মত-বিশ্লেষণ

সুনীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

মুতাসিম বিল্লাহ মাসুম: সমুদ্র পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। সামুদ্রিক বিভিন্ন উপাদানের কল্যাণে বিশ্ব দিন দিন উন্নতি লাভ করছে। এসব উপাদানের মধ্যে প্রথমেই আছে মৎস্যসম্পদ। দৈনন্দিন জীবনে প্রাণিজ আমিষের চাহিদার শতকরা ৬০ ভাগ জোগান দিচ্ছে মৎস্য খাত। আর এ খাতের অধিকাংশ মাছ আসে সমুদ্র থেকে। এছাড়া সমুদ্রের উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষ ও পণ্য পরিবহন খাত। এ খাতের মাধ্যমে সম্ভব হয় সুদূর বাণিজ্যিক সম্পর্কের। দূরদূরান্তের দেশগুলোয় একইসঙ্গে অধিক পরিমাণ পণ্য বহন করতে সাহায্য করে সমুদ্রগুলো। এছাডা সমুদ্রে রয়েছে নানা ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম বালি, লবণ, সামুদ্রিক মাছ, শামুক, ঝিনুক, কবাল্ট, কপার, ইলমেনাইট, মোনাজাইট, কায়ানাইট, জিরকন ইত্যাদি। সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে এসব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে এককথায় ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি বলা হয়।

স্বাভাবিকভাবে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি বলতে যা বোঝায় তা হলো ‘সমুদ্রের রং নীল’; আর তাই সমুদ্রকেন্দ্রিক যে অর্থনীতি, তাকে সুনীল অর্থনীতি বলে। তবে বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ব্লু-ইকোনমির সংজ্ঞা বলা হয়েছে, সমুদ্রে যে পানি আছে এবং এর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, সেই সব ধরনের সম্পদকে যদি আমরা টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাবহার করি, তবে তাকে ব্লু-ইকোনমি বলে। ১৯৯৪ সালে অধ্যাপক গুন্টার পাউলি জাতিসংঘ কর্তৃক আমন্ত্রিত হন। তিনি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ব্লু-ইকোনমি নামক মডেলের প্রবর্তন করেন। তিনি প্রথম ধারণা দেন পরিবেশবান্ধব উপায়ে সমুদ্রসীমা ব্যবহারের। পাওলি উদ্ভাবিত এ মডেল আজ বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

বর্তমানে স্থল ও বনজ সম্পদের পাশাপাশি অনেক দেশ সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারে তৎপর হয়েছে। কারণ সমুদ্র তলদেশে আছে অনেক লুক্কায়িত খনিজ সম্পদ। তাছাড়া অনেক দেশ নিজ সমুদ্রসীমা ব্যবহার করে মৎস্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো। তবে বাংলাদেশে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে দেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি। বর্তমানে দেশে প্রায় এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা রয়েছে। বিশাল আয়তনের সমুদ্রসীমা ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে অর্থনীতির ভাগ্য বদল করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না এ সুনীল জলরাশির।

২০১৪ সালে আমরা মিয়ানমারের কাছ থেকে সমুদ্রসীমা জয় করেছি। এতে আমাদের সমুদ্রসীমা বেড়ে গিয়ে পুরো বাংলাদেশের সমান আরেকটি অংশ গঠিত হয়েছে। দীর্ঘ সাত বছর অতিক্রান্ত হলেও অর্থনীতিতে সমুদ্রসীমার অবদান খুব বেশি বর্ধিত হয়নি। এক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা প্রযুক্তিগত উন্নতির অভাব। বিশাল জলরাশি ব্যবহারের জন্য এখনও যথেষ্ট প্রযুক্তি নেই আমাদের। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় অন্য কোনো দেশের ওপর। ফলে প্রযুক্তির অপ্রতুলতার কারণে নিজেদের খনিজ সম্পদ থেকে ভাগ দিতে হয় অন্য দেশকে। অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এর অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়নি, যাদের মাধ্যমে সামুদ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। তাই বিরাট জলরাশি থাকা সত্ত্বেও দেশের উন্নয়নে সমুদ্রসীমার ভূমিকা এখনও সামান্য। আশার দিক হলো বর্তমান সরকার সুনীল অর্থনীতি-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, ২০২২ সালের মধ্যে মৎস্যসম্পদে যে চারটি দেশ বিপুল পরিমাণ সাফল্য অর্জন করবে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ দেখতে পাওয়া যায়। এসব প্রজাতির মাছ নিজ দেশে ব্যবহƒত হওয়া ছাড়াও রপ্তানি হচ্ছে বাইরের অনেক দেশে। কিন্তু দেশের সমুদ্রসীমা যত বৃহৎ এবং মাছের সংখ্যা যত বেশি, সে তুলনায় রপ্তানি আয় অনেক কম। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা সরকারি পদক্ষেপের অভাব। উল্লেখ্য, যথাযথ মৎস্য আহরণের পদ্ধতি গ্রহণ করলে সমুদ্র থেকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ৬০০ কিলোমিটার মাছ ধরার উপযুক্ত সমুদ্রসীমায় মাত্র ৩৭০ কিলোমিটারে মাছ ধরা হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ সমুদ্রসীমা মাছের উপযোগী থাকলেও প্রযুক্তিগত উপাদন এবং দক্ষ জনবলের অভাবে সম্পূর্ণ সমুদ্রসীমা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে সরকারের কার্যকর ভূমিকা থাকা দরকার।

এছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চিত্র পরিবর্তনের জন্য পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথ ব্যবহার করা দরকার। সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যবস্থা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও একই সঙ্গে অধিক পরিমাণে পণ্য বহনের পাশাপাশি ব্যয় অনেকাংশে কমানো যায়। তাই পণ্য আমদানি ও রপ্তানির জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহার করা দরকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমুদ্রসৈকতগুলোকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি নতুন সমুদ্রসৈকত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ পর্যটন খাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমুদ্রসৈকত অনন্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে সমুদ্রসৈকতের মধ্যে অন্যতম প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ছাড়াও আছে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। এসব সৈকতে সারা বছর থাকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণ। তবে দেশীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি সৈকতগুলোয় রাখতে হবে বৈদেশিক কিছু বৈশিষ্ট্য। যার ফলে একদিকে যেমন দেশীয় পর্যটকদের কৌতূহল সৃষ্টি হবে, তেমনি বিদেশি পর্যটকরা আকৃষ্ট হবে। সুনীল অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের ভাগ্য বদলের জন্য বিদেশি বণিকদের আকৃষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে জাহাজ ভাঙা ও জাহাজ তৈরির মতো কাজ সমুদ্রকেন্দ্রিকভাবে বৃদ্ধি করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আশা করা যায়।

সুনীল অর্থনীতির যথাযথ উন্নয়ন লাভ করতে হলে দেশের কয়েকটি সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হবে। প্রথমত, প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধন। গভীর সমুদ্র থেকে তেল, গ্যাস কিংবা অন্য কোনো খনিজ পদার্থ আহরণের জন্য দেশে প্রযুক্তিগত উপাদান অপ্রতুল। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে ভারতের হাতে থাকা ১০টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে আটটি এবং মিয়ানমারের ১৮টির মধ্যে ১৩টির মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ। এসব ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরের তলদেশে আছে বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ পদার্থ। কিন্তু গভীর সমুদ্র থেকে এসব খনিজ পদার্থ উত্তোলনের জন্য দেশকে আরও বেশি প্রযুক্তিগত উন্নতি লাভ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রসীমা ব্যবহারের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল দরকার। খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য অভিজ্ঞ জনবল না হলে একদিকে যেমন সম্পদের সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হবে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকবে। তাই দেশের উন্নতির জন্য সরকারি উদ্যোগে অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তুলতে হবে, যাদের মাধ্যমে সমুদ্রসম্পদ আহরণ করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, সমুদ্রসীমার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করতে হবে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য দীর্ঘ প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কিন্তু এখনও স্বপ্নের গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়িত হয়নি। তবে সুনীল অর্থনীতির সুফল ভোগ করতে চাইলে দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়ন করা জরুরি। এরই মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সুনীল অর্থনীতির কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে সিঙ্গাপুর। ছোট এ দেশটি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ব্যবহার করে বর্তমানে উন্নয়নের মডেলে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দেশে দ্রুত গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করতে হবে। সুনীল অর্থনীতির সফলতা লাভ করতে বর্তমান সরকারের আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ বা ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-তে সমুদ্র-সম্পর্কিত অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তবে এ প্রকল্পের কাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে দেশের ভাগ্যবদলে গভীর সমুদ্রবন্দর অনেকটা সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে চুক্তি হলেও কাজ চলছে খুবই ধীরগতিতে। কিন্তু সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন লাভ করতে গভীর সমুদ্রবন্দর আবশ্যক। তাই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সুনীল অর্থনীতি-সংক্রান্ত অধ্যয়ন ও প্রচার বৃদ্ধি করা দরকার। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুবিধা তুলে ধরে উদ্যোক্তাদের এ বিষয়ে আগ্রহী করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে সুনীল অর্থনীতিকেন্দ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির যথাযথ অগ্রগতি লাভ করা সম্ভব।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..