প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সিমেন্ট খাত: উৎপাদন সক্ষমতার ৩৮ শতাংশই অব্যবহৃত

 

নিয়াজ মাহমুদ: বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের সিমেন্ট। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। সর্বত্রই প্রতিনিয়ত সিমেন্টের ব্যবহার বাড়ায় দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। এ খাতে দেশি-বিদেশি কারখানা রয়েছে ৩৩টি। এসব কোম্পানির বছরে মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৩৯ মিলিয়ন টন। কিন্তু সব মিলিয়ে এর উৎপাদন হচ্ছে ২৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৬২ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ৩৮ শতাংশই অব্যবহৃত থাকছে বলে খাত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, গত নয় বছরে সিমেন্ট খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক তিন শতাংশ। এখন দেশে মাথাপিছু সিমেন্ট ব্যবহার হচ্ছে ১২৪ কেজি, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা কম। দিন দিন সিমেন্টের ব্যবহার বাড়লেও কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বাড়তি চাহিদা তৈরি ও রফতানির আশায় সিমেন্ট খাতে অনেক বড় বড় বিনিয়োগ হয়েছিল। ফলে দেশের মোট সিমেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা ৩৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। আবাসন খাতের স্থবিরতা এবং সরকারি কিছু বড় প্রকল্প বাদে অন্য কাজে গতি না থাকায় সিমেন্টের ৩৮ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তারা আরও জানান, গত পাঁচ বছর আগেও প্রায় ৭০টি সিমেন্ট কারখানা ছিল। এর মধ্যে ৩৩টিতে উৎপাদন চলছে। তাও উৎপাদন সক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহƒত হচ্ছে না। এদিকে বাজার শেয়ারের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে ৭০ শতাংশ বাকি ৩০ শতাংশ এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে।

স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি রফতানির সুযোগ রয়েছে। তবে তা উম্মোচন করা সম্ভব হচ্ছে না নানা কারণে। এর মধ্যে অন্যতম পণ্য পরিবহন ব্যয়। এটা বেশি হওয়ায় ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। আবার মিয়ানমারে রফতানি সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে একই কারণে।

সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আবদুল খালেক পারভেজ শেয়ার বিজকে বলেন, আবাসন খাতে মোট সিমেন্টের ৪০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। এ খাতে গতি না থাকায় কাক্সিক্ষত সিমেন্ট উৎপাদন হচ্ছে না। সিমেন্ট খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণ হচ্ছিল। তবে বাজার চাহিদা বর্তমানে অস্বাভাবিক কম। আর বাজার চাঙা করার দায়িত্ব ব্যবসায়ীদের একার নয়। এক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।

এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা শাহরিয়ার ইশতিয়াক হালিম বলেন, ‘বাংলাদেশে সিমেন্ট খাতের সম্ভাবনা প্রচুর। তবে কাঁচামাল আমদানি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভিআইআরএম ব্যবহার এ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সিমেন্ট খাতের উন্নয়নের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, রফতানি বাধা দূর এবং বৈদেশিক ঋণ সহজলভ্য করতে হবে।’

দেশের পাকা রাস্তাগুলো বিটুমিনের পরিবর্তে আরসিসি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এটা করলে সিমেন্টের ব্যবহার বহুগুণ বাড়বে। তখন উৎপাদন সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের মোট সিমেন্টের ৩৩ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে সরকার ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে। রিয়েল এস্টেট ও বাণিজ্যক ভবন তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ২৪ শতাংশ সিমেন্ট। অন্যদিকে ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণে সিমেন্টের ৪০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে, যা অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে। বাকি তিন শতাংশ সিমেন্ট অন্যান্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণ কমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পর আবাসন ও নির্মাণ শিল্পে স্থবিরতা দেখা যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সিমেন্ট খাতে। এ অবস্থার মধ্যে কয়েক দফায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। যদিও সরকারি খাতে বড় কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলায় সিমেন্ট খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশের সিমেন্টের বাজারে আধিপত্যের শীর্ষে রয়েছে দেশীয় কোম্পানি শাহ্? সিমেন্ট। বাজার দখলের দিক দিয়ে শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির মধ্যে একটি মাত্র কোম্পানি রয়েছে বিদেশি। মাত্র সাত শতাংশ বাজার দখল করে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট।

সিমেন্টের বাজারের শাহ সিমেন্টের দখল রয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ (মেঘনা ও বসুন্ধরা সিমেন্ট)। বাজার দখলের দিক দিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সেভেন রিংস ব্র্যান্ডের সিমেন্ট। বাজার চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ সিমেন্ট। পঞ্চম অবস্থানে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে প্রি?িময়ার সিমেন্ট। সপ্তম অবস্থানে রয়েছে এমআই সিমেন্ট (ক্রাউন সিমেন্ট)। অষ্টম অবস্থানে রয়েছে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট। বাজার দখলে নবম ও দশম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে হোলসিম (বর্তমানে কোম্পানিটিকে লাফার্জ সিমেন্ট ক্রয় করেছে) ও আকিজ সিমেন্ট।

স্থানীয় কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার সিমেন্ট, কনফিডেন্স সিমেন্ট, ডায়মন্ড সিমেন্ট, রয়েল সিমেন্ট, মোস্তফা হাকিম সিমেন্ট, শাহ্ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আকিজ সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, কিং ব্রান্ড সিমেন্ট, মেঘনা গ্রুপের ইউনিক সিমেন্ট, ফ্রেশ সিমেন্ট ও মেঘনাসেম, মদিনা গ্রুপের টাইগার সিমেন্ট, থ্রি রিংস ও বাফেলো হেড সিমেন্ট, এমআই সিমেন্টের ক্রাউন সিমেন্ট, মেট্রোসেম সিমেন্ট, ইস্টার্ন সিমেন্ট মিলস্’র সেভেন হর্স সিমেন্ট, আরামিট সিমেন্ট, আনোয়ার গ্রুপের আনোয়ার সিমেন্ট, মীর আখতার হুসেন লিমিটেডের মীর সিমেন্ট। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে, লাফার্জ হোলসিম। সম্প্রতি লাফার্জ সুরমা হোলফিমকে কিনে নিছে। হাইডেলবার্গ বাংলাদেশ লিমিটেডের স্ক্যান সিমেন্ট ও রুবি সিমেন্ট, সিমেক্স সিমেন্টের ব্র্যান্ড সিমেক্স, এমিরেটস সিমেন্ট মিলস্ ভারতীয় আদিত্য বিড়লার সঙ্গে উৎপাদন করছে আল্ট্রাটেক সিমেন্ট, সুনসিং সিমেন্ট সেভেন সার্কেল বাংলাদেশ লিমিটেড তৈরি করছে সেভেন রিংস্ সিমেন্ট।