দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

সিলেটে অর্ধশতাধিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে ‘রাজস্ব ফাঁকির’ সিগারেট

রহমত রহমান: নকল ও ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেটে দেশের বিভিন্ন বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বিশেষ করে সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্ধশতাধিক বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে এসব সিগারেট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বেঁধে দেওয়া মূল্যের চেয়ে অনেক দামে এসব সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এতে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

অবৈধ এসব সিগারেট নিরাপদে গন্তব্যে সিগারেট পৌঁছে দিতে কুরিয়ার সার্ভিসকে ব্যবহার করছে অসাধু একটি চক্র। সিলেট ভ্যাট কমিশনারেট এরই মধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান চালিয়ে নকল সিগারেট আটক ও মামলা করেছে। তবে চক্রটি সিগারেট পরিবহনের কৌশল পাল্টে বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এনবিআর প্রতি ১০ শলাকা নিম্নমানের সিগারেটের মূল্য ৩৯ টাকা, মধ্যম মানের ৬৩ টাকা, উচ্চমানের ৯৭ টাকা এবং প্রিমিয়াম সিগারেটের মূল্য ১২৮ টাকা বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো নকল ও ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল লাগিয়ে এর চেয়ে কম দামে বাজারে সিগারেট সরবরাহ করছে। সিলেট এলাকায় সবচেয়ে বেশি ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড, হেরিটেজ টোব্যাকো কোম্পানি ও ভারগো টোব্যাকোর রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড বিক্রি করছে সিটি গোল্ড প্রিমিয়াম, এক্সপ্রেস ও সেনর গোল্ড ব্র্যান্ডের সিগারেট। ভারগো টোব্যাকোর সিগারেটের নাম রমনা, পার্টনার, দেশ গোল্ড, দেশ ব্লাক ও দেশ গ্রিন। হেরিটেজ টোব্যাকোর সিগারেট সিটি গোল্ড ও সিটি গোল্ড প্রিমিয়াম। তিনটি কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিক্রি হচ্ছে ভারগো টোব্যাকোর চারটি ব্র্যান্ডের সিগারেট।

সিলেট ভ্যাট কমিশনারেট সূত্র জানায়, ২৯ জুন সিলেট ভ্যাট কমিশনারেট কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকার কুমারপাড়ার এজেআর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিস থেকে পার্টনার ব্র্যান্ডের ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার সিগারেট জব্দ করে। এসব সিগারেট ‘বিল্লাল ভাই’ নামের এক ব্যক্তি গাজীপুর থেকে সিলেটের ‘শিরিন স্টোর’ নামে একটি দোকানে পাঠিয়েছেন। ব্যান্ডরোল পরীক্ষা করে দেখা যায়, তা নকল। এতে ১৬ আগস্ট সাতজনকে আসামি করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা অনিক দে। নকল স্ট্যাম্পযুক্ত সিগারেট উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ায় জাতিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় এ মামলা করা হয়।

অপরদিকে ১৬ আগস্ট নকল সিগারেট জব্দের ঘটনায় কোতয়ালি থানায় আটজনের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়। এ মামলায় নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত ডারবী ও পূরবী ব্র্যান্ডের সিগারেট উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব সিগারেট নাইওরপুলে এসএ পরিবহনে তল্লাশি চালিয়ে জব্দ করা হয়। রাজশাহী থেকে সিলেটে এই সিগারেটের চালান পাঠানো হয়েছিল।

এনবিআরের সূত্রমতে, সিলেটের প্রায় অর্ধশতাধিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে নকল ও ব্যবহƒত ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট। এর মধ্যে লালাবাজারের মধু ফ্রুটস, মনু মিয়া স্টোর ও আবদুর রব স্টোর অন্যতম। আরও রয়েছে ইসলামপুর বাজারের হাকিম স্টোর, মতি স্টোর, শালিম স্টোর এবং শাগলী বাজারের শাহাবুদ্দিন স্টোর, মানিক মিয়া স্টোর ও বক্কর স্টোর। এ তিনটি বাজারে সবচেয়ে বেশি নকল ও ব্যবহƒত ব্র্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। এ তিনটি বাজারে তিনটি কোম্পানির রাজস্ব ফাঁকির সিগারেটে সয়লাব হয়ে গেছে। অভিযান ও তদারকির অভাবে বিভিন্নভাবে রাজস্ব ফাঁকির এসব সিগারেট প্রবেশ করছে।

