সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন ভেজালমুক্ত খাবার

রামিছা বিলকিছ জেরিন: বিবেক, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব নিয়েই মানুষ। সমাজের ভালো-মন্দ প্রতিটি মানুষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। মানবতাবোধ মানুষের বড় গুণ। এই গুণের অধিকারী হয়ে মানুষ সমাজে সম্মানিত হয়। প্রাণিজগতে মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, সে পরহিতে জীবনদান করে। যে জীবন আত্মসুখে মগ্ন, সে জীবন স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিকতা আর অহমিকায় কলঙ্কিত। অর্থলোভ ও লালসা মানবজাতির জন্য যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা খাদ্যে ভেজালের পরিমাণ দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। যে খাদ্য গ্রহণ করে মানুষ বাঁচতে চায়, সুস্থ থাকতে চায়, সেই খাদ্যে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী ভেজাল মিশিয়ে দেয় নির্দ্বিধায়।

খাদ্যে ভেজাল বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিদিনই নানাভাবে ভেজাল মিশিয়ে থাকে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তবে দিন দিন এর দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। খাদ্যে নি¤œমানের ক্ষতিকর, অকেজো, অপ্রয়োজনীয় ও বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে খাদ্যকে বিষাক্ত করা হচ্ছে। মানসম্মত না হলে যেকোনো খাদ্যদ্রব্যই ভেজালযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহƒত সব খাবার জিনিসই ভেজালের আওতায় পড়ছে। প্রতিদিন শাকসবজি ও মাছ-মাংসে বিষক্রিয়া দিচ্ছে অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা।

জরিপে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ভেজাল খাদ্য রাজধানী ঢাকা শহরেই রয়েছে। এক জরিপে পাওয়া গেছে সারাদেশে যদি খাদ্যে ভেজাল ৫০ শতাংশ হয়, তাহলে শুধু ঢাকা শহরেই আছে ৭০ শতাংশ। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ভেজালমুক্ত বিশুদ্ধ খাদ্য অনেকটা সোনার হরিণের মতো। মাছ, মাংস, চিনি, ডাল, লবণ, দুধ, ঘি, মিষ্টি, শাকসবজি এমনকি ওষুধেও ভেজাল মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। খাদ্যকে বেশি আকর্ষণীয় করার জন্য বিভিন্ন রঙের ব্যবহার, তরল পানীয় ঘন করার জন্য এমাইলামের ব্যবহার, মধুতে কেইন সুগারের ব্যবহার, শাকসবজি, চাল, মুড়ি ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য ইউরিয়া ব্যবহার এবং ফলমূল সংরক্ষণের জন্য কার্বাইডের ব্যবহার খাদ্যকে বিষাক্ত করে ফেলে।

মাছকে তাজা রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যদি সামান্যতম পরিমাণের ফরমালিনও মানুষের পেটে যায়, তবে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আজকাল তরল দুধেও মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। শিশুদের গুঁড়োদুধে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক মেলামাইন। ভাবতেও কষ্ট হয়, মানবতা আজ ঠিক কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে।

শুকিয়ে যাওয়া শাকসবজিকে সতেজ করতে বাজারে এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য এসেছে। এই রাসায়নিক দ্রব্য দেয়ার ফলে সবজি দেখতে একদম টাটকা মনে হয়। কী পরিমাণ বিষাক্ত পদার্থ থাকলে এমনটা হতে পারে! এসব শাকসবজি, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য খেয়ে মানুষজন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে এবং ডিহাইড্রেশন, ক্যানসার, আলসার, লিভার সমস্যা, এসিডিটির সমস্যাসহ আরও বহু রোগ দেখা দিচ্ছে। ওষুধেও ভেজাল দেয়া হচ্ছে। নকল মেডিসিনে সয়লাব হয়ে আছে দোকান ও ফার্মেসি। ভাবা যায়Ñজীবন রক্ষাকারী ওষুধে ট্যালকম পাউডার, আটা-ময়দা মেশানো হচ্ছে! প্রাণঘাতী ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসেবে দেয়া হচ্ছে শুধু মিনারেল ওয়াটার।

মানুষ লোভে-লালসায় পশুকে অতিক্রম করছে। পৃথিবীতে বাংলাদেশের মতো আর কোনো দেশে এত বেশি ভেজাল মেশানো সহজলভ্য নয়। সিমেন্টে মাটি মেশানো, দুধে পাউডার, শাকসবজি সবকিছুতেই বিষ মেশাচ্ছে মুনাফালোভীরা। মোদ্দাকথা, মানুষ বাজার থেকে যা কিছু কিনে খাচ্ছে, তার কোনটি যে ভেজাল আর কোনটি ভেজালমুক্ত, তা বোঝা দায়। অথচ বিশুদ্ধ ও ভেজালমুক্ত খাদ্যদ্রব্য পাওয়ার অধিকারও মানুষের রয়েছে।

