দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

সুতার পরিবর্তে আমদানিকারক পেল কনটেইনারভর্তি বালি

চীনা রপ্তানিকারকের প্রতারণা

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: রপ্তানিতে বাড়ছে বিদেশিদের প্রতারণা। ফলে আমদানিতে তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। সাম্প্রতিক সময়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বাড়লেও কমছে না বিদেশি রপ্তানিকারকের প্রতারণা। ফলে অর্থ পাচারের মামলাসহ শুল্ক জটিলতায় বিপাকে পড়ছেন দেশীয় আমদানিকাররা।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার এক্সেসরিজ ব্যবসায়ী মো. ইকবাল হেসেন। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স সোয়ারা ফ্যাশন চীন থেকে সুতা আমদানির ঘোষণা দেয়। সে অনুযায়ী দুটি কনটেইনারে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের সুতা আসার কথা চট্টগ্রাম বন্দরে। কিন্তু রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চায়নার জিংতাই ইয়ামজি টেক্সটাইল কোম্পানি লিমিটেডের প্রতারণায় বিপাকে পড়েন ইকবাল হোসেন। কারণ, সুতা রপ্তানির কথা থাকলেও কনটেইনারভর্তি বালির বস্তা পাঠায় রপ্তানিকারক। সম্প্রতি আবুল খায়ের শিল্পগ্রুপেরও স্ক্যাপ ঘোষণায় একটি খালি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। যদিও পরবর্তী সময়ে রপ্তানিকারক দুঃখ প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস ভ্যাট কমিশনার মোহাম্মদ এনামুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রপ্তানিকারক প্রতারণা করলে আমদানিকারক বড় ধরনের বিপদে পড়ে যাবে। বিশেষ করে অর্থ পাচারের মামলা হবে। কিন্তু অনেক আমদানিকারক মিথ্যা ঘোষণার পণ্য এনে ধরা পড়ার ভয়ে রপ্তানিকারকের ঘাড়ে দায় চাপায়। তবে সরাসরি রপ্তানিকারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনে ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

এদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গত ২৪ জানুয়ারি চীন থেকে আসা সোয়ারা ফ্যাশনের একটি কনটেইনার খুলে পায় বালির বস্তা। তারপর ৩ ফেব্রুয়ারি অপর কনটেইনারটিও খুলে পাওয়া যায় বালির বস্তা। এ ঘটনায় কাস্টম হাউসে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কারণ, একই কায়দায় বিদেশে অর্থ পাচার হয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে এ বন্দর দিয়ে অর্থ পাচারের মাত্রাও বেড়েছে। তাই প্রাথমিকভাবে চালানটির মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়েছে সন্দেহ করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে আমদানিকারক সোয়ারা ফ্যাশনের কর্ণধার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতারণার শিকার হয়েছি। ২০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে এক্সেসরিজের ব্যবসা করছি। কখনও অর্থ পাচার করিনি। তবে এ রপ্তানিকারকের সঙ্গে এটি প্রথম লেনদেন ছিল। আর তাতেই প্রতারণা করে বসে বিদেশি কোম্পানিটি। আমাদের প্রথম কনটেইনারে বালির বস্তা পাওয়ার পর ব্যাংক যাতে টাকা ছাড় না করে, তার জন্য উচ্চ আদালতে মামলা করে টাকা ছাড়করণ বন্ধ করি। তারপর এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষও টাকা ছাড়করণ থেকে বিরত থাকে। একই সঙ্গে অপর কনটেইনার যেহেতু একই রপ্তানিকারক থেকে আমদানি করা, তাই এআইআর শাখা ও জেটি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে পণ্য সঠিক প্রাপ্তিসাপেক্ষে খালাসের অনুরোধ করে কাস্টমস কমিশনার বরাবর চিঠি দিই। এর আগে রপ্তানিকারকের লোকাল এজেন্ট টাকা ছাড়করণের তাগাদা দিলেও পণ্য না দেখে আমরা টাকা ছাড় করিনি। ফলে বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি। তবে রপ্তানিকারককে ছাড় দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে রপ্তানিকারকের লোকাল এজেন্ট মিলেনিয়াম করপোরেশনের রিয়াজ আলীর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চায়না রাষ্ট্রদূত বরাবর চিঠি দেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার নূর-এ-হাসনা সানজিদা অনসুয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গত ২২ জানুয়ারি কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে আমদানিকারক মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এ চালানে মাত্র ২৫ হাজার ৫০৫ ডলার ব্যয়ে ২৩ হাজার ৪০ কেজি সুতা (কটন ও পলিয়েস্টার ইয়ার্ন) আমদানির ঘোষণা দেয় আমদানিকারক। যার আমদানি মূল্য ২৫ হাজার ৫০৫ মার্কিন ডলার। কিন্তু আমদানিকারকের ঘোষণা অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যায়নি। পুরো কনটেইনার ভর্তি ছিল বালির বস্তায়। তারপর ৩ ফেব্রুয়ারি অপর কনটেইনারটি খুলেও বালির বস্তা পাওয়া যায়। যার আমদানি মূল্য ছিল ২৪ হাজার ১৯২ ডলার। এ কনটেইনারটিতেও সমপরিমাণ সুতা আমদানির ঘোষণা ছিল। তবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেও আমদানিকারকের দেখা পাওয়া যায়নি। তাই প্রাথমিক ধারণায় মানি লন্ডারিং মনে হচ্ছে। বর্তমানে বালিগুলো পরীক্ষার জন্য রাসায়নিক পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো হয়েছে।’

আর চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্য থাকায় চালানটি লক করা হয়েছিল। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় তা স্পষ্ট হলো। তবে ব্যাংক টাকা ছাড় না করা পর্যন্ত মানি লন্ডারিং হবে না।’

এদিকে কনটেইনার দুটি ছাড়করণের দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রামের ফকিরহাট এলাকায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট তানশিয়া ওভারসিজ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা আমদানিকারক হতে মূল ডকুমেন্ট পাওয়ার পর শুল্কায়ন কার্যক্রম গ্রহণের জন্য কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করি। রেনডম সিলেকশনে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত না হওয়ায় সরাসরি শুল্কায়নও হয়ে যায়। কিন্তু একই দিন অন্য আরেকটি চালান খালাস পর্যায়ে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য পাওয়া যায়। তাই বাকি কনটেইনারটিও যেহেতু এই রপ্তানিকারক থেকে আমদানি করা, তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনার বরাবর চিঠি প্রদান করি।’ এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘কিছু চালানে রপ্তানিকারকের প্রতারণা হতে পারে। মিথ্যা ঘোষণার চালানে আমদানিকার ও সিঅ্যান্ডএফ জবাবদিহির আওতায় এলেও শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ আমদানিকারকের দেওয়া ডকুমেন্ট দেখে কাজ করে, কনটেইনারে কি পণ্য আছেÑতা সিঅ্যান্ডএফের জানার কথা নয়।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..