প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আবাসিকে গ্যাসের দাম সাড়ে তিন বছরে বেড়েছে শতভাগের বেশি

ইসমাইল আলী: নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নিয়মিতই বাড়ছে গ্যাসের দাম। গত কয়েক বছরে এ বৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে আবাসিকে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চেপেছে দাম বৃদ্ধির বোঝা। এমনকি মার্চ ও জুনে দুই দফা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণাতেও আবাসিকে সর্বোচ্চ হারে বাড়ানো হচ্ছে। যদিও মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের মাত্র ১৩ শতাংশ যাচ্ছে আবাসিক খাতে।

গত সাড়ে তিন বছরে বিভিন্ন খাতের মধ্যে আবাসিকে গ্যাসের মূল্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি হারে। খাতটিতে এ সময়ে গ্যাসের মূল্য বেড়ে হয়েছে শতভাগের বেশি। শিল্প, ক্যাপটিভ, সিএনজিসহ অন্যান্য খাতেও গ্যাসের মূল্য বেড়েছে এ সময়ে সবচেয়ে বেশি।

আড়াই দশকের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ সালে একমুখো চুলার মাসিক বিল ছিল ১১৫ টাকা। দুই দফা বৃদ্ধির পর ১৯৯৪ সালে এ হার দাঁড়ায় ১৬০ টাকা। অর্থাৎ বিএনপির শাসনামলের পাঁচ বছরে একমুখো চুলায় গ্যাসের দাম বেড়েছে ৪৫ টাকা। আর ওই সময়ে দ্বিমুখো চুলার বিল বাড়ে ৫৫ টাকা। ১৯৯১ সালে এই শ্রেণির গ্রাহকদের গ্যাসের দাম ছিল ১৯৫ টাকা। ১৯৯৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৫০ টাকা।

ওই সময় মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ২৬ পয়সা। এতে ঘনমিটারপ্রতি গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ২ টাকা ৯০ পয়সা।

এরপর আওয়ামী লীগের শাসনামলে (১৯৯৬-২০০১) একমুখো চুলার ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৫০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলার ক্ষেত্রে ১২০ টাকা। এর মধ্যে ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে দুই দফা বাড়ে গ্যাসের দাম। এতে একমুখো চুলার ক্ষেত্রে বিল বেড়ে দাঁড়ায় ২১০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলার ক্ষেত্রে ৩৩০ টাকা। আর মিটার গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয় ঘনমিটারে ৯৫ পয়সা। এতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়ে ৩ টাকা ৮৫ পয়সা।

২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার চার দফা বাড়ায় গ্যাসের দাম। এতে একমুখো চুলায় গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫০ টাকা ও দ্বিমুখো চুলায় ৪০০ টাকা। অর্থাৎ আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ে যথাক্রমে ১৪০ ও ৭০ টাকা। একই সঙ্গে প্রতিবারই মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়। এতে ২০০৫ সালে আবাসিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ চারবারে বাড়ানো হয় প্রতি ঘনমিটারে ৭৫ পয়সা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর মেয়াদের মধ্যে ২০০৮ সালে সিএনজি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। সে সময় এটি বাড়িয়ে চারগুণ করা হলেও আবাসিকসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়নি।

মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালে সব ধরনের গ্যাসের দাম পুনরায় বাড়ানো হয়। তবে পুরো মেয়াদে শুধু একবারই বাড়ে আবাসিকে গ্যাসের দাম। যদিও যানবাহনে ব্যবহƒত সিএনজির দাম দুই বার বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় আবাসিকে এক ও দ্বিমুখী চুলায় গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৫০ টাকা হারে। আর মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের বিল বাড়ানো হয় ঘনমিটারে ৫৬ পয়সা। এতে আবাসিকে গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় একমুখো চুলায় ৪০০ ও দ্বিমুখী চুলায় ৪৫০ টাকা। মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫ টাকা ১৬ পয়সা।

আবাসিকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পুরোনো সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে সরকারের চলতি মেয়াদে। এ সময় মাত্র সাড়ে তিন বছরে আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ছে চুলাপ্রতি ৫০০ টাকা বা শতভাগের বেশি। এর মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২০০ টাকা বাড়ানো হয়। সে সময় একমুখো চুলার বিল দাঁড়ায় ৬০০ ও দ্বিমুখী চুলায় ৬৫০ টাকা। আগামী মার্চ ও জুনে দুই দফায় আরও ৩০০ টাকা বাড়বে চুলার বিল। এতে জুনে একমুখো চুলার বিল বেড়ে দাঁড়াবে ৯০০ ও দ্বিমুখী চুলায় ৯৫০ টাকা। সে সময় মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের বিল বেড়ে দাঁড়াবে ঘনমিটারে ১১ টাকা ২০ পয়সা। অর্থাৎ সাড়ে তিন বছরে মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের গ্যাসের বিল বাড়ছে ঘনমিটারে ৬ টাকা চার পয়সা।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, সরকার এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছে। এতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম পড়বে বর্তমান মূল্যের প্রায় পাঁচগুণ। ওই কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। অথচ দাম বৃদ্ধির পুরো প্রক্রিয়াটিই অবৈধ। কারণ গত আগস্টে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিটি কোম্পানির প্রস্তাবনা বিইআরসির কারিগরি কমিটি নাকচ করে দেয়। এরপরও দাম বাড়ানোও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

দুই ধাপে দাম বৃদ্ধিকে বিইআরসির আইনের লঙ্ঘন বলে দাবি করে তিনি বলেন, বছরে একবার গ্যাসের দাম বাড়ানো যায়। তবে শর্ত থাকে সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো থেকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবনা আসতে হবে। অথচ একবারের প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই করে তিন মাসের ব্যবধানে দুই দফা গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঘোষণা সম্পূর্ণ বেআইনি। এটি বাতিলে বিইআরসিতে দ্রুত আপিল করা হবে।

তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সঠিক আছে বলেই দাবি করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম কম ছিল। তাই দাম বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের ওপর চাপ বিবেচনায় নিয়ে দুই ধাপে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।