মত-বিশ্লেষণ

সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন পুষ্টিকর খাবার

অখিল পোদ্দার: রাহেলার যখন বিয়ে হয় তখন ও বয়স ছিল ১৫ বছর। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। রাহেলাদের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় হাওর অধ্যুষিত এলাকায়। হাওর অঞ্চলে মানুষের অভাব-অনটন এমনিতেই বেশি। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে রাহেলার বাবা তাকে অল্প বয়সে বিয়ে দেন। বিয়ের প্রথম বছরেই গর্ভবতী হন রাহেলা। স্বামীর আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। মাছ বিক্রি করে যে উপার্জন হয়, তা দিয়েই তাদের পরিবার চলে। গর্ভাবস্থায় একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চেকআপ করিয়েছেন। হাওর অঞ্চলে বর্ষার সময় যাতায়াত বেশ কষ্টকর। যাতায়াতের জন্য নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয় হাওর অঞ্চলের মানুষদের। এ সময় খুব সহজে ডাক্তারও পাওয়া যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য ও বিশ্রাম কোনোটিই ঠিকমতো পাননি রাহেলা। বাড়িতেই ছেলেসন্তান প্রসব হয়েছে দাইয়ের মাধ্যমে। অপুষ্টির কারণে মা এবং সন্তানের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে, যেন ‘অপুষ্ট মায়ের অপুষ্ট সন্তান’।

রাহেলা ছেলেকে টিকা দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকে যান। স্বাস্থ্যকর্মী সুফিয়া তার ছেলেকে টিকা দেন এবং জানতে চান ছেলের শরীরের এ অবস্থা কেন? জানতে চান ছেলে ঠিকমতো বুকের দুধ পায় কি না? স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলে রাহেলা জানতে পারেন তার এবং তার সন্তানের পুষ্টিহীনতার কারণ। পুষ্টিহীনতা কীভাবে দূর করা যায়, কোন খাবারে কী পুষ্টি থাকে, স্বাস্থ্যকর্মী তাও ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন রাহেলাকে। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং সেখানকার কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীরা রাহেলাদের মতো অসহায় এবং সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাহেলা শুষ্ক মৌসুমে গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে বাড়ির উঠানে শাকসবজি লাগাতে শুরু করেন। রাহেলার স্বামীও মাঝে মধ্যে এ কাজে সাহায্য করেন তাকে। তিনি স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে জেনেছেন, আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় বিশেষ করে গর্ভবতী মা এবং শিশুরা রক্তস্বল্পতার শিকার হয় বেশি। রক্তস্বল্পতার কারণে শরীরের নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। কলিজা, ডিমের কুসুম, দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য, কচুশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, কাঁচকলা প্রভৃতি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলে অপুষ্টিজনিত রক্তশূন্যতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। মাছ, মাংস শরীরের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করে। পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ-সবল রাখার জন্য প্রোটিনের সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন এবং খনিজ লবণেরও প্রয়োজন। প্রোটিন শুধু যে মাছ-মাংসেই পাওয়া যায় তা কিন্তু নয়, বিভিন্ন শাকসবজি শিম, টমেটো, গাজর, শিমের বিচি ইত্যাদি দেশীয় সস্তা খাবারেও প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও প্রোটিন থাকে। যাদের মাংস, ডিম, দুধ কেনার সামর্থ্য নেই, তারা একটু সচেতন হলেই দেশীয় সস্তা খাবার খেয়েও ভিটামিনের অভাব পূরণ করতে পারে।

চিকিৎসাসেবা মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। দেশের হাওর, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকার অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে কমিউনিটি ক্লিনিক। গ্রামীণ নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা সেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়। অনেক অঞ্চলে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে সরকারের সহযোগী হিসেবে।

মায়েদের গর্ভকালীন সেবার সঙ্গেই মা ও শিশুর পুষ্টি সম্পর্কেও সচেতন করছে সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। দেশের আনাচে-কানাচে পুষ্টি তথ্য ও সেবা ছড়িয়ে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকের সঙ্গে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টিকর খাবার এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকিমুক্ত হবে মা ও শিশুর জীবন, এই কৌশল অবলম্বন করেই পরিচালিত হচ্ছে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম।

