আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা বাণিজ্য সংবাদ সর্বশেষ সংবাদ সারা বাংলা

সুপারশপে করোনার দুই মাসে ভ্যাট বেড়েছে ‘৩১ শতাংশ’

রহমত রহমান: দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় সাধারণ ছুটি। সংক্রমণ রোধে বন্ধ করে দেওয়া দোকানপাট, শপিংমল, বিপণিবিতান। করোনা আতঙ্কে যখন সব প্রায় বন্ধ তখন খোলা ছিল সুপারশপ। করোনা দীর্ঘায়িত হবে এমন আশঙ্কায় ক্রেতারা প্রয়োজনের অধিক পণ্য কিনে। অনেকে আবার পণ্য কিনে বাসায় স্টক করে রাখে। এছাড়া সব বন্ধ থাকায় সব শ্রেণির ক্রেতারা ভিড় করে সুপারশপে।

ফলে করোনাকালীন দুইমাসে (মার্চ ও এপ্রিল) আগের দুই মাসের তুলনায় বিক্রি ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় সুপারশপে নজরদারি বাড়িয়ে দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে ভ্যাট আদায় আগের দুইমাসের তুলনায় বেড়েছে ৩১ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি দেশের চারটি শীর্ষস্থানীয় সুপারশপের ভ্যাট আহরণ হিসাব করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

## করোনায় স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি বেড়েছে সুপারশপে

## মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে বিক্রি কমে যাচ্ছে বলে দাবি

## করোনায় সব সুপারশপে কম বিক্রি আগের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে

ভ্যাট কমিশনারেটের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে মে মাসে করোনার সাথে রমজান আর ঈদ যোগ হয়েছে। ফলে মে মাসেও ভ্যাট আহরণ যেকোন মাসের তুলনায় বাড়বে বলে ধারণা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তবে সুপারশপ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব খুলতে শুরু করেছে। মানুষের মধ্যে ভয় কেটে গেছে। ফলে মে মাসে বিক্রি আশানুরূপ হবে না।

এনবিআর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চারটি বড় সুপারশপ রয়েছে, যাদের কেন্দ্রীয় ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে। সারা দেশে তাদের অনেক শাখা রয়েছে। এ চারটি ছাড়াও আরো সুপারশপ রয়েছে। করোনার সময় ভয়ে, আতঙ্কে মানুষ পণ্য কিনতে সুপারশপমুখী হয়েছেন। ফলে বিক্রির সাথে ভ্যাটও বেড়েছে। ভ্যাট আহরণের তুলনামূলক চিত্র যাচাই করতেই বড় চারটি সুপারশপের ভ্যাট তুলনা করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। তবে করোনায় সব সুপারশপে বিক্রি বেড়েছে। সব সুপারশপের দুই মাসের ভ্যাট আহরণের চিত্র তুলনা করলে ভ্যাট আহরণ আরো বাড়বে বলে জানান কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা জানান, সুপারশপে করোনার আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস এবং করোনার সময় মার্চ ও এপ্রিল মাসের ভ্যাট হিসাব করা হয়। প্রতিটি কমিশনারেটের আওতাধীন সুপারশপ বিশেষ করে ফ্রন্টলাইনের সুপারশপসমূহের রাজস্বের দুইমাসের ভ্যাট আহরণের চিত্র তুলনা করা হয়। বিশেষ করে স্বপ্ন, আগোরা, ইউনিমার্ট ও মিনা বাজারের ভ্যাট আহরণের হিসাব করা হয়েছে। সম্প্রতি সব কমিশনারেটের হিসাব অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি-এ দুইমাসে চারটি সুপারশপ থেকে ভ্যাট আহরিত হয়েছে মোট ১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর করোনাকালে মার্চ ও এপ্রিল-এ দুইমাসে চার সুপারশপ থেকে আহরিত হয়েছে ২০ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ পরের দুইমাসে আগের দুই মাসের তুলনায় চার কোটি ৭৩ লাখ টাকা বেশি ভ্যাট আহরিত হয়েছে। শতকরা হিসেবে করোনাকালে দুই মাসে ভ্যাট আহরণ বেড়েছে ৩১ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন সুপারশপ থেকে ভ্যাট আহরিত হয়েছে ৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর করোনাকালে মার্চ ও এপ্রিল-এ দুইমাসে সবচেয়ে বেশি ১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ভ্যাট হয়েছে, যা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বেশি। আর শতকরা হিসেবে স্বপ্ন থেকে ভ্যাট আহরণ বেড়েছে ২৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আগোরা থেকে ভ্যাট আহরিত হয় ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর মার্চ ও এপ্রিল মাসে আহরণ হয়েছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৬৯ লাখ টাকা বেশি। আর শতকরা হিসেবে এ সুপারশপ থেকে ভ্যাট আহরণ বেড়েছে ২২ শতাংশ।

