সুশিক্ষা

সা ফ ল্য গা থা ঋতুর সঙ্গী মা ও টেবিল ল্যাম্প

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অনেক মানুষ রয়েছেন আমাদের আশপাশে। তাদের অনেকে নানাভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। অনেকের ধারণা, তারা সমাজের জন্য বোঝাস্বরূপ। এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাও সভ্যতা বিনির্মাণে অবদান রেখেছেন। তাদের ধ্যান-জ্ঞান ও মানবতায় সমৃদ্ধ হয়েছে এ জগৎ। স্টিফেন হকিং, ফ্রিদা কাহলো, ক্রিস্টি ব্রাউন, হেলেন কেলার প্রমুখ তেমনই কয়েকজন। এ মনীষীদের আদর্শ মনে করেন বিশ্বের তাবৎ মানুষ। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অনেকে তাদের অনুসরণ করেন। তাদের আদর্শকে বুকে লালন করেন। জীবনযুদ্ধে জয়ী হন। তাদের অনুসরণ করে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছেন রাজশাহীর এক কিশোরী।
মুনিরা ইয়াসমিন ঋতু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ড থেকে পেয়েছেন গোল্ডেন জিপিএ-৫। রাজশাহী শহরের ভদ্রা এলাকায় মায়ের সঙ্গে থাকেন তিনি। বাড়ি নওগাঁয়। বাবা নওগাঁর একটি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা মেরিনা পারভীন রিনা গৃহিণী। তার এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার গল্প।
জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুনিরার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। তার চোখের জ্যোতি একেবারেই কম। চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশের অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। দুঃখের সংবাদ পেয়েছেন বারবার মুনিরার চোখের কোনো চিকিৎসা নেই। বাকিটা জীবন এভাবেই চলতে হবে। যতটুকু দেখতে পান তা সূর্যের আলো আর পড়ার জন্য প্রখর আলোসম্পন্ন টেবিল ল্যাম্পের মাধ্যমে। দিনের বেলায়ও চারদেয়ালের ভেতরে টেবিল ল্যাম্প ছাড়া কিছুই দেখতে পান না তিনি।
পরীক্ষাকেন্দ্রে তার মা সব সময় টেবিল ল্যাম্প সঙ্গে নিয়ে যান যেন মেয়ে পরীক্ষা দিতে পারে। সূর্যের আলোতে মুনিরা দেখতে পেলেও তা সামান্য। হাঁটার সময় তাকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়। পরিচিত জায়গায় চলাফেরায় কিছুটা স্বচ্ছন্দবোধ করলেও অপরিচিত জায়গায় একেবারেই হাঁটতে পারেন না।
২০০৯ সালে মুনিরার অ্যাকাডেমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাজশাহীর পিনাকল স্টাডি হোমে। পরে শাহিন স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখানে তৃতীয় শ্রেণিতে মেধার স্বাক্ষর রাখেনÑবৃত্তি পান। এরপর রাজশাহীর ভদ্রা এলাকার সাইদুর রহমান অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন চতুর্থ শ্রেণিতে। এখানে চতুর্থ শ্রেণিতে বৃত্তি ও পঞ্চম শ্রেণিতে পান বোর্ড বৃত্তি। পরে একই এলাকার অক্ষর অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। ২০১৬ সালে জেএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ড থেকে পান জিপিএ-৫। সর্বশেষ ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অর্জন করেন গোল্ডেন জিপিএ-৫।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক নেতিবাচক কথা শুনতে হতো মুনিরাকে। অনেকে বলত, তাকে দিয়ে পড়ালেখা সম্ভব নয়। টেবিল ল্যাম্পের ব্যবহার দেখে সহপাঠীরা হাসাহাসি করত।
মুনিরার মা বলেন, শিক্ষকরাও বলতেন তাকে দিয়ে সম্ভব নয়, কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। মুনিরার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে।
মুনিরার আজকের এ সফলতার পেছনের তার মায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংসারের সব ঝামেলা সামলে তিনি সন্তানকে নিয়ে আসেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মা-ই মুনিরার ছায়াসঙ্গী। দুই মেয়ে আর এক ছেলের মধ্যে মুনিরা মেজ। মা তাকে কখনো বোঝা মনে করেননি। একজন আদর্শ মায়ের মতোই মেয়ের নানা সমস্যার সমাধান করে চলেছেন। আগামী দিনগুলোতেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী অদম্য এ মেয়ের পাশে থেকে তার স্বপ্নগুলোকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে চান তিনি।
পড়ালেখার পাশাপাশি ড্রয়িংয়েও পটু মুনিরা। লিখতে পারেন কবিতা ও ছোটগল্প। নানারকম হস্তশিল্প তৈরি করতে পারেন। দৃষ্টিহীনতা তাকে পিছিয়ে দেয়নি জীবন থেকে।
বড় হয়ে তিনি দৃষ্টিহীনদের জন্য কাজ করতে চান। মুনিরা বলেন, আমাকে নিয়ে অনেকেই হাসাহাসি করেছে। আমি জানি এটা কত কষ্টের। তাই আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে দৃষ্টিশক্তিহীনদের জন্য অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করে ব্যবহারিক জ্ঞান দিতে চাই। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যুক্ত হয়ে মানুষের পাশে থাকতে চান মুনিরা।

নাজমুল মৃধা

সর্বশেষ..