মত-বিশ্লেষণ

সুপথে ফেরাতে হবে ছাত্ররাজনীতিকে

সেলিম আহমেদ: শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রশাসন ক্যাম্পাসে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া সারা দেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার দাবি তুলেছেন ছাত্র-অভিভাবক ও সচেতন মহলের অনেকে। একবার চিন্তা করেছেন এক সময়কার গৌরবময় ছাত্ররাজনীতি পথভ্রষ্ট হয়ে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশে সব সংকটময় মুহূর্ত, সব সময়ই ছাত্রদের ভূমিকা ছিল স্মরণীয়। দেশের জন্য তারা বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা যায় আন্দোলনের সূতিকাগার।

কালের পরিবর্তনে আজ বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি অনেকটা লক্ষ্যভ্রষ্ট। দেশের শিক্ষাঙ্গন আজ নোংরা রাজনীতির ছোবলে অশান্ত। ছাত্ররাজনীতি ঘিরে শিক্ষাঙ্গন ও তার বাইরের সংঘাত কোনো আদর্শিক চেতনাবোধ থেকে নয়। এ সংঘাত সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থে ও সিন্ডিকেট স্বার্থে। বিগত কয়েক দশক থেকেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের দাপটে ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। নেই সহাবস্থানও। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই প্রাধান্য দেন। বইয়ের টেবিল ছেড়ে তারা কলেজ ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, ইভটিজিং, ছাত্রী-শিক্ষক লাঞ্ছনা, খুন, মাদকের ভয়াবহ আস্তানা তৈরিসহ নানা অপরাধকাণ্ডে জড়িত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ছাত্রসংগঠনগুলোকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ব্যবহার করছে নিজেদের স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে। আর এ কারণে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বাড়ছে বিতৃষ্ণা।

সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ (২১)। এরই জের ধরে গত রোববার রাতে ক্যাম্পাসের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে তাকে বর্বরভাবে পিটিয়ে হত্যা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০০২ সালে বুয়েটে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে ছাত্রদল নেতাদের গুলিতে নিহত হন সাবেকুন নাহার সনি। এখানেই শেষ নয়, স্বাধীনতার পর গত চার দশকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দেড়শ’ ছাত্র প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার শিক্ষার্থী।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সূত্রমতে, গত চার দশকে দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ ছাত্র। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ ছাত্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ ছাত্র এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় ছাত্র মারা যান।

বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ বা নিজেদের মধ্যে প্রায় ৫০০ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষে মোট ৭১ জন মারা যান। এর মধ্যে ৫৫ জনই নিহত হন নিজেদের কোন্দলে। বিএনপি আমলেও একইভাবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে ছিল ছাত্রদল। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথা মেনে তদন্ত কমিটি করেছিল, মামলাও হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে হারিয়ে গেছে এসব মামলা। তাই বিচারের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আহাজারি কখনোই শেষ হয় না।

ছাত্ররাজনীতির এই গৌরবের ধারা স্বাধীন বাংলাদেশেও ছিল। সেটি এখন সেখানে উল্টো হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসগুলোয় নেই কোনো ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতাদের দাপটে ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। নেই সহাবস্থানও। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতারা ছাত্রদের অধিকার আদায়ের চেয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই প্রাধান্য দেন। ফলে রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে বিতৃষ্ণা। শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আবারও ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি তোলেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। আন্দোলনের এ লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বুয়েট ক্যাম্পাসে সব ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের পর দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদসহ সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতারা কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার পক্ষে নন। আমিও ব্যক্তিগতভাবে চাই না, দেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হোক। ‘মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। ঠিক তেমনি পথভ্রষ্ট রাজনীতির জন্য পুরো ছাত্ররাজনীতিকে দোষারোপ করা যাবে না। আর ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হলে ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে হবে বাংলাদেশ। ক্যম্পাসগুলোয় মৌলবাদী ও জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে যাবে, যা মোটেও শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণ হবে না।

এজন্যই পথভ্রষ্ট এ রাজনীতিকে সুপথে ফেরাতে হবে। আর ছাত্ররাজনীতিকে সুপথে ফেরাতে হলে সর্বপ্রথমই ক্যাম্পাসগুলোয় সব প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের সহবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাসী ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। দুর্বৃত্তায়িত শক্তিকে অপসারণ করে স্বাধীনভাবে ছাত্ররাজনীতি করতে দিতে হবে। ছাত্ররাজনীতির নাম ধারণ করে যে দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের যেকোনোভাবে দমন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমত প্রকাশ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কথা যদি বাদই দিই, তাহলে ভবিষ্যৎ রাজনীতি তৈরির যে প্রক্রিয়া তা ধরে রাখার জন্যই সুপথে ফেরাতে হবে ছাত্ররাজনীতিকে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..