মত-বিশ্লেষণ

সুস্থ থাকুক মা ও নবজাতক

ডা. রোকসানা হোসেন জেবা: গর্ভকাল প্রতিটি নারীর কাছে যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। এ সময় একই দেহে দুটি প্রাণ অবস্থান করে। নিরাপদ প্রসব সব মায়েরই প্রত্যাশা। আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার আগের তুলনায় অনেক কমেছে, কিন্তু এখনও তা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে আসেনি। প্রায় এক হাজার ৪০০ নারী প্রতিদিন মারা যান গর্ভাবস্থায় ও প্রসবজনিত বিভিন্ন ধরনের জটিলতায়।

একজন নারীর প্রথম মা হতে যাওয়ার অনুভূতি অসাধারণ। প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়টাতেও মাকে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিশাল এক মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়। এ সময়টাতে নতুন মায়ের নিজের যত্নের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে বাড়তি যত্ন ও সহযোগিতা প্রয়োজন।

গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য বিশুদ্ধ পানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আয়রন, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের চাহিদা পূরণও এ অবস্থায় খুব জরুরি। এগুলোর যে কোনো একটির ঘাটতি মা ও তার গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো চললে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। গর্ভবতী মা প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে দৈনিক অন্তত তিন থেকে চার লিটার পানি পানের পাশাপাশি ফলের জুস, স্যুপ, শরবত কিংবা ওরালস্যালাইন খেতে পারেন।

গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ামাত্র একজন নারীর গাইনি ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে দেখা করা উচিত। এরপর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা কেমন আছে, তা জেনে ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী তাকে তার করণীয় সম্পর্কে জানালে সন্তানসম্ভবা মায়ের তা মেনে চলা উচিত। গর্ভধারণের পুরো প্রক্রিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করে একজন মায়ের সেবাযতœ নেওয়া প্রয়োজন। এ সময় স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই ডাক্তার হবু মায়ের খাবার তালিকা, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম কিংবা চলাফেরার গতিবিধি সম্পর্কে জানিয়ে থাকেন।

প্রথম তিন মাস গর্ভবতী মায়ের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। এ সময় প্রায় সাত থেকে আট শতাংশ মিসক্যারেজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য কারও কারও অত্যধিক বমি-বমি ভাব কিংবা বমিও হতে পারে। ফলে দুর্বলতা অনুভব করা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, অস্থিরতাসহ মায়ের নানারকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত বমির ফলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই এ সময় প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা মেটাতে বেশি করে পানি, ফলের রস, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন কিংবা স্যুপজাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত। অতিরিক্ত বমির ভাব বা বমি হলে ড্রাই ফুড বা শুষ্ক খাবার খেতে হবে, এতে বমির প্রবণতা কমে যাবে। সন্তান ধারণ করার পর থেকেই মায়ের এসিডিটি সমস্যা খুব বেড়ে যেতে পারে। এজন্য এ সময় মায়ের তেল ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

দ্বিতীয় তিন মাস একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এ সময়ে গর্ভবতী মা নিরাপদ পরিবহনে ঝুঁকিমুক্ত ভ্রমণ করতে পারেন। তবে এই সময়টা গর্ভের শিশুর দৈহিক গঠনের সময় বলে গর্ভবতী মায়ের খাবারের তালিকায় কিছু বাড়তি খাবার যোগ করা আবশ্যক। এজন্য মাকে দৈনিক ১২০০-১৫০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হবে। আয়রন ও প্রোটিনের চাহিদাও এ সময় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি থাকে। তাই সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া আবশ্যক।

তৃতীয় তিন মাস গর্ভবতী মায়ের শারীরিকভাবে নিজেকে ভারী মনে হয়। প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগাও এ সময় তার জন্য স্বাভাবিক। অনেকেরই শেষ সময়ে এসে নানারকম শারীরিক জটিলতা লক্ষ করা যায়। এজন্য মাকে এ সময় নিজের শরীরের দিকে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। অনাগত শিশুর ব্যাপারে নানারকম দুশ্চিন্তা মনে উঁকি দিতে পারে, কিন্তু নিজেকে শান্ত রাখার সার্বিক চেষ্টা থাকতে হবে। ঘুমের সমস্যা বা ঘুম কম হওয়ারও প্রবণতা থাকতে পারে এ সময়।

