প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সিংহভাগ কোম্পানির শেয়ারেই আইসিবির লোকসান

নিয়াজ মাহমুদ: রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ’ (আইসিবি)-এর পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার ও ফান্ডের সংখ্যা ৩৫৪টি। এর মধ্যে ২৩৫ কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য (৩০ জুন ২০১৬ পর্যন্ত) ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম। অর্থাৎ ৬৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ারই লোকসানে রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৫-১৬) জানা যায়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইসিবির পোর্টফোলিওতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন ৪৪টি কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। আর ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ (ওটিসি) মার্কেটে রয়েছে ১৮টি কোম্পানি। সব মিলিয়ে ৩৫৪টি কোম্পানি ও ফান্ডের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে আইসিবি। এর মধ্যে মাত্র ১১৯টির ক্রয়মূল্য তুলনায় বাজারমূল্য বেশি রয়েছে। অর্থাৎ মুনাফায় রয়েছে। বাকি ২৩৫টি কোম্পানি ও ফান্ডের শেয়ার ক্রয়মমূল্য থেকে বর্তমান (৩০ জুন ২০১৬) বাজারমূল্য কম রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদের সঙ্গে। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আইসিবির বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা অনুসরণ করেন। তাই প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।’

‘সেকেন্ডারি মার্কেটের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বিবেচনায় আইসিবি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা করে আসছে’ দাবি করে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইফতেখার-উজ-জামান বলেন, পোর্টফোলিওতে এত বেশি শেয়ার থাকা নিয়ে কেউ সমালোচনা করতেই পারে। তবে আইসিবির ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি শুধু মুনাফার জন্য পরিচালিত হয় না, শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখা এবং এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও পালন করছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, পোর্টফোলিওতে তালিকাভুক্ত ২০টি খাতের শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে আটটিতে মুনাফা রয়েছে। বাকি ১২টিতে লোকসান। ব্যাংকিং খাতে আইসিবির মোট বিনিয়োগের তুলনায় লোকসান হচ্ছে ১২০ কোটি টাকা। প্রকৌশল খাতের ২৫ কোম্পানিতে আইসিবির ক্রয়মূল্যে বিনিয়োগ হচ্ছে ৩৩০ কোটি টাকা। এগুলোর বাজারমূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ২৯৫ কোটি টাকা এবং লোকসানের পরিমাণ পৌনে ১১ শতাংশ। বিমা খাতের ১৮৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ করা শেয়ার মূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ১১৯ কোটি টাকা আর লোকসানের পরিমাণ ৩৭ শতাংশ। একইভাবে সিরামিক খাতে ১১ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৪৭ শতাংশ, বিবিধ খাতে ৪৩ শতাংশ, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সাড়ে ২১ শতাংশ, ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের প্রায় ৩৪ শতাংশ লোকসান রয়েছে।

আইসিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে আইসিবি এবং এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪৫২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা বিগত অর্থবছরের ১১ হাজার ৯৮০ কোটি ৫৫ লাখ টাকার তুলনায় চার দশমিক ৪১ শতাংশ কম। এ সময় উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের মোট টার্নওভার এক লাখ ১৫ হাজার ৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মধ্যে আইসিবি এবং এর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর লেনদেন ছিল ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরে ছিল ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে পুঁজিবাজারে আইসিবির ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ তার সৃষ্টিলগ্ন হতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে দৃঢ় এবং উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করার লক্ষ্যে পুঁজিবাজার ও অর্থবাজারে যুগোপযোগী এবং সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে অবদান রেখে আসছে। একমাত্র বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবি দেশের আর্থিক বাজারে একটি গৌরবময়, সমৃদ্ধ, দায়বদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পুঁজিবাজারের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইসিবি বরাবরের মতো মার্কেট মেকার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক জারি করা ‘করপোরেট সুশাসন নীতিমালা’ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যাতে আরও সুচারুভাবে পরিপালন করে, সেজন্য আইসিবি তার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এছাড়া আইসিবি পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ পরিপালনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়নে সহযোগিতা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রবর্তনে পথিকৃৎ হিসেবে আইসিবি ১৯৮০ সাল হতে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৭ দশমিক ৫০ কোটি (পরবর্তীতে ১৭ দশমিক ৭৫ কোটি) টাকা মূলধন সংবলিত আটটি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড বাজারজাত করেছে। বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী আইসিবি পরিচালিত প্রথম হতে ষষ্ঠ আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড মেয়াদি হতে বে-মেয়াদি স্কিমে রূপান্তর সংক্রান্ত সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সপ্তম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ড এবং অষ্টম আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ডের রূপান্তর অথবা অবসায়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।