ইউনিমার্ট সুপারশপ থেকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ভ্যাট আহরিত হয়েছে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর মার্চ ও এপ্রিল মাসে ভ্যাট আহরিত হয়েছে তিন কোটি ২১ লাখ টাকা। যা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় ৮১ লাখ টাকা বেশি। দুই মাসে এ সুপারশপে শতকরা হিসেবে ভ্যাট বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।

এছাড়া মিনা বাজার থেকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ভ্যাট আহরিত হয়েছে এক কোটি ৭ লাখ টাকা। আর মার্চ ও এপ্রিল মাসে আহরিত এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ সুপারশপে পরের দুইমাসে ভ্যাট বেড়েছে ৭৮ লাখ টাকা, যা শতকরা হিসেবে ৭৩ শতাংশ।

সূত্রমতে, করোনার সময় সুপারশপে বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় নজরদারি বাড়ায় এনবিআর। ১৮ এপ্রিল ‘চলমান করোনা পরিস্থিতিতে চালু প্রতিষ্ঠানের (এক লাখ টাকা বা তদুর্ধ্ব) তথ্য পাঠাতে’ সব ভ্যাট কমিশনারেটকে নির্দেশ দেয় এনবিআর। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সিগারেট, ওষধ, সুপারশপ ইত্যাদি।

করোনার আগে কেমন ভ্যাট আদায় হয়, এপ্রিল মাসে কি পরিমাণ ভ্যাট আদায় হতে পারে তার তথ্য ২৫ এপ্রিলের মধ্যে জানাতে কমিশনারেটগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। কমিশনারেটগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এনবিআর সুপারশপের তুলনামূলক চিত্র তৈরি করে। সুপারশপে বেচাকেনার ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়।

সুপারশপ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, করোনার সময় সবকিছু বন্ধ থাকলেও নিত্যপণ্য বিক্রয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সব সুপারশপ খোলা রয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও স্বাস্থ্যবিধি যথাসম্ভব মেনে এসব সুপারশপে বেচাকেনা চলছে। তাই মধ্যবিত্তরা কাঁচাবাজারে না গিয়ে সুপারশপমুখী হয়েছেন। ফলে সুপারশপে বেচাকেনাও বেড়েছে।  স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সুপারশপে বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

করোনায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি, সেবা প্রদানের পাশাপাশি সবোর্চ্চ ভ্যাট আহরণ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম সুপারশপ ‘স্বপ্ন’। করোনায় সামাজিক দূরত্ব আর সুরক্ষা নিশ্চিত করেই ১৩১টি আইটলেটে সেবা দেওয়া হয়েছে। লকডাউনে বিক্রি আগের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি হয়েছে।

স্বপ্নের হেড অব কমিউনিকেশন মাহাদী ফয়সাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সিচুয়েশনের কারণে করোনাকালীন সময়ে সেলটা অনেকটা বেড়েছে। অন্য সময় ঈদে যে সেলটা হয় আমাদের তা করোনা সময়কালীন সময়ে হচ্ছে। তবে সামনে সেলটা কমবে বলে ধারণা করছি। কারণ সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সকলেই আমরা কঠিন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

সুপারশপ মিনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন খান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মার্চ-এপ্রিলে বিক্রি বেড়েছে। তবে মে মাসে বিক্রি কমে যাচ্ছে। কারণ মার্চ-এপ্রিলে মানুষ ভয়ে বাড়তি পণ্য কিনে স্টক করেছে। এখন যখন মানুষ দেখছে ভয় কেটে যাচ্ছে, সব খুলবে পণ্য পাবে তখন পণ্য বিক্রি কমছে। সে কারণে মে মাসে পণ্য বিক্রি আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। ফলে ভ্যাটও কমে যাবে।’

এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) মো. জামাল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, করোনার সময় সুপারশপ পুরোধমে চালু ছিল। মানুষ বেশি পণ্য কিনেছে বলে বেশি রাজস্ব আহরণ হয়েছে। দুই মাসের তুলনা করার মাধ্যমে আমরা দেখতে চেয়েছি কি পরিমাণ ভ্যাট বেড়েছে।

সুপারশপ মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে মীনাবাজার ও আগোরার মাধ্যমে এ দেশে সুপারশপের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী দুই শতাধিকের মতো সুপারশপ আছে। বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। সুপারশপ থেকে এনবিআর বছরে গড়ে একশ কোটি টাকার মতো ভ্যাট পায়।

সূত্র আরো জানায়, ২০১০ সালে সুপারশপের ভ্যাট ছিল ২ শতাংশ। ২০১২ সালে করা হলো ৪ শতাংশ। আবার ২০১৪ সালে ২ এবং ২০১৫ সালে এসে ৪ শতাংশ এবং এখন ৫ শতাংশ। যখন ২ শতাংশ ভ্যাট ছিল তখনই ইন্ডাস্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

###

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..