প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সিসা সংগ্রহের কারখানা: পাবনায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

 

শাহীন রহমান, পাবনা: পাবনার বেড়া উপজেলায় পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে ও পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের শতাধিক কারখানার বর্জ্য ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে দশ গ্রামের মানুষের জীবন। ঝুঁকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, প্রকৃতি ও পরিবেশ। নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, মারা যাচ্ছে গবাদিপশু, নষ্ট হচ্ছে ফসল। প্রভাবশালীদের গড়ে তোলা প্রাণঘাতী এসব কারখানা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

উপজেলার নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের রাকশা বাজার, মরিচাপাড়া, চরবক্তারপুর, আগবাগশোয়া, সোনা পদ্মাসহ আশপাশের প্রায় ১০টি গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যাটারি ভেঙে ও পুড়িয়ে সিসা তৈরির শতাধিক কারখানা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব কারখানায় দিনরাত চলে পুরোনো ব্যাটারি ভাঙার কাজ। কারখানায় কাজ করে শিশু থেকে সব বয়সী মানুষ। ব্যাটারির কার্বনে পুরো এলাকা ছেয়ে গেছে। আর্থিক সুবিধার লোভে অনেকে নিজ বসতবাড়িতেও ব্যাটারি ভাঙার কাজ করেছেন। ব্যাটারি ভাঙার পর ধাতব পদার্থ ও এসিড মিশ্রিত ছাই বের করে তা পোড়ানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হয় যমুনা নদীপাড়ে নির্মিত বেশ কটি চুল্লিতে। সবার নজর এড়াতে পোড়ানোর কাজ করা হয় রাতে।

স্থানীয়রা জানান, পাঁচ-ছয় বছর আগে উপজেলার বাগশোয়াপাড়া গ্রামের উত্তর পাশে যমুনাপাড়ে প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠে ব্যাটারি (যানবাহন ও ভারী কাজে ব্যবহƒত) পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহের কারখানা। লাভজনক হওয়ায় এখন এ কারখানার বিস্তৃতি ঘটেছে আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে। সিসা সংগ্রহের জন্য এসব কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে এর ভেতরের এসিড মিশ্রিত ছাই ও গাদ তীব্র তাপ সৃষ্টিকারী চুল্লিতে পোড়ানো হয়। আর এ পোড়ানোর কাজটি সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে সারা রাত ধরে চলে। এ সময় আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁঝালো দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া। এতে মরিচাপাড়া, চরবক্তারপুর ও আগবাগশোয়াসহ এর পার্শ্ববর্তী রাকশা, নেওলাইপাড়া, বাগশোয়াপাড়া, নতুন ভারেঙ্গা, সোনাপদ্মা প্রভৃতি গ্রামের লোকজনকে দুর্বিষহ অবস্থায় রাত পার করতে হয়। কিন্তু কারখানা মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকাবাসী প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। তারা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে ব্যাটারি ভাঙার কারখানা ও সিসা তৈরির চুল্লি বন্ধ করার ব্যাপারে আবেদন জানিয়েও কোনো ফল পাননি।

চরবক্তারপুর গ্রামের হোসেন আলী ও আব্দুল আওয়ালসহ অনেকে জানান, সিসা তৈরির কারখানার পার্শ্ববর্তী ধান ও গমের খেতে চারা গজালেও ধোঁয়ার কারণে কিছুদিনের মধ্যে সেগুলোর পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। ধানের শীষ পুড়ে যায় কিংবা চিটা বেশি হয়। কারখানার চুল্লিগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়ার কারণে আশপাশের জমির ফসল ও ঘাসের ওপর এক ধরনের সাদা আবরণ পড়ে যায়। কোনো গরু-ছাগল এসব জমির ঘাস খেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারখানা সংলগ্ন জমির ঘাস খেয়ে কয়েক বছরে অনেক গবাদিপশু মারা গেছে। কারখানা মালিকরা কয়েকজন গবাদিপশু মালিককে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।

সিসা তৈরির কারখানার অন্যতম উদ্যোক্তা ও মালিক আলম খাঁ ও সাদেকুল ইসলাম জানান, ব্যাটারিগুলো লোকালয়ে ভাঙা হলেও সিসা পোড়ানোর কাজ করা হয় দূরে। তারা দাবি করেন, সিসা পোড়ানোর চুল্লিগুলো থেকে ক্ষতিকর কিছু বের হয় না।

পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসিফুর রহমান জানান, প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের পুষ্টির জন্য সিসার কোনো ভূমিকা তো নেই-ই বরং একে গণ্য করা হয় ‘প্রোপোপাজমিক বিষ’ হিসেবে। সিসাযুক্ত পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের দহনে নির্গত সিসার কারণে দূষিত হয় পরিবেশ। এর বিষ মানুষ, পশুপাখি ও গাছপালার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পাবনার সভাপতি অধ্যক্ষ (অব.) আব্দুল করিম জানান, জনস্বাস্থ্য, গবাদিপশু, গাছগাছালি ও ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবে না। অবৈধ এবং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ডে যারা লিপ্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার সাহস না পায়, সেজন্যই শাস্তি দেওয়া দরকার।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামসুন নাহার সুমী জানান, এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ পাননি। তবে শিগগিরই তিনি ওই এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। সিসা কারখানা পরিবেশের ক্ষতি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।