সারা বাংলা

সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণ হ্রাস, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

সৈয়দ মহিউদ্দীন হাশেমী, সাতক্ষীরা : সুন্দরবনের গোলপাতা বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। গোলপাতা দেখতে অনেকটা নারিকেল গাছের পাতার মতো। বহুমুখী ব্যবহার ও সহজলভ্যতার কারণে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ এর সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তারা ঘর নির্মাণের উপকরণ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে গোলপাতা ব্যবহার করে আসছেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গোলপাতা আহরণ কমে যাওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

সুন্দরবন বন বিভাগের সূত্রানুযায়ী, ১৮৭৪-৭৫ সালে সংরক্ষিত সুন্দরবন ব্যবস্থাপনার গোড়াপত্তন হয় বন বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর কয়েক বছর পর ষষ্ঠ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আর এল হেইনিগ মেয়াদকালে সুন্দরবন থেকে গোলপাতা কর্তনের বর্তমান চালু থাকা নিয়ম চালু করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বাওয়ালিরা নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে বন বিভাগ থেকে পাস নিয়ে নির্ধারিত এলাকা থেকে গোলপাতা কাটেন।

সে মোতাবেক পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে গোলপাতা আহরণ মৌসুম শুরু হয়েছে। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাওয়ালিরা সুন্দরবনে নির্ধারিত সাতটি স্পট থেকে এ গোলপাতা আহরণ করতে পারবেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরা সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এমএ হাসান।

তিনি বলেন, এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে ৪১, ৪২, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৫০(এ) ও ৫০(বি)Ñএ সাতটি স্পটে বাওয়ালিরা গোলপাতা আহরণ করবেন। আহরণের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ২৩ হাজার ২৮০ মণ বা ৪৬ হাজার কুইন্টাল।

এদিকে স্থানীয় বনজীবী ও বাওয়ালিরা জানান, কম দামে টেকসই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়া বনবিভাগের কড়াকড়ি আরোপ, পারমিট নিতে নানা জটিলতা ও হয়রানিসহ নিরাপত্তার কারণে সুন্দরবনে গোলপাতার আহরণ হ্রাস পাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ সূত্র জানায়, এ এলাকা থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৩ হাজার ৭৯১ কুইন্টাল গোলপাতা আহরণ করা হয়। এ থেকে রাজস্ব পাওয়া যায় ১৬ লাখ ১০ হাজার ৪৮৩ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭২ হাজার ১০ কুইন্টাল আহরণে রাজস্ব আসে ১৮ লাখ ২৪৮ টাকা। এছাড়া ২০১৬-১৭ বছরে ৫০ হাজার ৯৯০ কুইন্টালে ১২ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭৯ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৪ হাজার ৫৬ কুইন্টালে ১৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৫ হাজার ৭১৬ কুইন্টাল গোলপাতা আহরণে রাজস্ব আয় হয় ২৩ লাখ ৯২ হাজার ৯০৩ টাকা। চলতি বছর গোলপাতা আরও অনেক কম আহরণ হবে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্ট বন কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় বাওয়ালি ও বন কর্মকর্তারা জানান, এখন ব্যবহার কম হওয়ায় হাজার হাজার কুইন্টাল গোলপাতা নষ্ট হচ্ছে সুন্দরবনে। যেসব স্থানে গোলপাতার কূপ (প্রজনন ক্ষেত্র) রয়েছে, সেসব স্থানে এক জায়গায় অধিক গাছ হওয়ায় মাইজ পাতা নষ্ট হয়ে গাছ মরে যাচ্ছে। এছাড়া না কাটার কারণে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার টন গোলপাতা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, আগে গোলপাতা দিয়ে এক ধরনের ছাতা, ঝুড়ি, মাদুর, থলে, খেলনা প্রভৃতি তৈরি করা হতো। এছাড়া ঘরের চাল ও বেড়ার কাজে ব্যবহƒত হতো। কালের বিবর্তনে আজ সেগুলো হারাতে বসেছে। ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় গোলপাতা আহরণও কমে গেছে। প্রাকৃতিক এ সম্পদের বিকল্প ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে পারলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা মনে করছেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ফুল ও ফলের জন্য গোলগাছ পরিষ্কার করা জরুরি। সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এক জায়গায় নষ্ট হলে অন্য জায়গায় বৃদ্ধি পাবে।’ এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘সুন্দরবনের কোনো গাছ মানুষ লাগায়নি। ফলে এ বনের গাছও নিজস্ব নিয়মেই তার বিস্তার বৃদ্ধি করবে। একসময় ১০ লাখ টন গোলপাতা আহরণ করা হতো। এখন তা কমে ৪৬ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..