সুশিক্ষা

‘সিভাসু গবেষণা তরী’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উদ্যোগে রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে বিশেষায়িত গবেষণা তরী উদ্বোধন করেছেন। বৃহস্পতিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে তিনি এ গবেষণা তরী উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে গবেষণা তরীর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গবেষণা প্রয়োজন। ভাসমান এ গবেষণা তরী পরিচালনার কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মাছের উৎপাদন বাড়লে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নতুন কর্মসংস্থানও হবে।

গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে উদ্বোধনকালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার, সিভাসু উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ, মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম নূরুল আবছার খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাঙামাটির ডেপুটি কমিশন একেএম মামুনুর রশিদ।

এ গবেষণা তরীর মাধ্যমে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় নতুন মাইলফলক উšে§াচিত হলো। দেশে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম। এটি সিভাসুর শিক্ষা ও গবেষণায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। প্রায় তিন কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ গবেষণা তরীতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসহ তিনটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে।

বিশেষায়িত গবেষণা তরীর মাধ্যমে বহুমুখী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে মালয়েশিয়া সরকার তাদের কৃত্রিম হ্রদ ‘লেক কেনিয়র’-এর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। আর সেই তরীর আদলে সিভাসু’র তরীটি নির্মাণ করা হয়েছে।

১৭ মিটার দৈর্ঘ্য ও সাত মিটার প্রস্থবিশিষ্ট দ্বিতল এ গবেষণা তরীটি তৈরি করা হয়েছে সুইডেনে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে এটি কাপ্তাই লেকে নামানো হয়। গবেষণা তরীটির স্থিতিশীলতা ও হাল কাঠামো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের পরীক্ষিত ও অনুমোদিত।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে কাপ্তাই লেকের মাছের অনেক প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে মহাশোল, পিপলা শোল, বাঘাআইড়, নান্দিনা প্রভৃতি। বিলুপ্তির পথে রয়েছে সরপুঁটি, পাবদা, গুলসা, বাচুয়া ও ভঙ্গন বাটা প্রভৃতিসহ ১৮ প্রজাতি। কাপ্তাই লেক একসময় কার্পজাতীয় মাছের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে এ হ্রদে প্রাপ্ত মাছের মধ্যে ৮১ শতাংশ ছিল কার্পজাতীয়। বর্তমানে ৯০ শতাংশই চাপিলা ও কাচকি।

লেকের পার্শ্ববর্তী এলাকায় গাছপালা উজাড় করে ফেলায় ভূমিধ্বস হচ্ছে। এতে লেকের গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি দৈনন্দিন বিপুল পরিমাণ মনুষ্যবর্জ্যসহ অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। লেকের চারপাশের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ পানীয় জল, রান্না, ধোয়ামোছা, গোসল প্রভৃতি কাজের জন্য এর পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হ্রদের স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। ফলে নষ্ট হচ্ছে লেকের গতিপথ, যা ব্যাহত করছে মাছের অভয়াশ্রম ও প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ। এছাড়া লেকের চারপাশে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পানি দূষিত হওয়ায় জলজ প্রাণীর ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। এখনই যদি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে লেকের মৎস্য ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। তাই কাপ্তাই লেকের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও এর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ফলপ্রসূ গবেষণা। আর এ তাগিদ থেকে সিভাসু কর্তৃপক্ষ এ গবেষণা তরী নির্মাণের

উদ্যোগ নেয়।

অন্তত ১৫টি কাজ নিয়ে লেকে নামবে গবেষণা তরীটি। এর মধ্যে অন্যতম হলো, লেকের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের স্টক অ্যাসেসমেন্ট, মাছের অভয়াশ্রম সৃষ্টির জন্য স্থান নির্বাচন, সময়ের সঙ্গে লেকের বিভিন্ন ভৌত রাসায়ানিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা ও বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য প্রজাতির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। পাশাপাশি রয়েছে লেকের চাষযোগ্য সম্ভাব্য প্রজাতি বের করা, বিভিন্ন মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা নিরূপণ এবং প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় জনশক্তিকে খাঁচা ও পেন কালচারের মাধ্যমে মাছ চাষে উদ্যোগী করা, ঘোনায় মাছ চাষের সুবিধা ও অসুবিধাগুলো যাচাই করা হবে। এছাড়া লেকের মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের বিস্তৃতির বর্তমান অবস্থা নিরূপণ ও প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে করণীয় বিষয় নির্ধারণ, লেক ভরাট হওয়ার জন্য দায়ী কারণগুলো বিশ্লেষণ ও নিরূপণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। লেকের দূষণ দূরীকরণেও কাজ করবে গবেষণা তরীটি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..