সূত্র আরও জানায়, এসব বাজারে রাজস্ব ফাঁকির সিগারেট বিক্রি হয় প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ দামে। যেমন ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকোর সিটি গোল্ড প্রিমিয়ামের ২০ শলাকার সিগারেটের মূল্য (প্রিন্টেড প্রাইস) ৭৮ টাকা, কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। একই কোম্পানির এক্সপ্রেস ব্র্যান্ডের ২০ শলাকার মূল্য ৭৮ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আবার ভারগো টোব্যাকোর রমনা ব্র্যান্ডের ২০ শলাকা সিগারেটের মূল্য (প্রিন্টেড প্রাইস) ৭৪ টাকা, এটি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকায়। পার্টনার ব্র্যান্ডের ২০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৭৮ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। পার্টনার ও রমনার মতো ভারগোর দেশ গোল্ড, দেশ ব্লাক ও দেশ গ্রিন ব্র্যান্ডের সিগারেট বিক্রি হচ্ছে, যাতে একইভাবে দামের কারসাজি করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। সিলেটের সিগারেটের বাজার অনেকটাই ভারগো টোব্যাকোর দখলে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রমনা, পার্টনার, দেশ গোল্ড, দেশ ব্লাক ও দেশ গ্রিন ব্যান্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে নকল ও ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল।

সূত্রমতে, কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা দোকান থেকে গোপনে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল সংগ্রহ করেন, যার বিনিময়ে দোকানিকে দেওয়া হয় উপহার ও নগদ অর্থ। এ ব্যান্ডরোল কারখানায় পাঠানো হয়। কারখানায় সুকৌশলে সিগারেটের প্যাকেটে তা লাগিয়ে বাজারজাত করা হয়। আবার নকল ব্যান্ডরোলও ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি সিলেট ভ্যাট কমিশনারেট ভারগোর পার্টনার ব্র্যান্ডের বড় একটি সিগারেটের চালান আটক করেছে, যাতে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করা হয়েছে। ভ্যাট কর্মকর্তাদের ভয়ে সিলেটের শহরে খুব বেশি এসব সিগারেট বাজারজাত করা হয় না। তবে গ্রামের বাজারগুলোয় বাজারজাত করা হয় এসব সিগারেট।

অপরদিকে সিলেটের সিগারেটের দ্বিতীয় বাজার হেরিটেজ টোব্যাকোর। এ কোম্পানির আছে সিটি গোল্ড ও সিটি গোল্ড প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড। এ দুটি ব্র্যান্ডে একইভাবে নকল ও ব্যবহƒত ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে বাজারজাত করা হচ্ছে। এছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে জেইটি’র পিকক ও ক্লাসিক ব্র্যান্ডের সিগারেট আসছে। রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এসব সিগারেট সিলেটের বাজারে অহরহ পাওয়া যায়।

সূত্রমতে, সিলেটে চারটি কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। মূলত এসব কুরিয়ারের মাধ্যমে ঢাকা, গাজীপুর, রাজশাহী ও বগুড়া থেকে নামে-বেনামে পাঠানো হয় এসব সিগারেট। সিলেট ভ্যাট কমিশনারেট কুরিয়ার সার্ভিসে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। বড় দুটি চালান আটকও করেছে। এতে চোরাচালানকারীরা কুরিয়ার সার্ভিসের রুট পরিবর্তন করে এখন বিভিন্ন পণ্যের গাড়িতে সিগারেট পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট ভ্যাটের কমিশনার হোসাইন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযানের ফলে চোরাচালানকারীরা সতর্ক হয়ে গেছে। কুরিয়ারে এখন আর পাঠানো হয় না। হয়তো অন্য রুটে আসতে পারে, কারণ চোরাচালানকারীরা আমাদের চেয়ে বেশি স্টাডি করে। নকল সিগারেটের বিক্রি রোধে সপ্তাহে দুই দিন সব ভ্যাট বিভাগীয় কার্যালয় সব জেলার বাজারগুলোয় অভিযান পরিচালনা করে। আশা করি নকল সিগারেট বাজারজাত করা বন্ধ হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..