আমরা যদি খুঁজতে যাই খাদ্যে ভেজাল কেন মেশানো হয়, তাহলে অর্থের লোভ ও অধিক মুনাফা লাভের কারণ দেখতে পাই। অর্থের লালসা মানুষের চিরন্তন। জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে অর্থের চাহিদা। আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় অর্থটাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে গেলে অর্থের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যায়। কিন্তু তাই বলে অসৎ উপায়ে এমন উপার্জন কাম্য নয়।

সৎ পথে থেকে অনেক উপার্জনের পন্থা রয়েছে। তবে সৎ পথে উপার্জন করতে গেলে ঘরে বাইরে সব জায়গায় মনুষ্যতের দীনতার চিত্র দেখা যায়। রাজনৈতিক ইস্যু, কলহ এবং অপরদিকে থাকে অর্থনৈতিক দুর্দশা। সমাজে নীতিবান সৎ, জ্ঞানী মানুষের সম্মান চেয়ে অসৎ মানুষ বহুলাংশে বেশি সম্মান পায়, যার কারণে সাধারণ মানুষ সৎ পথে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। ফলে ক্রমেই ভালো মানুষগুলো অর্থ-প্রতিপত্তির লোভে ভেজালে রূপান্তরিত হয়। ভেজাল মিশিয়ে সবকিছুকে চাকচিক্যে ভরিয়ে তোলা হচ্ছে। 

এসব কাজ নির্মূলের জন্য আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। দেশে দুর্নীতি দমনের জন্য গঠিত হয়েছে টাস্ক ফোর্স। কিন্তু তবু ভেজালের ছোঁয়ায় সব জায়গা আক্রান্ত হচ্ছে। সত্যি বলতে আইন দিয়ে কখনও মানুষের চরিত্র ঠিক করা যায় না। বিবেকবোধ পায়ে দলিত করে তারা পার্থিব সুখ কিনতে চায়। প্রায় সব ক্ষেত্রেই জেনে-শুনে এমনকি সচেতনভাবেই ভেজাল মেশানো হয়ে থাকে। দেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবে।’ কিন্তু যেখানে আমাদের দেশের ছোট-বড় সব বাজারই ভেজাল খাদ্যে পরিপূর্ণ, সেখানে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ও পুষ্টির মান উন্নয়ন করতে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হবে। ২০০৫ সালে একটি আইন করা হয়, ‘বিশুদ্ধ খাদ্য বিল, ২০০৫। এ আইনে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানা ও সর্বোচ্চ তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।

ইসলামেও খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানো কোনো মুমিনের কাজ হতেই পারে না, এমনকি কোনো মানুষের কাজও নয়। ক্রেতার সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে প্রতারণা করা ইসলামে নিন্দিত কাজ। যারা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে অবৈধ আয় করে, তাদের রুজি অপবিত্র। তাই তাদের ইবাদত কবুল হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’

খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা না করে সৎ পথে উপার্জন করতে হবে। অসৎ ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করতে হবে। ভেজালবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি জেলায় খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হবে বিএসটিআইয়ের। খাদ্যদ্রব্যের মান নিয়ন্ত্রণ, কোম্পানির লাইসেন্স, ট্রেডমার্ক, উৎপাদন সময় ইত্যাদি ছাড়াও বিভিন্ন কৌশল ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যারা সমাজে ভেজাল খাদ্য বিক্রি করেন, তাদের চিহ্নিত করে জনসম্মুখে জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে।

নৈতিকতাবোধ, সঠিক জ্ঞান, ভেজাল খাদ্যের প্রতিক্রিয়াÑসবকিছু নিয়ে মানুষকে জ্ঞান দিতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এবং আইন প্রয়োগকারীরা সততা অটুট রেখে কাজ করলে আশা করা যায় খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে তলিয়ে না দিতে চাইলে এই ভেজাল খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে সমাজকে ভেজালমুক্ত করতে হবে। সুষম খাবার তুলে দিতে হবে জনগণের দোরগোড়ায়। সুস্বাস্থ্যের জন্য ভেজালমুক্ত খাবারের বিকল্প নেই।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ..