মত-বিশ্লেষণ

সুন্দরবনের জন্য ভালোবাসা

সাধন সরকার: ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস। সুন্দরবনের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধারই নয়, এটি রক্ষাকবচও বটে। কেননা বিভিন্ন দুর্যোগে সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বাঁচিয়ে চলেছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সুন্দরবন ব্যাপকভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে তুলে ধরে বা বাংলাদেশকে চেনে এমন পাঁচটি বিষয়ের তালিকা করলে সুন্দরবন সে তালিকায় থাকবে। বাংলাদেশের গর্ব এই সুন্দরবন। সম্প্রতি ইউনেসকো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে বিশ্বের জন্য অসামান্য সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় বিপন্ন প্রজাতির বহু প্রাণীর আশ্রয়স্থল এখন সুন্দরবন। মেছোবাঘ, ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন, মদনটাক, রাজগোখরা, উদবিড়াল প্রভৃতি বিপন্নপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ এখন সুন্দরবনজুড়ে। তথ্যমতে, প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার অবদান রেখে চলেছে সুন্দরবন।

ভৌগোলিক অবস্থান ও গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য সৃষ্টি ও টিকে থাকার এই নিবিড় প্রতিবেশব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সুন্দরবনের প্রধান সৌন্দর্য রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা বাঘের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে বাঘের সংখ্যা কমছে না, কমছে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে। চোরা শিকারিদের বিভিন্ন দল বাঘ হত্যা করছে। এ ছাড়া সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যাও কমছে ছাড়া বাড়ছে না। খাদ্যের অভাব, চোরা শিকারিদের দাপট ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের আরেক সৌন্দর্যের প্রতীক হরিণ ভালো নেই। হরিণের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে বাঘের খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে বেড়ে যাচ্ছে লবণাক্ততা। উজানে ফারাক্কা বাঁধের কারণে এবং গঙ্গা-গড়াই-কপোতাক্ষ-মাথাভাঙ্গা-ভৈরবসহ সুন্দরবনের সঙ্গে মিঠাপানির সরবরাহের সংযোগ থাকা নদ-নদীগুলোতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না বা অল্প লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, এমন উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছে। কম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারা সুন্দরী ও কেওড়া গাছের জন্য রীতিমতো হুমকি তৈরি হয়েছে। মূলত হিমালয় থেকে নেমে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ ও বঙ্গোপসাগরের লোনা পানির মিশ্রণে এক বিশেষ প্রতিবেশব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এই সুন্দরবনে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের সার্বিক প্রতিবেশব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সুন্দরবনের প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে সোয়া ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের দূষণ ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন প্রকৃতি-পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জন্য হুমকি তৈরি করছে। সুন্দরবন হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র শ্বাসমূলীয় বন যেখানে পলি পড়ে পড়ে নতুন ভূমি গঠিত হচ্ছে। আবার নতুন জেগে ওঠা ভূমিতে একইভাবে হরিণ, বাঘ, সাপসহ অন্যান্য প্রাণীও আবাসস্থল গড়ছে। শত শত বছর ধরে সুন্দরবন নিজে নিজেই টিকে আছে। প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা আবার নিজে নিজেই পূরণ করে চলেছে। সুন্দরবন দক্ষিণাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুন্দরবন তা পূরণ করতে পারলেও মনুষ্যসৃষ্ট বনবিনাশী কর্মকাণ্ড বনের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনছে। সুন্দরবনের পাশে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানার বর্জ্য সুন্দরবনের দূষণকে ত্বরান্বিত করছে। সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার সংবাদও এখন শোনা যায়, যা জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য অন্যতম অন্তরায়। শুঁটকির ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সুন্দরবনে যেন কোনো ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। মাঝেমধ্যেই সুন্দরবনে জেলেদের খাবার পানির সংকট দেখা দেয়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে যারা সুন্দরবনে যায়, তাদের সুপেয় পানির সংকট দূর করাও জরুরি। সুন্দরবনের আশপাশে যেকোনো ধরনের শিল্পকারখানা বা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার (ইআইএ) ফলাফলকে বিবেচনায় নিতে হবে। সুন্দরবন আবার বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রও। অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে সুন্দরবনের দূষণ বাড়ায় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি তৈরি হতে পারে। বনে কোনো ধরনের প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ যাতে না হয় এ ব্যাপারে আগত পর্যটকদের সতর্ক করতে হবে।

সুন্দরবনের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। কোনো কোনো উদ্ভিদ ও প্রাণী কম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, আবার কোনো কোনো উদ্ভিদ মাঝারি মানের লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। সুন্দরবনে লবণাক্ততা যাতে না বাড়ে, সেজন্য উজানের মিঠাপানির সরবরাহ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। সুন্দরবনে কোনো ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়লে তার প্রভাব পুরো দেশের ওপর পড়বে। কেননা বিপন্ন প্রাণীদের আবাস্থলসহ, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুরক্ষা ও সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদান অনস্বীকার্য। মনে রাখতে হবে, মঙ্গলগ্রহে যাওয়া সম্ভব, শহর বানানো সম্ভব; কিন্তু আরেকটি সুন্দরবন বানানো সম্ভব নয়।

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..