দিনের খবর পত্রিকা প্রথম পাতা

সুর চৌধুরী ও শাহ আলমের সস্ত্রীক ব্যাংক হিসাব তলব

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী দুই কর্মকর্তা

রহমত রহমান: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও উপদেষ্টা সীতাংশু কুমার সুর চৌধুরী (এস কে সুর চৌধুরী) এবং বর্তমান নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলম। এর মধ্যে এসকে সুর চৌধুরী অবসরে গেছেন। আর নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমকে সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ দুই কর্মকর্তার আর্থিক কেলেঙ্কারি তদন্ত করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এবার শীর্ষ এই দুই কর্মকর্তার রাজস্ব ফাঁকির খোঁজে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দুই কর্মকর্তা ও তাদের স্ত্রীদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। গতকাল তথ্য চেয়ে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তথ্য দিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চিঠিতে এস কে সুর চৌধুরী ছাড়াও তার স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। তাদের ঠিকানা দেয়া হয়েছেÑবাসা/হোল্ডিং: ফ্ল্যাট নং-২/৬০২. ইস্টার্ন উলানিয়া, ২ সেগুনবাগিচা, ঢাকা এবং ৩০/২, পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯। মো. শাহ আলম ছাড়াও তার দুই স্ত্রী শাহীন আক্তার শেলী ও নাসরিন বেগমের ব্যাংক হিসাব তথ্য চাওয়া হয়েছে। ঠিকানা দেয়া হয়েছে-৯৮, পূর্ব রাজারবাগ, বাসাবো, সবুজবাগ। চামপাক নগর, হালিমা নগর, সদর, কুমিল্লা। বাসা/হোল্ডিং-৩৫, রাস্তা-৯৯৯, ওয়ার্ড-১৫, জিগাতলা, ধানমন্ডি। হাউজ-৩৫, রোড-১২/এ, ধানমন্ডি। বাসা/হোল্ডিং-১০২, কলাবাগান, ২য় লেন, গ্রাম/রাস্তা-৯৯৯, ওয়ার্ড-১৭, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি। ১০২, কলাবাগান, ২য় লেন, ধানমন্ডি।

সিআইসি’র চিঠিতে বলা হয়, এস কে সুর চৌধুরী, তার স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী, মো. শাহ আলম ও তার দুই স্ত্রী শাহীন আক্তার শেলী ও নাসরিন বেগম। এ করদাতা ও তাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য, স্ত্রী, সন্তান এর এক বা যৌথ নামে অথবা তাদের আংশিক মালিকানাধীন অন্য যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে যে কোনো মেয়াদে আমানত হিসাবের (এফডিআর হিসাবসহ যে কোনো ধরনের বা নামের মেয়াদি আমানত হিসাব) তথ্য দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া যে কোনো ধরনের বা মেয়াদের সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব, ঋণ হিসাব (মঞ্জুরি পত্রের কপিসহ), ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড, লকার বা ভল্ট, সঞ্চয়পত্র বা অন্য যে কোনো ধরনের সেভিংস ইন্সট্র–মেন্ট। ইনভেস্টমেন্ট স্কিম বা ডিপোজিট স্কিম, শেয়ার হিসাব (বিও অ্যাকাউন্ট) বা অন্য যে কোনো ধরনের বা নামের হিসাব পরিচালিত হয়ে থাকলে সেই হিসাবগুলোর ২০১৩ সালের ১ জুলাই থেকে হালনাগাদ হিসাব বিবরণী। এছাড়া আগে ছিল কিন্তু বর্তমানে বন্ধ এরূপ হিসাবের তথ্যও প্রেরণ করতে বলা হয়েছে। আগামী সাতদিনের মধ্যে এসব তথ্য সিআইসিকে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১১৩ (এফ) ধারার ক্ষমতা বলে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএস ফাইন্যান্স ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্সসহ পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ পাচার করেছে প্রশান্ত কুমার হালদারের (পি কে হালদার) নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সম্প্রতি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েক কর্মকর্তার নাম বলেছেন। অর্থ লোপাটে জড়িত হিসেবে শামসুল আলামিন রিয়েল এস্টেটের পরিচালক (অর্থ) আরেফিন শামসুল আলামিন, প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ও বর্তমানে নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমের নাম উল্লেখ করেন।

সূত্র আরও জানায়, আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব ঘটনায় পাঁচটির বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা নাজুক অবস্থায় পৌঁছায়। পিপলস লিজিংকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত দেন উচ্চ আদালত। বর্তমানে এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব ঘটনার সারবস্তু তুলে ধরতে ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কমিটিকে প্রাথমিকভাবে তিন মাস সময় দেয়া হয়েছে। এতে প্রধান করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এ কে এম সাজেদুর রহমান খান। কমিটিতে একজন নির্বাহী পরিচালক, দুজন মহাব্যবস্থাপক ও সাচিবিক দায়িত্ব পালনের জন্য একজন ডিজিএম পদমর্যদার কর্মকর্তাকে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় দেশ থেকে পাচার হয়ে হয়ে যায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মতো। এতে পিকে হালদারসহ কয়েকজনের নাম বেরিয়ে আসে। আর্থিক কেলেঙ্কারির এসব ঘটনার তথ্য উদঘাটনে আদালতের নির্দেশে উচ্চ পর্যায়ের পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্রমতে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভালের জন্য ২০১৩ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পান মো. শাহ আলম। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পদোন্নতি পেয়ে একই বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হন তিনি। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। এসব দুর্নীতি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গেøাবাল ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদার। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে সম্প্রতি তাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

তার দায়িত্ব পালনকালে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড ২০১৯ সালের জুনে প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন (লিকুইডেশন) হয়েছে। আরেকটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি) অবসায়নের প্রক্রিয়া এখনও চলমান। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেডসহ (আইএলএফসি) অন্য আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। ক্রমাগত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা সামনে আসেনি। দুর্নীতি ঢাকতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ঘুষ গ্রহণের ব্যাপারে আইএলএফসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হকের আদালতে স্বীকারোক্তির পর শাহ আলমের দুর্নীতির খবর অবশেষে প্রকাশ পেয়েছে।

আইএলএফসি’র পাঁচটি জালিয়াতির ঘটনায় রাশেদুল হকের সম্পৃক্ততার অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৪ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গ্রেপ্তারের পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারকারী পলাতক প্রশান্ত কুমার হালদারের সহযোগী এই রাশেদুল। আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রাশেদুল জানিয়েছেন, প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা ঘুষ নিতেন শাহ আলম। তার দায়িত্বকালীন ব্যাংকবহিভর্‚ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের শোচনীয় অবস্থা সত্তে¡ও শাহ আলম ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। এছাড়া এস কে সুর চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা অভিযোগ রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..