মত-বিশ্লেষণ

সুসভ্য জাতি গঠনে চাই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন

জিনাত আরা আহমেদ: ‘স্বাস্থ্য সকল সুখের মূল’ কথাটা খুব পরিচিত। এখানে স্বাস্থ্য বলতে মূলত সুস্থতার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সুখের চাবিকাঠি এই সুস্থতা অনেকের জন্য সাময়িক সুখ হিসেবে ধরা দেয়। নানামুখী অসুস্থতা জীবনকে পুরোপুরি উপভোগ করতে দেয় না। এর পেছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মই দায়ী। অথচ সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চললে সুস্বাস্থ্যের অধিকার হয়ে সারা জীবন থাকা যায় হাসিখুশি আর প্রাণোচ্ছল।
সুস্থতার প্রথম শর্ত হলো পরিচ্ছন্নতা। মানুষের পরিচয় প্রকাশ পায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে। একটি খাবার গ্রহণ আর একটি হলো স্যানিটেশনের মাধ্যমে। স্যানিটেশন হলো ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। এর মধ্যে আছে হাত ধোয়া, খাবার প্রস্তুতসহ খাবার পরিবেশনে পরিচ্ছন্নতা। এছাড়া বাথরুম ব্যবহারে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির সহজলভ্যতাও স্যানিটেশনের মধ্যে পড়ে। মূলত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে অর্থাৎ প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাপনাকে স্যানিটেশন বলা হয়।
নিরাপদ পানি স্যানিটেশনের অপরিহার্য শর্ত। উৎস থেকে পানি সংগ্রহ, পানি সংরক্ষণ এবং পান করা প্রতিটি পর্যায়েই সচেতনতা এবং সতর্কতা জরুরি। যদি টিউবওয়েলের পানি হয়, তবে তা আর্সেনিকমুক্ত কি না সেটা বিবেচ্য বিষয়। পানির পাত্র খোলা রাখলে তাতে ধুলা-ময়লা, পোকা অথবা রোগ-জীবাণু আক্রমণ করতে পারে। এ কারণে পানির পাত্রসহ যে গ্লাসে আমরা পানি পান করি তা ঢেকে রাখা জরুরি। তাছাড়া পানি যে পাত্রে সংরক্ষণ করা হয় তা নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। অনেক সময় হোটেল কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় যে গ্লাসে পানি পরিবেশন করা হয় তা অন্যদের ব্যবহƒত গ্লাস হওয়ায় রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসব ক্ষেত্রে সবসময় নিজস্ব গ্লাস থাকাটা জরুরি। বাইরে বের হওয়ার সময় পানির বোতল সঙ্গে রাখলে সাবধান থাকা যায়। ঘরেও প্রত্যেকের জন্য আলাদা গ্লাস, মগের ব্যবস্থা থাকা স্বাস্থ্যসম্মত। সাপ্লাইয়ের পানি অবশ্যই দীর্ঘ সময় ফুটিয়ে খাওয়া উচিত।
হাত ধোয়া স্যানিটেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে খাবার অথবা পানি আমাদের বেঁচে থাকার নিয়মিত অনুষঙ্গ সেটা গ্রহণের সময় যদি হাত অপরিচ্ছন্ন থাকে তখন খাবারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। হাতে লেগে থাকা রোগ জীবাণুর মাধ্যমে খাদ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এছাড়া পেটের পীড়া এবং ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, হাঁচি, কাশি ও যক্ষ্মাসহ অসংখ্য রোগের অন্যতম কারণ হাত ঠিকমতো না ধোয়া।
টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়, আর পরিবারে মা-বাবার শেখানো অভ্যাস থেকেই গড়ে ওঠে স্বাস্থ্য সচেতনতা। বাথরুমে সবসময় আলাদা স্যান্ডেল ব্যবহার করা উচিত। নিয়মিত হারপিক, ফিনাইল জাতীয় জীবাণুনাশক দিয়ে বাথরুম ধোয়া থাকলে ক্রিমি থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আমরা অনেকেই বাথরুম পরিষ্কার করি কিন্তু বাথরুমে স্যান্ডেল, বদনা, মগ এসব জীবাণুমুক্ত করি না; এতে স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে না। তাই অবশ্যই বাথরুম জীবাণুমুক্তকরণে অন্যান্য বিষয়ও খেয়াল করা দরকার।
স্যানিটেশন শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় বরং এটা নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও অংশ। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। এমনকি হাঁচি-কাশির সময় নাকে রুমাল চেপে ধরা কিংবা যেখানে-সেখানে থুথু না ফেলা, এসব অভ্যাসের মাধ্যমেও স্যানিটেশনের সুফল পাওয়া যায়। শৌচাগার থেকে ফেরার পর সাবান দিয়ে হাত ঠিকমতো না ধুলে ডায়রিয়া, আমাশয় যেমন নিজের হতে পারে তেমনি সেই হাতে খাবার পরিবেশন, কোনো বস্তু ধরা এমনকি করমর্দনের মাধ্যমে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারে। এভাবে একজনের অসুস্থতা বহু মানুষের রোগের কারণ হতে পারে। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ স্যানিটেশনের অভাবে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়। পরিণতিতে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচক নেমে গিয়ে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে।
