশাসনিক একটি তদন্ত কমিটিও এসিল্যান্ডের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করেছে। সে কমিটিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার একজন প্রতিনিধিও ছিলেন। সেই প্রতিবেদনেও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..