মত-বিশ্লেষণ

সুন্দরবনে বারংবার অগ্নিকাণ্ডের দায় কার?

মো. জিল্লুর রহমান: সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি, যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এটি। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর সুন্দরবন সারা বিশ্বের মানুষের কাছে অন্যতম এক আকর্ষণীয় স্থান। শৌর্য-বীর্যের প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রিয় আবাসভূমি এটি। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, ফণী ও বুলবুলের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলা করে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন, যা দেশের অহংকার। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম মানগ্রোভ বনভূমি আমাজনকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস, আর সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ফুসফুস। কিন্তু সেই সুন্দরবন মনুষ্যসৃষ্ট নানা অবহেলায় আজ চরম হুমকিতে।

ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’-এর আক্রমণে মানুষের মতো সুন্দরবনও মরিয়া হয়ে বুক পেতে প্রমাণ করেছে, সে-ই আমাদের বিপদের সবচেয়ে বড় বিশ্বস্ত বন্ধু। সুন্দরবন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষেত্রেই নয়, এর আগে ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বরে বুলবুল, ২০০৯ সালের ২৫ মের ঘূর্ণিঝড় আইলা এবং ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় সিডর মারাত্মক বিধ্বংসী ক্ষমতা নিয়ে আছড়ে পড়লেও সুন্দরবনে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ফলে অনেক কম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল; প্রাণহানিও হয়েছিল আশঙ্কার চেয়ে অনেক কম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল ও তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় দেয়ালের মতো কাজ করে সুন্দরবন।

সম্প্রতি গত ৩ মে সকালে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারানি টহল ফাঁড়ি এলাকার ২৪ নম্বর কম্পার্টমেন্টে আগুন লাগে। এর আগে চলতি বছর ৮ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর এলাকার আগুনে প্রায় চার শতাংশ বনভূমি পুড়ে যায়। সুন্দরবনে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট ফায়ার সার্ভিস ও বন বিভাগ। এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা খতিয়ে দেখতে বন বিভাগ বিভিন্ন সময়ে তদন্ত গঠিত গঠন করেছে এবং তাদের মতে, নাশকতা, অসচেতনতা ও অবহেলায় ফেলে দেয়া বিড়ি বা সিগারেটই এসব অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ। তবে অভিজ্ঞদের ধারণা, বনরক্ষীদের যোগসাজশে স্থানীয় মৌয়ালদের কেউ মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে আগুন দিয়ে থাকে। এছাড়া অনেকে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিংবা জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে বনের মধ্যে রান্না করে থাকে। সেই আগুন থেকেই বনের আগুনের সূত্রপাত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা। তবে যেভাবেই এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটুক না কেন, এটা শুধু আর্থিক বিচারে বিবেচ্য নয়, জলবায়ুর উষ্ণতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও পরিবেশের জন্য চরম হুমকি। এসব আগুন বিশ্ব উষ্ণায়ন তথা গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদীবিধৌত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ আরও নানা প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাবদাহ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উপকূলীয় এলাকায় বন্যা, বনাঞ্চলে মানবসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, যা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সমন্বয়ে গঠিত জাতিসংঘের একটি কমিটির ২০১৪ সালের মূল্যায়নে এই বিষয়গুলো উঠে আসে। ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বড় অংশে দাবদাহ ক্রমাগত বাড়ছে। একইভাবে উত্তর অ্যামেরিকা ও ইউরোপে ভারী বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেড়েছে এবং কিছু দিন পরপরই বিশ্বের নানা জায়গায় একই উদাহরণ সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনে এবারের আগুন লাগার ঘটনা নিয়ে গত প্রায় দুই দশকে ২৩ বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগের মতে, এর আগের ২২ বারের অগ্নিকাণ্ডে ৭১ একর ৬৬ শতাংশ বনজ সম্পদের (সুন্দরী গাছসহ বিভিন্ন লতা-গুল্ম) পুড়ে যায়, যার আর্থিক মূল্য ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৩ টাকা। বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০০২ সালে সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের কটকায় একবার, একই রেঞ্জের নাংলী ও মান্দারবাড়িয়ায় দুবার, ২০০৫ সালে পচাকোড়ালিয়া ও ঘুটাবাড়িয়ার সুতার খাল এলাকায় দুবার, ২০০৬ সালে তেড়াবেকা, আমুরবুনিয়া, খুরাবাড়িয়া, পচাকোড়ালিয়া ও ধানসাগর এলাকায় পাঁচবার, ২০০৭ সালে পচাকোড়ালিয়া, নাংলী ও ডুমুরিয়ায় তিনবার, ২০১০ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১১ সালে নাংলীতে দুবার, ২০১৪ সালে গুলিশাখালীতে একবার, ২০১৬ সালে নাংলী, পচাকোড়ালিয়া ও তুলাতলায় তিনবার, ২০১৭ সালে মাদ্রাসারছিলায় একবার এবং সবশেষ ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ধানসাগর এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৬২ শতাংশ বাংলাদেশে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এ বন সমুদ্র থেকে উঠে আসা দুর্যোগগুলোকে প্রথম মোকাবিলা করে। বাংলাদেশের ফুসফুস-খ্যাত সুন্দরবন অক্সিজেনের এক বিশাল ফ্যাক্টরি হিসেবে কাজ করে। সুন্দরী গাছের জন্য বিখ্যাত বলে সুন্দর বন নামটি সর্বমহলে গৃহীত। হাজারো জীববৈচিত্র্যের মধ্যেও সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার পৃথিবীবিখ্যাত। এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক। সুন্দরবন থাকার কারণে আমরা সৌভাগ্যবান। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সুন্দরবনকে আমরা প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। কখনও উন্নয়নের নামে, আবার কখনও ব্যক্তিগত বা মুষ্টিমেয় দলগত স্বার্থের কারণে।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণের কারণে এখানে পর্যটনশিল্প দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। প্রতি বছর বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক, গবেষক ও ছাত্র-শিক্ষক সুন্দরবন ভ্রমণ করে। সুন্দরবনে পর্যটকদের জন্য রয়েছে সাতটি পরিবেশবান্ধব পর্যটন স্পট। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুন্দরবনে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার ৫০০ বিদেশি পর্যটকও ছিল।

গবেষকরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার অন্যতম শক্তি সুন্দরবন। সিডর, আইলা ও বুলবুলের সময় সুন্দরবন মানুষের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে, অথচ মানবসৃষ্ট কিছু কারণে সুন্দরবন ও এরকম প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। আর সুন্দরবনের পাশে নির্মিতব্য রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়া সুন্দরবনের হারিয়ে যেতে বেশি দিন সময় লাগবে না। এজন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষায় সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলার সাফল্য ধরে রাখতে হলে এসব বিষয়ে সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি আমাদের আরও সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতেও যেমন, ঠিক তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের মোট বনজ সম্পদের একক বৃহত্তম উৎস সুন্দরবন। কাঠের ওপর নির্ভরশীল শিল্পের কাঁচামালের এক বিশাল অংশ জোগান দিয়ে আসছে সুন্দরবন। বহু মানুষ সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় কখনও অগ্নিকাণ্ডে আবার কখনও নানা অজুহাতে নির্বিচারে গাছ কেটে উজাড় করা হচ্ছে বনটি।

রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নানা মহলের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পরও এ প্রকল্প থেকে সরকার সরে আসেনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর ফলে সুন্দরবনের বনাঞ্চল, পরিবেশ ও জীবসম্পদ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এমনকি এই প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ। ভবিষ্যতের মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই সুন্দরবন রক্ষার জন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সুন্দরবনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো বনকে সুরক্ষা দিতে বন ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বনসংলগ্ন মরে যাওয়া নদ-নদী খনন এবং সীমান্ত এলাকায় বেড়া ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ঠিকই, কমিটি সুপারিশও করে, কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট যেমন আলোর মুখ দেখে না, ঠিক তেমনিভাবে সুপারিশগুলোও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। সর্বশেষ সুন্দরবনে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে বন বিভাগ। কমিটি তদন্ত করে তদন্ত রিপোর্ট দেবে, দায়ীদের চিহ্নিত করবে, কার অবহেলা কতটুকু তাও বের করবে, শাস্তির সুপারিশও করবে; কিন্তু কে দায়ী, তা হয়তো কেউ জানবে না। তবে যেই দায়ী থাকুক না কেন, বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার ফুসফুস সুন্দরবনকে রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার এবং সুন্দরবনকে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই রক্ষা করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের মতো মনুষ্যসৃষ্ট অবহেলায় যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংকার ও মুক্ত লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..