সুস্বাস্থ্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। ১৯২৩ সালে গান্ধীজি বলেছিলেন, স্যানিটেশন স্বাধীনতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন অর্থাৎ এসডিজি’র তিন নম্বর লক্ষ্য হলো সুস্থ ও সচেতন জীবনযাপন পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের মানুষের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। এছাড়া মহামারি ও শিশুমৃত্যুরাধে সাধারণ মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও অন্যতম উদ্দেশ্য। বলা বাহুল্য, মানব বর্জ্যরে যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে বায়ু, পানি ও ভূমি দূষণে সংক্রামক রোগ বেড়ে যায়। এ ধরনের রোগে মৃত্যুহার হ্রাস করাও এসডিজি’র লক্ষ্য। এসবের জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারের লক্ষ্য হেপাটাইটিসসহ পানিবাহিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ মোকাবেলা করা। অপরিচ্ছন্নতা থেকে এবং ঠিকমতো হাত না ধোয়ার কারণে হেপাটাইটিস ‘এ’র মতো উচ্চমাত্রার সংক্রামক রোগ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে চর্ম রোগ হতে পারে। অথচ সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, খাওয়ার সময় নিরাপদ পানি দিয়ে বাসনকোসন ধোয়া, খাবার ঢেকে রাখা, বাথরুম ব্যবহারে সচেতন থাকলে ডায়রিয়া, ক্রিমিসহ অন্যান্য রোগ সংক্রমণের ভয় থাকে না।
বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের ক্ষেত্রে পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির টেকসই ব্যবহারের ওপর দারিদ্র্য বিমোচন, সমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। পাশাপাশি স্যানিটেশন সুবিধার ব্যাপক বিস্তার দেশের স্বাস্থ্য খাতের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সরকারের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্যানিটেশন সুবিধার পরিধি বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াসের ফলে বিগত বছরগুলোয় এ খাতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।
দেশে মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। সরকারের নেওয়া ন্যাশনাল স্যানিটেশন ক্যাম্পেইনের ফলে দেশে প্রতি বছর ৯ শতাংশ হারে এ সুবিধার বিস্তার ঘটছে। বর্তমানে দেশে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করা মানুষের পরিমাণ এক শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, ১৯৯০ সালে যা ছিল ৩৪ শতাংশ। খোলা জায়গায় মলত্যাগের সংস্কৃতি দূর করার কাজে সাফল্যের বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকার পরেই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। বিশুদ্ধ পানি এবং উন্নত স্যানিটেশন সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ফলে স্বাস্থ্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডায়রিয়াসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমে এসেছে।
বর্তমান সরকারের পারস্পেক্টিভ প্ল্যান (২০১০-২১) সবার জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সাল-পরবর্তী দেশের উন্নয়ন এজেন্ডার অন্যতম লক্ষ্য হলো সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই পানি, স্যানিটেশন এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা।
নিরাপদ পরিবেশের জন্য স্যানিটেশনের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্যগ্রহণ থেকে মলত্যাগ পর্যন্ত স্যানিটেশনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চর্চায় তথা মূল্যবোধে প্রতিফলিত হতে হবে। উন্নত স্যানিটেশন সভ্য মানুষের পরিচয়। সভ্য মানুষ আর সুসভ্য জাতি একে অপরের পরিপূরক। প্রতিটি পরিবারে যদি স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের ধারণা গড়ে ওঠে, তবেই গড়ে উঠবে সুসভ্য জাতি।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..