দিনের খবর সাক্ষাৎকার

‘সুদনির্ভর আয় থেকে বেরিয়ে আসবে ব্যাংক খাত’

একসময়কার রাষ্ট্রায়ত্ত পূবালী ব্যাংক এখন বেসরকারি খাতের ব্যক্তিমালিকানায়। লোকসানি হওয়ায় প্রবলেম ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি ছিল ব্যাংকটি। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারায় বর্তমানে ব্যাংক খাতে আর্থিক সব সূচকে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। পরিচিতি পেয়েছে কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে। কভিডকালে ব্যাংক পরিচালনা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেয়ার বিজের নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ আবু তালেব

শেয়ার বিজ: কেমন আছেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: ভালো আছি, বেঁচে আছি, সুস্থ আছি এখনওÑএটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। পূবালী ব্যাংকের কর্মীরাও ভালো আছেন। কয়েকজন সহকর্মী হারিয়েছি কভিডে আক্রান্ত হওয়ায়। তারা বিদায় নিলেও তাদের পরিবারের পাশে পূবালী ব্যাংক ও কর্মীরা রয়েছেন।

শেয়ার বিজ: কভিড মহামারিতে ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা কেমন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: ২০২০ সালের শুরু থেকেই কভিড মহামারি আলোচনায় ছিল। তখন থেকেই সংবাদমাধ্যমের সুবাদে কর্মীরা রোগটির প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছিল। বাংলাদেশে মার্চ মাসে রোগটি শনাক্ত হওয়ার পর সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই সময়েও ব্যাংক কিন্তু খোলা রাখা হয়েছিল। ব্যাংকিং এখন জরুরি সেবায় পরিণত হয়েছে। আমরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে শাখাগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ ও চালু রেখেছি।

শেয়ার বিজ: এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল আপনার সামনে?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: দুটি চ্যালেঞ্জ ছিল সামনে। একটি হচ্ছে ব্যাংক খোলা রাখা ও অন্যটি হচ্ছে কর্মীদের নিরাপত্তা। পূবালী ব্যাংক অনেক আগে থেকেই অনলাইন ব্যাংকিংয়ে দক্ষতা দেখিয়েছে। আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে তৈরি কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানের। আমরা সিবিএস পরিচালনায় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম, যেটি কভিডকালে সবচেয়ে বেশি ফল দেয়। আমরা কর্মীদের বাসায় থেকে অফিস করার ব্যবস্থা করলাম। শুধু শাখা পরিচালনার জন্য সর্বনি¤œ জনবল বাছাই করলাম। তাদেরও শিফটভিত্তিক দায়িত্ব দেয়া হলো। এ সময়ে কর্মীদের আসা-যাওয়ার জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা করেছি। এখনও কিছু জনবল বাসায় থেকে কাজ করছে। এজন্য ব্যাংকিংয়ে আমাদের সেভাবে বেগ পেতে হয়নি। কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যাংক সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এর পরও কয়েকজন সহকর্মীকে আমরা হারিয়েছি। তারা ব্যাংক থেকে চলে গেলেও তাদের পরিবারের পাশে এখনও ব্যাংক রয়েছে। বাকি সময়েও থাকবে।

শেয়ার বিজ: করোনাকালে অনেক ব্যাংকই কর্মী ছাঁটাই করেছে আপনারা এটি কীভাবে দেখেছেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: পূবালী ব্যাংক ফায়ার অ্যান্ড হায়ার (ছাঁটাই ও নতুন লোক নিয়োগ দেয়া) নীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা বিশ্বাস করি, একজন কর্মী পূবালী ব্যাংকেই কর্মজীবন শেষ করবেন, অন্য ব্যাংকে যাবেন না। আমরা যাওয়ার কোনো পথ রাখিনি। খুবই উচ্চাভিলাষী না হলে কেউ ব্যাংক ছেড়ে যান না। এটি আমাদের করপোরেট সংস্কৃতিতে পরিণত করতে পেরেছি। এজন্য কভিডকালে আমরা কোনো কর্মী ছাঁটাই করিনি। আমাদের পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত। ফলে পূবালী ব্যাংকের কোনো কর্মী চাকরি হারানোর আতঙ্কে ভোগেননি। কর্মীরাও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রতি আস্থা রাখছেন। উল্টো কভিডকালেও পূবালী ব্যাংক কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

