মত-বিশ্লেষণ

সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে সহায়তাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

আকিক তানজিল জিহান: মানবসভ্যতা এক দুর্যোগময় পরিস্থিতি পার করছে। একইসঙ্গে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সংকট হিসেবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্বায়নের দুনিয়ায় বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার জাঁতাকলে মননশীল চর্চার দ্বারা প্রাপ্ত শিক্ষা থেকে অনেকটা দূরেই অবস্থান করছে আধুনিক সভ্যতার বেশ বড় একটা অংশ। এর প্রধান কারণ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে দর্শনচর্চার অভাবকেই একপ্রকার দায়ী করা যেতে পারে।

এখন আশা যাক শিক্ষা কী, দর্শন কী? আমাদের কাছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির ভেতরে থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সার্টিফিকেট অর্জনই শিক্ষা। আর দর্শন তো আমাদের কাছে পাগলামি আর বিলাসিতার অংশ। আজকের পার করা বৈজ্ঞানিক কৃত্রিম যান্ত্রিক জীবন অথবা নাগরিক ব্যস্ততায় এর চেয়ে ভালো উত্তর আশা করা যায় না।

শিক্ষা ও দর্শন পরস্পর ওতপ্রোতভাবেই জড়িত। শিক্ষা যদি হয় দর্পণ, তবে দর্শন হবে তার মুখচ্ছবি। কোনো জাতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পেতে হলে শিক্ষার নীতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতে হয়। আর এক্ষেত্রে দর্শনই শিক্ষার একমাত্র ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ দর্শনের মাঝেই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্নিহিত। অন্যভাবে বলা যায়, শিক্ষা দর্শনের গতিশীল দিক আর শিক্ষার মাধ্যমেই দর্শনের কলাকৌশল পূর্ণতা লাভ করে।  বৃহদার্থে শিক্ষা বলতে বোঝায়, দেহ ও মনের সঙ্গে প্রকৃতি-পরিবেশে ধাবমান বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সামগ্রিক বিষয়বস্তুর সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন।

সমগ্র বিশ্বে দর্শনকে জ্ঞানচর্চার পিপাসা বলে ধরে নেয়া হয়। ইংরেজ সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক হারবার্ট স্পেন্সারের মতে, দর্শন হলো চিন্তাশক্তির একীকরণ। এর অপর নাম সর্ববিজ্ঞান। তার এই মতামত বিশ্লেষণ করে বলা যায়, দর্শন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জগৎ-সংসারের সামগ্রিক বিষয়বস্তুকে চিন্তাশক্তির দ্বারা বিচার, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ ও অনুসন্ধান করা যায়।

শিক্ষা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, মস্তিষ্ক, আত্মার বিকাশ ও কর্মদক্ষতার  মাধ্যমে ব্যক্তিসত্তার সর্বাঙ্গীণ বিকাশই শিক্ষা। তিনি যান্ত্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মনশীলতা চর্চার দিকে দৃষ্টিপাত করেন।

ভারতবর্ষের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধী তার ব্যক্তিগত জীবনদর্শন দ্বারা বনিয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা উদ্ভাবন করেন। মাতৃভাষানির্ভর দেশীয় এ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল কর্ম ও বিষয়ভিত্তিক শিল্প সম্পাদনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন। প্রাথমিকভেবে ইংরেজি শিক্ষাকে একেবারেই বাদ দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ইংরেজিকে একটি বিকল্প বিষয় হিসেবে রাখা হয়।  স্বাধীন ভারতে বনিয়াদি শিক্ষাদর্শন গান্ধীজির অতুলনীয় অবদান।

ফরাসি প্রকৃতিবাদী দার্শনিক রুশোর মতে, মানুষকে ক্রীতদাস করে তোলার পেছনে গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতিই দায়ী। শিক্ষার জন্য শিশু নয়, শিশুর জন্য শিক্ষা। একটি শিশুকে জ্ঞান ও কর্ম ইন্দ্রিয়গুলোর মাধ্যমে মানসিক বিকাশে সহায়তার দ্বারা সক্রিয় করে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

সভ্যতার পালাবর্তনে বিভিন্ন ভূখণ্ডে থাকা জাতি-বর্ণ, সভ্যতা ও সমাজভেদে মনোজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা দর্শনের ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এরই ফলস্বরূপ স্বভাববাদ, বাস্তববাদ, ভাববাদ, প্রয়োগবাদ আর অস্তিত্ববাদের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা। এককথায় শিক্ষার তত্ত্ব নির্ণয় ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে দর্শন থেকে বিভিন্ন মতবাদ বিচার, বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করতে দেখা গেছে। চীনের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান। প্রথমদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় শিক্ষার চেয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে আত্মিক উন্নতির মাধমে সুনাগরিক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করা হলেও রুশ বিপ্লবের পরবর্তীকালে চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় কার্ল মার্কসের কমিউনিজম বা সমাজতান্ত্রিক দর্শন নীতি সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। মার্কসবাদ শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার সঙ্গে শ্রম ও উৎপাদন কর্মের সমন্বয়করণ। এরই ভাবার্থে কারিগরি শিক্ষানীতির প্রয়োগ দেখা যায় চীনের শিক্ষাঙ্গনে। এদিকে প্রাচীন গ্রিসের শিক্ষার প্রসারের মূল লক্ষ্যই ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে প্রজ্ঞা ও মননশীলতার মাধ্যমে সুবিবেচক হিসেবে গড়ে তুলে রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যক্তিকে প্রস্তুত করা। এছাড়া গ্রিসের রোমান সভ্যতার পর ধর্মতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়। এরপর একদিকে রেনেসাঁস ও রিফরমেশন আন্দোলন, অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার প্রভাবে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা ক্রমেই পরিবর্তিত হয়ে বিশ্বায়নের মোড়কে পুঁজিবাদী সমাজ সৃষ্টি করে। এর ফলে বাণিজ্যনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সুসংগত জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে সহজ, সরল ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে প্রতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করতে থাকে। একপর্যায়ে ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হয়। এর ফলে পুঁজিবাদ বৃহৎ আকার ধারণ করে ঔপনিবেশিক সমাজ সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্বল ব্যবস্থাপনা আর বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। প্রাচীন ভারতে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে মোক্ষ দর্শন মতবাদের ওপর ভিত্তি করে। এর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জড় জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ব্যক্তিসত্তার সন্ধান লাভ। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও দেশীয় ও আঞ্চলিক শিক্ষাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে একমুখী ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন করার জন্য চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। ইদানীং সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলা হলেও এর খুব একটা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ওঠেনি। অনুন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশই প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার গ্যাঁড়াকল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। একইসঙ্গে এসব দেশ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর ওপর কতটা নির্ভরশীল, তা খুবই স্পষ্ট।

শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..