প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সুদহার পুনর্নির্ধারণে থাকুক সুবিবেচনা

সঞ্চয়পত্রের সুদহার পুনর্নির্ধারণে কয়েক দিনের মধ্যে বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ থেকে বোঝা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে এর সুদহার কমানোর ব্যাপারে উচ্চপর্যায় থেকে যে আভাস দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে সরকার। বস্তুত সঞ্চয়পত্রের বর্তমান সুদহার ব্যাংক খাতের প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে এটি কেনার প্রতি এতদিন মানুষের ঝোঁকও ছিল বেশি। আমরা দেখেছি, কয়েক বছর ধরে এতে বিনিয়োগে অত্যধিক আগ্রহের কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। কোনো কোনো অর্থবছরে এটি বিক্রি বাবদ আয় ছাড়িয়ে গেছে লক্ষ্যমাত্রাকে। এতে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয়ও বেড়ে উঠেছিল সরকারের। অপেক্ষাকৃত বেশি সুদহারের কারণে দেশের আর্থিক খাতে ভারসাম্যহীনতাও সৃষ্টি হয়েছিল কিছুটা। এজন্য সঞ্চয়পত্রের সুদহার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনার ব্যাপারে সুপারিশ ছিল অর্থনীতিবিদদেরও। আমাদের ধারণা, এটা বাস্তবায়ন করা গেলে সুদ পরিশোধ বাবদ সরকারের ব্যয় কমে আসার পাশাপাশি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যাংক, পুঁজিবাজারসহ গোটা আর্থিক খাতে।

উল্লেখ্য, দেশের পেনশনভোগীসহ প্রবীণ নাগরিকদের বড় একটি অংশ তাদের জীবন নির্বাহে সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর নির্ভরশীল। সুদহার কমানো হলে এর অভিঘাত তাদের ওপর পড়বে, সন্দেহ নেই। এমনিতে আমাদের দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী অতটা সংহত নয়। প্রশ্ন ওঠে, এ কারণে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে? এজন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, জানি না। আমরা মনে করি, এ শ্রেণির মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বিঘিœত করা কোনোভাবেই উচিত হবে না। সুদহার পুনর্নির্ধারণে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে গুরুত্বসহকারে। এমন জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা সুসংহত করার লক্ষ্যে বিশেষ স্কিমের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। নির্দিষ্ট শ্রেণির লোক ছাড়া অন্যরা যাতে এ ধরনের সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা মানুষকে সঞ্চয়পত্রের বিশেষ সুবিধা দিতে যে তথ্যভাণ্ডার থাকা দরকারÑজাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের তা আছে বলে মনে হয় না। সুনির্দিষ্ট লোককে সুবিধাটি দেওয়ার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রতীয়মান, এটি গঠনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। সেটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য যে জনবল ও অবকাঠামোগত সহায়তা দরকার, সংশ্লিষ্ট দফতরকে তাও জোগানো হবে বলেই আশা। এটা করা না গেলে সঞ্চয়পত্র থেকে যাদের বাড়তি সুবিধা পাওয়ার কথা, তাদের পক্ষে সেটা পাওয়া কঠিন হবে।

অর্থের উৎস যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকায় সঞ্চয়পত্রে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। এতে বিনিয়োগে কর রেয়াতের ব্যবস্থা থাকায় কিছু মানুষ যে এ সুবিধা নিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। তাতে টাকা সাদা করার পাশাপাশি বাড়তি সুদও পাচ্ছে তারা। এ সুযোগ যে বন্ধ হওয়া উচিত, তাতে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। সঞ্চয়পত্র কেনার নিয়মকানুন সংস্কারে নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ও বিবেচনায় রাখবেন বলে আশা। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, সঞ্চয়পত্রে সুদহার হ্রাসের মাধ্যমে আর্থিক খাতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হলে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই আকৃষ্ট হবেন পুঁজিবাজারে। বেশ কিছুুদিন নিম্নমুখী থাকার পর আবার চাঙা হতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে, সঞ্চয়পত্র ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিষয়টি একরকম নয়। এজন্য শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে তারা যেন গুজবে কান না দিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেবো আমরা।