শেয়ার বিজ: কর্মী নিয়োগ ধরে রাখতে পূবালী ব্যাংক কোন ধরনের নীতি মেনে চলে?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: আমরা ওপরের ও মধ্যম পর্যায়ে কোনো ব্যাংকার নিয়োগ দিই না। প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান, সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি দিয়ে একজন কর্মীকে ব্যাংকেই রেখে দেয়ার জন্য নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। তা-ই অনুসরণ করা হয়। এজন্য নিয়োগের শুরুতেই সারা দেশ থেকে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের নিয়োগ দেয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে শেষ করা হয়। এখানে কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না। উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশ এলেও তা বাতিল করা হয়। যদিও বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতে সময় ও বেগ পেতে হয়েছে। এখন সবাই বিশ্বাস করে, পূবালী ব্যাংকে সুপারিশ দিয়ে চাকরি হয় না। এজন্য এখন আর সুপারিশ সেভাবে আসে না।

পূবালী ব্যাংক বিশ্বাস করে আমাদের কর্মী অন্য ব্যাংকে কেন যাবে। যিনি চলে যাবেন, তার জায়গায় তো নতুন জনবল নিয়োগ দিতে হবে। এজন্য চলে যাওয়ার প্রবণতাকেই আমরা নিরুৎসাহিত করি। আমরা কর্মপরিবেশ দিই, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করি। অস্বাভাবিক লক্ষ্যমাত্রা বা কাজ দেয়া হয় না। এজন্য ব্যর্থ কর্মীর সংখ্যাও খুব একটা নেই। নৈতিক ও বড় ধরনের অপরাধ না হলে আমরা কর্মী ছাঁটাই করি না। প্রয়োজনে কর্মীর দায়িত্ব বদলিয়েও তাকে ব্যাংকে থাকার সুযোগ দেয়া হয়। এজন্য পূবালী ব্যাংকে একদল চৌকস, আন্তরিক ও নিবেদিতপ্রাণ জনবল তৈরি হয়েছে, যাদের ব্যাংকের প্রতি টান রয়েছে। পূবালী ব্যাংক মনে করে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের ডেডিকেশন থাকা লাগবে, নইলে প্রতিষ্ঠান সফল হতে পারবে না। আমি নিজেও এই ব্যাংকে অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছি। এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এজন্য যেকোনো কর্মীই স্বপ্ন দেখতে পারেনÑতিনিও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হতে পারবেন। সে জায়গাটা নিশ্চিত করতে পেরেছে ব্যাংক। এটি করতে পারায় পূবালী ব্যাংক প্রবলেম ব্যাংক থেকে এখন শাখা, আমানত, ঋণ, রেমিট্যান্স, জনবল ও মুনাফার দিক দিয়ে প্রথম সারির ব্যাংক। এমনকি অবসরে গেলেও ব্যাংকের প্রতি তাদের মমত্ববোধ দেখা যায়। পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে বার্ষিক বনভোজন, কৃতী সন্তানদের পুরস্কৃত করা, বৃত্তি প্রদান এবং চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যাংক শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক নয়, মানবিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠছে।

শেয়ার বিজ: মুনাফার প্রসঙ্গেই আসি ব্যাংকের মুনাফা বা সফলভাবে পরিচালনার গোপন সূত্রটি কী?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: সত্যি কথা বলতে কিÑব্যাংক পরিচালনায় আসলেই কোনো গোপন সূত্র নেই। সবই প্রকাশিত। কোন ব্যাংক কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাদের লক্ষ্যমাত্রা, বিভিন্ন ঋণপণ্যের নাম, বিনিয়োগ ও আমানতের সুবিধা, ব্যাংকিং সেবার ধরন, মান ও ফি সবই প্রকাশিত। একটি ব্যাংকের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা যায়, আসলে ব্যাংকটি কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুনাফা করছে। মুনাফা নির্ভর করেÑকতটা সৎ ও দক্ষভাবে ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে, তার কর্মিবাহিনী কতটা আন্তরিকভাবে কাজ করছে, ব্যাংক পরিচালনায় পরিচালনা পর্ষদের নীতিটা কেমন। মোটকথা, করপোরেট কালচার তথা সুশাসন কতটা নিশ্চিত হয়েছে, বিধিনিষেধ কতটা পালিত হচ্ছে। যে ব্যাংক যতটুকু সুশাসনের পথে এগিয়েছে, সে ব্যাংক ততটা সফলতা দেখতে পেয়েছে। এর ওপরই নির্ভর করে ব্যাংকের সফলতা ও ব্যর্থতা। সুশাসন ও দক্ষ জনবলের কারণেই দেশের প্রায় সব বড় গ্রুপ পূবালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকিং করছে। তারা প্রয়োজনমতো অর্থ নিচ্ছে, আবার ফেরতও দিচ্ছে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে তাহলে এত দুর্নীতি কেলেঙ্কারির ঘটনা কেন ঘটছে? এতে আইনগত ত্রুটি আছে, নাকি প্রয়োগে?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: বর্তমানে ব্যাংক পরিচালনায় ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা ও বিধিনিষেধই যথেষ্ট। এর সঠিক প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন সৎ ও দক্ষ ব্যাংককর্মী। যদি পরিচালনা পর্ষদ অযাচিত হস্তক্ষেপ না করে, তাহলেই ব্যাংক সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে। ঋণ বিতরণে দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হলে ব্যাংক ও আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পূবালী ব্যাংক এদিক দিয়ে ভাগ্যবান। পরিচালনা পর্ষদের কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ নেই। প্রতিটি ঋণ বিতরণের আগেই সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। যাচাই-বাছাই করে দেখা হয়। এজন্য পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার তিন শতাংশের ঘরে, যা আন্তর্জাতিক মানের (পাঁচ শতাংশ) অনেক নিচে।

শেয়ার বিজ: করোনাকালে ব্যাংক খাতে কেমন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: কোনো দুর্যোগই ভালো নয়। এতে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি। করোনা দুর্যোগও তেমন। এতে ব্যাংকিং বিহ্যাভিয়র তথা ব্যাংকিং সেবায় বেশ পরিবর্তন এনেছে। গ্রাহক ও ব্যাংক পর্যায়ে দুই দিকেই পরিবর্তন আসছে। ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে সব ব্যাংকই ডিজিটাইজেশন তথা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। সশরীরে ব্যাংকে হাজির না হয়েই সেবা নেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে গ্রাহকের। ব্যাংককর্মীরাও গ্রাহককে সেবা দিতে আরও আন্তরিক হয়েছে। এজন্য অনলাইন ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এটিএম কার্ড ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে। আইটিতে সব ব্যাংকই অনেক দূর এগিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এটি হতে অনেক সময় লাগত।

শেয়ার বিজ: ব্যাংকে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে এর প্রভাব পড়বে কেমন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: সময় সাশ্রয় হবে সবার। ব্যাংক হিসাব খোলা, পরিচালনা ও সংরক্ষণ আরও সহজ হচ্ছে। এখন ব্যাংক না এসেই যেকোনো স্থান থেকেই যেকোনো সময় ব্যাংকের স্থিতি দেখতে পারছেন আমানতকারীরা। অর্থ পাঠানো যাচ্ছে ঘরে বসেই। গ্রাহকের লেনদেন চিত্র সংরক্ষণে থাকছে, সহজেই দেখা যাচ্ছে। রেকর্ড দেখে পর্যালোচনা করা সুবিধা হচ্ছে গ্রাহকদের। এতে কাজের গতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফাইল জমে থাকছে না। অতীতে শুধু ব্যাংকের ফাইল সংরক্ষণেই গোডাউন ভাড়া করতে হতো। এখন থেকে সেটি আর লাগছে না। আবার এখন অনলাইনেই সারা দেশের শাখা ব্যবস্থাপকদের নিয়ে একসঙ্গে কনফারেন্স করা যাচ্ছে। এটি আগে কল্পনাও করা যেত না। একসঙ্গে কনফারেন্স করতে হল ভাড়া, আপ্যায়ন, প্রস্তুতি, যাতায়াত প্রভৃতি মিলিয়ে অনেক খরচ হতো। এগুলো বেঁচে যাচ্ছে। খুব দ্রুত যেকোনো তথ্য পৌঁছে দেয়া যাচ্ছে অনায়াসেই।