গর্ভধারণের শুরুর দিকে মায়ের খাবারের প্রতি অনীহা থাকতে পারে। তবে অল্প অল্প করে পাঁচ থেকে ছয়বার তাকে খাবার গ্রহণ করতে হবে। বাড়তি প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে সামুদ্রিক মাছ, মিঠাপানির মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাতীয় খাবার মাকে খেতে হবে। তাজা রঙিন শাকসবজি ও দেশীয় ফলমূল খেতে হবে। কোমর, হাঁটু বা শরীরের অন্যান্য স্থানে তেমন কোনো ব্যথা না থাকলে মাকে স্বাভাবিক হাঁটাচলার পাশাপাশি, সাঁতার ও ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এ সময় সন্তান প্রসবের জন্য নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা। যেকোনো রকম ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অনিরাপদ যানবাহন এড়িয়ে চলতে হবে। গর্ভাবস্থার পাঁচটি বিপজ্জনক চিহ্ন, যেমনÑহঠাৎ রক্তপাত শুরু হলে, খিঁচুনি হলে, চোখে ঝাপসা দেখলে বা তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে, ভীষণ জ্বর হলে এবং প্রসব বিলম্বিত হলে অথবা এগুলোর যেকোনো একটি উপসর্গ দেখা দেওয়ামাত্রই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে গর্ভবতী মা ও নবজাতকের রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। তাই রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। যাদের বাড়ি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একটু দূরে তাদের প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের আগেই হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়া ইমার্জেন্সি ফান্ড হিসেবে কিছু পরিমাণ টাকা সঞ্চয় রাখতে হবে, যা প্রসূতি মা অথবা শিশুর চিকিৎসার জন্য কাজে লাগতে পারে।

সন্তান প্রসবের পর মা ও শিশুর শরীর দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। এ সময় সঠিক যত্ন নিলে এবং কিছু নিয়ম মেনে চললে এসব জটিলতা এড়ানো সম্ভব। প্রসবের পর সঠিক যত্ন নিলে মায়ের শরীর যেমন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়, তেমনি শিশু সুস্থ থাকে ও সবল হয়ে ওঠে। প্রসবের পরপরই মায়ের ও নবজাতকের যতœ নেওয়া এবং প্রসবের পর ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত মা ও শিশুর অবস্থা ফলোআপ করাই প্রসব-পরবর্তী সেবা।

গর্ভধারণে শরীরের যে ক্ষয় হয় তা পূরণের জন্য প্রসবের পর মাকে বেশি করে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। বুকের দুধ তৈরির জন্য এ সময় মায়ের সুষম খাবার খাওয়া প্রয়োজন। এছাড়া মাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে; মাকে নিয়মিত গোসল ও পরিষ্কার কাপড় পরিধান করতে হবে; ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রসূতি মাকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ও আয়রন বড়ি খেতে হবে; প্রসবের পর দম্পতিকে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে এবং পরিবারের সব সদস্যকে প্রসব-পরবর্তী মায়ের সেবা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

প্রসবের পর শিশুকে কোলে নিতে হবে; শিশুর মুখমণ্ডল ও শরীর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নিতে হবে; জন্মের পরপরই গর্ভফুল পড়ার জন্য অপেক্ষা না করে শিশুকে মায়ের শালদুধ খাওয়াতে হবে। প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ালে তা মায়ের গর্ভফুল পড়তে ও রক্তস্রাব দ্রুত বন্ধ হতে সাহায্য করে। নবজাতককে সরিষার তেল, মধু বা চিনির শরবতজাতীয় কোনো পানীয় খেতে দেওয়া উচিত নয়। নাড়ি কাটার জন্য প্রথমে নবজাতকের পেট থেকে যথাক্রমে দুই ইঞ্চি, আধা ইঞ্চি ও এক ইঞ্চি ব্যবধানে জীবাণুমুক্ত সুতা দিয়ে পরপর তিনটি বাঁধন দিতে হবে। এরপর পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত ব্লেড দিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাঁধনের মাঝ বরাবর কেটে দিতে হবে। শিশুর জন্মের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার ওজন নিতে হবে। জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে বিসিজি ও ইপিআই’র আটটি রোগের টিকা দিতে হবে। এছাড়া শিশুকে শূন্য থেকে ৫৯ মাস বয়স পর্যন্ত সব ধরনের টিকা দিতে হবে। সরকারিভাবে বিনা মূল্যে টিকা প্রদান করা হয়। এসব টিকা নবজাতককে জটিল রোগ থেকে নিরাপদ রাখে।

সন্তান ধারণের বিপদ অনেক কমে যেতে পারে যদি মা স্বাস্থ্যবতী হন, গর্ভাবস্থায় সঠিক পুষ্টি পান, স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বারা গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার পরীক্ষা করান এবং যদি প্রসব একজন দক্ষ দাক্তার, নার্স বা মিড্ওয়াইফের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। এ বাস্তবতায় কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যসেবা গ্রাম পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্বাস্থ্যসহকারীরা তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা প্রদান করছেন। বর্তমানে দেশে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসেবা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলো দেশের দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার আশ্রয়স্থল। শিশুর ডায়রিয়া, রক্তচাপ মাপা, সুগার টেস্ট, সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, গর্ভবতী মায়েদের সাধারণ চিকিৎসা প্রভৃতি প্রাথমিক সেবা স্বাস্থ্যকর্মীরা খুব সহজেই দিতে পারেন। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গ্রামের দরিদ্র ও অবহেলিত নারীদের সন্তান প্রসবের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের বিপদ এবং অদক্ষ দাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে। সরকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ডাক্তারদের দুই বছর গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক করেছে এবং এ বিষয়ে তদারকি অনেক বেড়েছে। মা সুস্থ থাকলে, সন্তান সুস্থ হবে। মা ও সন্তান সুস্থ থাকলে সুস্থ হবে সমাজ। পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..