পুষ্টি সেবা কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার সূচনা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই কার্যক্রমটি সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়নকাল ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্পটির লক্ষ্য হচ্ছে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতির হার অতিরিক্ত ৬ শতাংশ কমিয়ে আনা। এ পর্যন্ত এক লাখ ৭৩ হাজার ১৪ জন দরিদ্র শিশু এ প্রকল্পের আওতায় সুবিধা ভোগ করছে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে দুই লাখ ৫০ হাজার পরিবারের শিশুকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে।

দেশে ২০০৭ সালে খর্বাকৃতির হার ছিল ৪২ শতাংশ। আর বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কম ওজনের শিশুর জš§দানের হারও কমেছে। মাতৃপুষ্টির দিকটাতেও অনেক সাফল্য এসেছে। আমাদের বার্ষিক গড় খর্বতা কমানোর হার হচ্ছে তিন দশমিক দুই শতাংশ। প্রতিবছর গড়ে এভাবে কমতে থাকলে খুব শিগগিরই এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে। সরকার পুষ্টি উন্নয়ন কর্মসূচিকে শক্তিশালী করে দেশব্যাপী বিস্তৃত করতে নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। শিশুদের পুষ্টিমান বাড়াতে মায়ের দুধ খাওয়ানোর প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোয় বিশেষ টিম পরিদর্শন করে ছাত্রছাত্রীদের পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন করছে এবং বিদ্যালয়ে দুপুরে পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার বিতরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন এবং লাভজনক। মাকে যদি উচ্চ প্রোটিন ও ভিটামিন যুক্ত খাবার দেওয়া হয় তাহলে কম ওজন, মৃত এবং খর্বাকৃতির শিশু জন্মদানের হার অনেকাংশেই কমে যাবে। কম ওজন নিয়ে জন্মানো নবজাতকদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে। ক্যালসিয়াম মায়ের প্রি-একলামশিয়া রোধে সাহায্য করে। আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড মায়েদের রক্তশূন্যতা কমায়, যা মাতৃমৃত্যুর একটি বড় কারণ। বাংলাদেশে গর্ভবতী মায়েদের আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড নিশ্চিত করার মাধ্যমে রক্তশূন্যতার ঝুঁকি ৬৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এটি শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস করবে এবং পরবর্তী জীবনে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাবে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই প্রচেষ্টায় ব্যয়িত প্রতি এক টাকা বিস্ময়করভাবে ২৭ টাকার কল্যাণ সাধন করবে।

প্রধানমন্ত্রীর ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের ঋণের সুবিধা নিয়ে অনেক নারী ক্ষুদ্র ব্যবসা, গবাদি পশু পালন করে বাড়তি উপার্জন করছে। সরকারি সেবার পাশাপাশি যদি প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় বা পরিত্যক্ত জমিতে শাকসবজি ফলানো যায়, তাহলে পারিবারিকভাবেই পুষ্টির চাহিদা অনেকাংশে কমে যাবে। শহরের বাসাবাড়ির ছাদেও শাকসবজি ফলানো যায়। আমাদের দেশের মাটি অত্যন্ত ঊর্বর। বীজ মাটিতে রোপণ করে জৈবসার ব্যবহার করে এসব সবজি অনায়াসে ফলানো যায়। মাংস, দুধ, ডিম ছাড়াও বাড়িতে উৎপাদন করা বিষমুক্ত শাকসবজি ও ফলমূল গ্রহণ করতে পারলে অবহেলিত মা ও শিশুরা আর পুষ্টিহীন থাকবে না। দেশের প্রতিটি খণ্ড জমি যদি সঠিক ব্যবহার করা যায় তাহলে আমরা খাদ্যে যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি, তেমনই প্রতিটি মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারব।

সরকারের সহায়তা এবং পারিবারিক উদ্যোগ দুটির সমন্বয়ে আমরা পুষ্টিহীনতার অভিশাপ থেকে খুব দ্রুতই মুক্ত হতে পারব। স্বাস্থ্যসেবায় দেশে যে অসামান্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। সরকারের পুষ্টিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ। মিডিয়াগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..