শেয়ার বিজ: প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কর্মসংস্থান কমে আসবে কি না?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: আমি তা মনে করি না। বছর শেষেই মানুষের ব্যাংক হিসাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে আমানত, ঋণের পরিমাণ, রেমিট্যান্স ও বিভিন্ন সেবার আকার। পূবালী ব্যাংকেরই গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে আমানত দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক সেবা এখন থেকে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেয়া শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে কাজ বেড়ে যাচ্ছে। এসব সেবা সুষ্ঠুভাবে দিতে ও প্রযুক্তি পরিচালনায় নতুন জনবল নিয়োগ দিতে হচ্ছে। প্রযুক্তি বা যন্ত্র চালনায় তো মানুষ লাগবে। বর্তমানে ব্যাংকে প্রযুক্তিগত দক্ষ বা জ্ঞান থাকা কর্মীদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সব ব্যাংক। এটি সাধারণ ব্যাংকিং ও মূল ব্যাংকিং পরিচালনায় নিয়োগের বেলায়ও। কারণ এখন ব্যাংক চলছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। বর্তমানে দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতায় রয়েছে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে এর আওতা বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে ব্যাংকগুলো শাখা খোলা অব্যাহত রেখেছে। শাখা চালু হওয়া মানেই নতুন জনবল লাগবে। সেখানে সব ধরনের সেবা দিতে সব পর্যায়ের জনবল প্রয়োজন হবে। শুধু এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পরিসংখ্যান তুলে ধরলেই একটু ধারণা পাওয়া যাবে। সারা দেশে প্রায় সব ব্যাংকই এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনা করছে। এখন দেশের প্রায় সব জায়গায়ই ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাচ্ছে। একটি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে তিন থেকে চারজনের পর্যন্ত কর্মসংস্থান হচ্ছে। সামনে আরও নতুন পণ্য ও সেবা ব্যাংক খাতে যুক্ত হবে। এসব পরিচালনায় ব্যাংক খাতে আরও জনবলের প্রয়োজন হবে। কিছু সেবা তো আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। এভাবে ব্যাংক খাতে সার্বিকভাবে কর্মসংস্থান কমে আসবে না, বরং বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার বিজ: স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কি সাইবার নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: সাইবার হামলা বা হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থাকবেই। দেখতে হবে কতটা সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এজন্য সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। পূবালী ব্যাংক এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ও সতর্ক। ব্যাংককর্মীদেরও এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এর দায়িত্ব ব্যাংকেরই।

শেয়ার বিজ: ঋণ সুদহার সর্বোচ্চ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার এতে ব্যাংকের মুনাফার ওপর কেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এখনও সুদভিত্তিক মুনাফা করে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস হবে বিভিন্ন ধরনের সেবার বিপরীতে নেয়া চার্জ বা ফি। উন্নত দেশের ব্যাংকগুলো সেবার বিপরীতে ফি নেয়। এটিই তাদের মুনাফার প্রধান উৎস। এজন্য তাদের দেশে সুদহারও কম। গণহারে সবাই ঋণ পায় না। ভালো উদ্যোক্তারাই কেবল ঋণ পায়। বাংলাদেশেও একসময় এটি হবে। এখন শুরু হয়েছে মাত্র। ব্যাংক আগে শুধু সুদ-আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কমিশন, ব্যাংক গ্যারান্টি, ডেবিট ও এটিএম কার্ড সেবা এবং অর্থ স্থানান্তর করছে। এর বিপরীতে সেবা ফি নিচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ইউটিলিটি চার্জও পরিশোধ করছে। এমনকি পরীক্ষার ফি, কেনাকাটা ও স্কুলের টিউশন ফি পর্যন্ত পরিশোধ করা যাচ্ছে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে। এতে মানুষের সময় বেঁচে যাচ্ছে। টিউশন ফি পরিশোধে স্কুলে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। মুঠোফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেই সব লেনদেন পরিচালনা করতে পারছে। এসব সেবার বিপরীতে ব্যাংক ফি নিচ্ছে। এটিই একসময় ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়াবে। তখন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ দেয়ার প্রবণতাও কমে যাবে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি কি নেয়া উচিত?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: বর্তমানে যেটি আছে, তাতেও বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছা করলে পরিবর্তন আনতে পারে। সর্বনি¤œ স্থিতির বেলায় এটি ফ্রি করা যেতে পারে। কারণ ব্যাংক যে পরিমাণ মুনাফা বা সুদ বছর শেষে দেয়, তার চেয়ে যেন বেশি অর্থ কেটে না রাখে। এটি করা যেতে পারে। কারণ হিসাব থাকার ফলেই তো এ হিসাবের মধ্যমে নেয়া সেবার ওপর ফি নিয়ে থাকে ব্যাংক।

শেয়ার বিজ: প্রণোদনার ঋণের একটি অংশের তো আদায় হওয়ার সময় চলে আসছে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: প্রণোদনার ঋণ দিয়ে সরকার দেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে বাঁচিয়ে দিল। এটি না হলে ধসে যেত পোশাক খাত। আমরা বরাবরই ভালো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছি। তাদের ব্যপারে খোঁজ-খবর রাখছি। অধিকাংশেরই পণ্য রপ্তানি হয়েছে। কিছু রপ্তানি হওয়া পণ্যের বিপরীতে আয় আসছে। অনেকেই কিছুটা পরিশোধও শুরু করেছেন। আমরা আশা করছি, কোনো সমস্যা হবে না আমাদের ব্যাংকের। আমরা নিয়মিত গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি। পূবালী ব্যাংকের এ বিষয়ে খুব একটা সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে না বলেই বিশ্বাস করি।

শেয়ার বিজ: প্রণোদনার অর্থ পেতে অনেক খেলাপি হওয়া গ্রাহকই ঋণ নিয়মিত করেছে তাদের বিষয়ে কিছু বলবেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: শুধু নিয়মিত অর্থাৎ ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ ঘোষণা করে সরকার। প্রণোদনার অর্থ বিতরণ শুরু হলেও অনেক খেলাপি প্রতিষ্ঠানও বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা নিজেদের ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। প্রণোদনার ঋণও নিয়েছে। তাদের নিয়ে একটু উদ্বেগ থেকেই যায়, আসলেই তারা উৎপাদনে ফিরতে পারবেন কি না। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কোনো কারণে উৎপাদনে যেতে পারেনি, এখন সীমিত আকারে হলেও উৎপাদন শুরু করেছে; তাদের ঋণ ফেরত আসবে। এক্ষেত্রে গ্রাহক নির্ধারণই বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার বিজ: নতুন ঋণের চাহিদা কি হচ্ছে?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: নতুন ঋণের চাহিদা সব সময়ই থাকে। কিন্তু কভিড-পূর্ববর্তী সময়ের মতো এখনও হয়নি। আরেকটু সময় লাগবে। আগে যারা বিনিয়োগে গিয়েছিলেন, পরিকল্পনা করেছিলেন, কাঁচামাল এনেছিলেন, তারাই মূলত ঋণ নিচ্ছেন। আবার কিছু ঋণ মঞ্জুর হওয়া ছিল, কিন্তু ছাড় করা হয়নি, তারাই এখন ক্ষুদ্র পরিসরে বিনিয়োগে যাচ্ছেন।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদনে ফিরবে স্বাভাবিক গতিতে। আবার শুধু আমাদের দেশের কভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই চলবে না, আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত দেশগুলোর কভিড পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। এজন্য আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের ভোক্তাদের জন্য উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে, যা কভিডকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে কোম্পানি পণ্য উৎপাদন করবে না আগের মতো। সেক্ষেত্রে পরিমাণ কম হওয়ায় আগের চেয়ে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে মানুষ পণ্য কিনবে। কোম্পানি উৎপাদনে যাবে। কর্মসংস্থান চাঙা হবে। নতুন বিনিয়োগে যাবে উদ্যোক্তারা। পুরোনো কারখানায় সংস্কার করতে নতুন যন্ত্রপাতি আসবে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আনা ও উৎপাদন চালিয়ে নিতে চলতি মূলধন ও ঋণের চাহিদা তৈরি হবে। এটি একটি চক্রের মতো। একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত। অর্থনীতিতে এটি একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিচ্ছে।

শেয়ার বিজ: ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার কমিয়ে আনতে অনেক উদ্যোগই ব্যর্থ হতে চলেছে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আব্দুল হালিম চৌধুরী: খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন ঋণ যাচাই-বাছাইয়ে দক্ষ ও পেশাদারি নিশ্চিত করা, বিদ্যমান বিধিবিধান মেনে চলা, করপোরেট সুশাসন ও ব্যাংকারদের অস্বাভাবিক লক্ষ্যমাত্রা না দেয়া। এসব বিষয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেই সচেতন হতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের নীতির ওপরই নির্ভর করে কীভাবে ব্যাংক চলবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আদালতের কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা। বর্তমানে অনেক মামলা জমে যাচ্ছে। একটি ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংক আদালতে যায়। কিন্তু বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়াটা অনেক সময়সাপেক্ষ। আবার খেলাপি হওয়ার পরও অনেকে রিট করে আদেশ স্থগিত রাখে। এতে শেষ পর্যন্ত রায় ব্যাংকের পক্ষেই যায় প্রায় সব ক্ষেত্রে। এর মধ্য দিয়ে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ

আব্দুল হালিম চৌধুরী: পূবালী ব্যাংক ও আমার পক্ষ থেকেও শেয়ার বিজ পরিবারকে ধন্যবাদ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..